যাক সে কথা, নটরাজ-জালিয়াত ভদ্রলোক নকল-মূর্তি বানানোর এমন খাসা কায়দাটি নিজেই উদ্ভাবন করেছিলেন, না, ভুবন কাঁপানো ঠিক এই ধরনের আর একজন জালিয়াতকে গুরু বলে মেনে নিয়েছিলেন, সেই আলোচনাই এখন করা যাক কাগুঁজে-গোয়েন্দাগিরিও বলতে পারেন।
চলুন, সময়ের সড়কে অতীত ভ্রমণে যাওয়া যাক।
সালটা ১৯২০। রোম শহর। আপনি দাঁড়িয়ে আছেন (অদৃশ্য অবস্থায় অবশ্য) একটা খুদে স্টুডিওর মধ্যে। কৃষ্ণনগরে মূর্তি কারিগরদের স্টুডিও দেখেছেন? হুবহু সেই রকমই এই স্টুডিওটি। সমাপ্ত, অর্ধসমাপ্ত মূর্তি এবং বিস্তর পাথরের স্কুপ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে ছোট্ট স্টুডিওটিতে।
ছেনি হাতুড়ি নিয়ে তন্ময় হয়ে খটাং-খটাং করে মূর্তি খোদাই করে চলেছেন ওই যে শিল্পীটি, ওঁর নাম অ্যালসিও ডোসেনা। ইটালিয়ান। নামী শিল্পী নন। আসলে উনি পাথর খুদে নতুন-নতুন বাড়ির কার্নিশ তৈরি করে পেট চালাতেন। এখন তার ভাবনাচিন্তা উধাও হয়েছে কয়েক শতাব্দী পেছনে। বাটালির এক-এক কোপে প্রবেশ করছেন ফ্যানটাসি দুনিয়ার আরও গভীরে। নিজেকে এখন লিওনার্ডো দ্য ভিন্সির জায়গায় বসিয়েছেন। এরপর অবশ্য হবেন মাইকেল এঞ্জেলো হবেন গ্রেট রেনেসাঁ যুগের আরও অনেক ভাস্কর–যাঁদের কীর্তি তিনি জানেন এবং ভালোবাসেন।
অস্থিরতার শুরু এই ভাবনাচিন্তা ভালোবাসা থেকেই। কার্নিশ তৈরির কাজ একদিন নিক্ষেপ করলেন–দূর, দূর। এর মধ্যে সৃষ্টির আনন্দ কোথায়! এক-ডেলা মার্বেল পাথরের ওপর ঝুঁকে পড়লেন বাটালি হাতুড়ি নিয়ে। শুরু হয়ে গেল খোদাই কর্ম। ফ্যানটাসি স্বপ্নে মশগুল থাকায় তখন কিন্তু জানতেনও না যে, অজান্তে যে পথ উনি ধরলেন, সেই পথেই অচিরে তাঁর বরাতে নাচছে বিশ্বব্যাপী কুখ্যাতি।
দীর্ঘ আট বছর ধরে খ্যাতির স্বপ্নজগতে বিচরণ করলেন পাথর রাজমিস্ত্রি। ডজন-ডজন অপরূপ সুন্দর খোদাই বানিয়ে গেলেন খুদে কারখানায়। তারপরেই ১৯২৮ সালের যাচ্ছেতাই এক নভেম্বর দিবসে যেন প্রচণ্ড ভূমিকম্পে নড়ে উঠল শিল্প-দুনিয়া ও নিউইয়র্ক, ক্লিভল্যান্ড, বোস্টন, রোম, বার্লিন এবং মিউনিখের কর্তৃপক্ষরা আঁতকে উঠল ভয়াবহ একটা সংবাদে বহু কষ্টে সংগ্রহ করা তাদের অধিকাংশ অমূল্য খোদাই শিল্পই নাকি জাল কার্নিশ মিস্ত্রীর নির্দোষ সাধনার ফলশ্রুতি অনুপম শিল্প নিদর্শন ঢুকে বসে আছে মিউজিয়ামে মিউজিয়ামে।
বিশ্ববন্দিত গুরুদেবদের মহান শিল্পকর্ম বছরের পর বছর খুঁটিয়ে দেখেছিলেন ডোসেনা। বিশেষ করে একজন আর্টিস্ট তাঁর চিন্তাজগতে আলোড়ন তুলেছিল সবচেয়ে বেশিনাম তার সাইমন মার্টিনি–চতুর্দশ শতাব্দীর চিত্রশিল্পী।
