ডোসেনা বেচারি জানবেন কী করে চতুর ফাসোলির মাথার মধ্যে তখন ঘুরছে অন্য প্ল্যান? তাই রাজি হয়ে গেলেন এককথায়। পাথর-মিস্ত্রির একটা খোদাই মূর্তি নিয়ে ফাসোলি গেলেন তারই এক সতীর্থের কাছে। এঁর নাম পালেসি-আন্তর্জাতিক আর্ট মার্কেটে দারুণ নাম–একডাকেই সবাই চেনে। দুই ধুরন্ধর বিহ্বল চোখে অনিমেষে চেয়ে রইলেন অনিন্দ্যসুন্দর স্ট্যাচুটির প্রতিটি খাঁজ, ভাঙাচোরা, ফাটাফুটো, রং জ্বলে যাওয়া অংশের দিকে–সবই যেন আসলের ভাঙচোর এবং বিবর্ণতা। বহু শতাব্দী পরে সব মূর্তিতেই যা দেখা যায়। মূর্তি বেচে লাভের অঙ্কও ভেসে উঠল চোখের সামনে।
রোমের একটা মিউজিয়ামে বিক্রির জন্য হাজির করা হল সেই স্ট্যাচু। মিউজিয়ামের অফিসাররা মূর্তি দেখেই বললেন, উঁহু, এ যে জাল মনে হচ্ছে! বুক ধড়াশ-ধড়াশ করতে লাগল দুই প্রবঞ্চকের। তলব পড়ল মূর্তি বিশেষজ্ঞদের। তারা খুঁটিয়ে দেখে রায় দিল একবাক্যে–আসলি চিজ!
আনন্দে নেচে উঠলেন প্রতারক-যুগল। আর্ট এক্সপার্টদের কথার ওপর আর তো কথা বলা যায় না। মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষ মোটা দাম মিটিয়ে দিলেন এমন একটা আসলি চিজ সংগ্রহ করে আনার জন্যে।
ডোসেনাকে অবশ্য বলা হল, সস্তার নকলি চিজ হিসেবে বিকিয়ে গেছে মূর্তিটা দাম পাওয়া গেছে সামান্যই। খানকয়েক নোট জুটল তার বরাতে! সামান্য টাকা পেয়ে আনন্দে আটখানা হয়েই ফাসোলির ফাঁদে পা দিলেন ডোসেনা। ওঁর সমস্ত খোদাইকর্মের একমাত্র বিক্রয়স্বত্ব চাইলেন অসৎ আর্ট ডিলার ফাসোলি। কৃতজ্ঞচিত্তে তৎক্ষণাৎ রাজি হয়ে গেলেন পাথর-মিস্ত্রি। তার এই সামান্য শিল্পকর্মে এত আগ্রহ দেখেই তিনি ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেছিলেন– অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা করার বুদ্ধি হারিয়েছিলেন সেই কারণেই। ফলে রেনেসাঁ আমলের অকৃত্রিম শিল্প নিদর্শন হিসেবে চালিয়ে দেওয়া হল ডোসেনার আরও অনেক স্ট্যাচু সারা ইউরোপের মিউজিয়াম আর প্রাইভেট সংগ্রাহকরা কাড়াকাড়ি করে নিয়ে গেল সেগুলো। প্রতিবারেই সামান্য টাকা গুঁজে দিয়ে গেলেন ফাসোলি পাথর মিস্ত্রির হাতে, সেই সঙ্গে শুনিয়ে গেলেন হাড় কালি হয়ে যাচ্ছে তার নকলি চিজ বেচতে গিয়ে নকলের দর কি বেশি পাওয়া যায়? ডোসেনা ঘুণাক্ষরেও কিছু সন্দেহ করলেন না–প্রশ্নও করলেন না! উলটে আরও উৎসাহিত হয়ে একটার পর একটা মাস্টারপিস উল্কীর্ণ করে গেলেন বাটালি হাতুড়ি দিয়ে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত।
বিশ্বের বহু বিখ্যাত মিউজিয়াম ধোঁকা খেয়ে গেল ডোসেনার গ্রিক আর রেনেসাঁ ললিতকলার নিদর্শন চড়া দামে কিনে। নিউইয়র্ক সিটির মেট্রোপলিটান মিউজিয়াম অফ আর্ট কিনেছিল একটা গ্রীক কুমারীর প্রস্তরমূর্তি যার বয়স নাকি খ্রিস্টপূর্ব ৫০০! ক্লিভল্যান্ড মিউজিয়াম বর্তে গেল ম্যাডোনা এবং শিশুর একটা দারুণ মূর্তি পেয়ে–এ মূর্তির স্রষ্টা নাকি জিওভানি পিসানো; চতুর্দশ শতাব্দীর প্রাতঃস্মরণীয় এই ভাস্করের পাথরের কাজ এতকাল অনাবিষ্কৃতই ছিল! বোস্টনের মিউজিয়ামে অফ ফাইন আর্টস তো উধ্ববাহু হয়ে নৃত্য করতে বাকি রেখেছিল রেনেসাঁ ভাস্কর মিনো দ্য ফিসোল নির্মিত একটা পাথরের শবাধার পেয়ে! পরে যখন ধোঁকাবাজি ধরা পড়ল, তখনও কিন্তু বোস্টন মিউজিয়ামের এক মুখপাত্র মন্তব্য করেছিলেন–হোক জালিয়াতি, এমন জিনিস সাজিয়ে রাখতে ইচ্ছে যায়। বড় সুন্দর! বড় সুন্দর! যে-ই করুক না কেন, তাতে কিসসু এসে যায় না।
এই তো সেদিন ১৯৫৮ সালে, কয়েকজন আর্ট এক্সপার্ট বলে বসলেন, সেন্ট লুই মিউজিয়ামে পরম যত্নে সংরক্ষিত ডায়ানা উইথ ফন প্রস্তরমূর্তিটাও নাকি ডোসেনার স্টুডিওতে তৈরি হয়েছে। কিন্তু তাতেও কি চৈতন্য হয় মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষের! সঙ্গে-সঙ্গে একান্ন পৃষ্ঠার ইয়া লম্বা একখানা প্রতিবেদন ছাপিয়ে তারা ছড়িয়ে দিলেন বিশেষজ্ঞ মহলে জিনিসটা বিলকুল খাঁটি, তার স্বপক্ষে হাজার-হাজার যুক্তি প্রমাণ হাজির করে সযত্নে স্ট্যাচুটাকে সাজিয়ে রাখলেন মিউজিয়ামের স্ফটিক আধারে!
এ তো বড় তাজ্জব কি বাত! তাবড়-তাবড় শিল্প-বিশেষজ্ঞরা বিজ্ঞানের সূক্ষ্মতম কলকবজার ব্যবহার সত্ত্বেও ডোসেনার শিল্পকর্মে জালিয়াতি ধরতে পারলেন না কেন? কেন বারে বারে ধোঁকা তো খেলেনই, উলটে জাল জিনিসকেই আসল প্রমাণ করার জন্যে কোমর বেঁধে লাগলেন?
কারণ একটাই। তার আগে কোনও জালিয়াত যা কখনও করেননি, উনি তাই করেছেন। প্রতিটি শিল্পকর্মের মধ্যে মনপ্রাণ ঢেলে দিয়েছেন। নিবিড় নিষ্ঠা সহকারে অত্যুৎকৃষ্ট ললিতকলা সৃষ্টি করেছেন–জাল করবেন বলে করেননি, সৃষ্টি করবেন বলেই করেছেন। সৃষ্টির আনন্দে সৃষ্টি বলেই তার সৃষ্টিকে আসল বলে সোচ্চার হয়েছে ধোঁকা খাওয়া মানুষগুলো।
শোনা যায়, ডোসেনা নাকি একটা গুপ্ত রসায়ন আবিষ্কার করেছিলেন। পাথর ছুঁড়ে কেমিক্যালটা প্রবেশ করত ভেতরে এবং পাথরের গায়ে মাটির দাগ ফুটিয়ে তুলত এমন নিখুঁতভাবে যে দেখেই মনে হত যেন মহাকালের নিষ্ঠুর হস্তক্ষেপে কালজীর্ণ হয়েছে মূর্তিগুলো।
আরও একটা কারণ আছে বইকি। খোদাই কর্মগুলোকে যথাবিহিতভাবে যাচাই করেনি। বেশিরভাগ মিউজিয়াম।
সবচেয়ে বড় কারণ কিন্তু ওই একটাই। খুঁটিয়ে পরীক্ষা সত্ত্বেও নকলকে নকল বলে চেনা যায়নি কেননা নকল-মাস্টার অ্যালসিও ডোসেনা ছিলেন বাস্তবিকই প্রতিভাধর–জিনিয়াস।