মার্টিনি কিন্তু পাথর নিয়ে কোনওদিন কাজ করেননি। ডোসেনা মার্টিনির ক্যানভাসে আঁকা শক্তিশালী চিত্রকর্ম দেখতে-দেখতে কল্পনারঙিন চোখে দেখেছিলেন, মার্টিনির হওয়া উচিত ছিল ভাস্কর। চোখ বন্ধ করে ডোসেনা যেন স্পষ্ট দেখতে পেতেন ছশো বছর আগে মার্বেল খোদাই করে মার্টিনি সৃষ্টি করছেন সারি-সারি অদ্ভুত সুন্দর মূর্তি।
সৃষ্টির প্রেরণা অথবা আইডিয়ার ঝলক তো এমনি করেই উন্মত্ত করে তুলেছে শিল্পীদের যুগ-যুগ ধরে। ডোসেনাই বা বাদ যান কেন! পরিত্যক্ত পাথর খাদে আর প্রহরাহীন ধ্বংসস্তূপে ঘুরে ঘুরে ডোসেনা শেষপর্যন্ত সংগ্রহ করলেন শিরাসমৃদ্ধ উৎকৃষ্ট মার্বেল পাথরঘর বোঝাই করে ফেললেন এই পাথরে। রেনেসাঁ যুগের ভাস্কররা যে-পাথর নিয়ে কালজয়ী সৃষ্টি করে গেছেন, এ সেই পাথর। তারপর মার্টিনি যে স্টাইলে পেন্টিং করেছেন, হুবহু সেই স্টাইলের অনুকরণে নিপুণ হাতে খোদাই করলেন অতীব সুন্দর একটা ম্যাডোনা ও শিশুমূর্তি।
এরপর রেনেসাঁ যুগের অন্যান্য যেসব শিল্পীদের মনে-মনে পূজা করেছেন ডোসেনা, তাদের বিশেষ কায়দা অনুকরণ করলেন এবং হুবহু সেই স্টাইলে সৃষ্টি করলেন চমকপ্রদ স্ট্যাচুর পর স্ট্যাচু।
নিজের কীর্তি দেখে নিজেই স্তম্ভিত হয়ে গেলেন ডোসেনা। আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পেতেই সাহসও বাড়ল। সময়-পথে পেছিয়ে গেলেন আরও পেছনে। গ্রিক ধ্বংসস্তূপ ছিল আশেপাশেই। সেখান থেকে মাটি খুঁড়ে উদ্ধার করেছিলেন এমন সব মার্বেল পাথর যা ব্যবহার করা হয়েছে এথেন্সের মতো গৌরবময় যুগে। এইসব মার্বেল খুদে সূক্ষ্ম মূর্তির-পর-মূর্তি বানালেন, যা দেখলেই মনে হবে গ্রিসদেশের স্বর্ণযুগ ফিরে এসেছে প্রতিটি মূর্তি যেন খোদিত হয়েছিল সেই সময়ে।
পাথর-মিস্ত্রির কারখানা ধীরে-ধীরে মিউজিয়ামের রূপ নিতে লাগল এইভাবেই। কোণে-কোণে খাড়া রইল পঞ্চাদশ শতাব্দীর সমাধি মন্দিরের খোদিত অংশকে বলবে পঞ্চদশ শতাব্দীতে নয়– আসল জিনিসের সঙ্গে তফাত নেই কোথাও; রইল চতুর্দশ শতাব্দীতে নির্মিত প্রদীপের তৈলাধারের নকল আর গ্রীক দেবীমূর্তি।
সৃষ্টির খেয়ালেই ঝুঁদ হয়েছিলেন ডোসেনা বিক্রি করার কোনও চেষ্টাই করেননি। কিন্তু একদিন পাথর-মিস্ত্রীর রেনেসাঁ স্ট্যাচু দেখতে এলেন আলফ্রেডো ফাসোলি নামে এক অ্যান্টিক ডিলার। প্রাচীনকালের দুষ্প্রাপ্য ললিতকলার সামগ্রী বেচাকেনাই তার ব্যবসা। কাজেই চেনবার চোখ তার ছিল। নকল মূর্তি দেখে তো তার চক্ষু চড়কগাছ। কিন্তু মহাধুরন্ধর বলেই উত্তেজনার প্রকাশ ঘটতে দিলেন না চোখেমুখে। বললেন তাচ্ছিল্যের সঙ্গে, দূর! দূর! এসব জিনিসের আবার বাজার আছে নাকি! তবে আপনি যদি চান, এখানকার বোঝা খানিকটা কমিয়ে দিতে পারিসস্তায় যদি দিতে পারেন, তবেই।
