হীরকবরণ মুখার্জিকে ভক্তি-শ্রদ্ধা করত রামতনু। ধরল তাঁকেই। বলল–স্যার, বাসাবাড়ি না পাওয়া পর্যন্ত আপনার কাছে যদি সরোজিনীকে রাখেন, আমি নিশ্চিন্ত হতে পারি।
হীরকবরণ রাজি হলেন। রামতনুকে স্নেহ করতেন তিনি। তিনি নিজেও পরোপকারী। সরোজিনী রইল তার কোয়ার্টারে। পাণ্ডুর কোয়ার্টারে তিনি ঠাকুর-চাকর নিয়ে একাই থাকতেন। বৃদ্ধ বাবার দেখাশুনার জন্যে এবং ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার জন্যে স্ত্রীকে রেখেছিলেন বেলঘরিয়ায়।
মাস কয়েক পরে সরোজিনীর স্কুলে খবরটা প্রকাশ পেল। মেয়েদের চোখকে ধুলো দেওয়া যায় না এসব ব্যাপারে। বান্ধবীরাই ধরে ফেলল, সরোজিনী সন্তানসম্ভবা। হীরকরণ মুখার্জির দুর্দিন শুরু হল তখন থেকেই। রামতনু এল। সে-ও স্তম্ভিত। হীরকবরণ লজ্জায় অধোবদন। এদিকে কানাঘুসো আরম্ভ হয়েছে রেলওয়ে কোয়ার্টারে। তাই রামতনু আর সরোজিনীকে নিয়ে এলেন পুরীতে। প্রস্তাব করলেন গর্ভপাত করা হোক।
বেঁকে বসল সরোজিনী–রামতনুর ইচ্ছে সত্ত্বে। নিরুপায় হয়ে কলকাতায় এলেন হীরকবরণ। কালিঘাটে গিয়ে সরোজিনীর মাথায় সিঁদুর পরিয়ে দিয়ে বিয়ে করলেন। বাগবাজারে একটা ছোট্ট ফ্ল্যাটে তার থাকার ব্যবস্থা করলেন।
কিন্তু ওই পর্যন্তই। মুহূর্তের মোহে যে ভুল তিনি করেছিলেন, বিয়ের লাইসেন্স নিয়ে তাকে প্রলম্বিত করলেন। সরোজিনীর আর বাচ্চার খোঁজখবর নিতেন। কিন্তু সরোজিনীর ফ্ল্যাটে রাত্রিবাস করতেন না।
দিবারাত্র বিবেকের দংশন আর সইতে পারে না হীরকবরণ। সরোজিনী আর নিষ্পাপ শিশুটির ভবিষ্যতের একটা পাকাঁপোক্ত ব্যবস্থা করার সংকল্প নিলে মনে মনে। তাঁর অবর্তমানে দ্বিতীয় স্ত্রী আর পুত্রের যাতে খাওয়া পরার অভাব না থাকে, জীবিতকালে সেই ব্যবস্থা করে যাবেন ঠিক করলেন।
কিন্তু রোজগার তাঁর রবারের মতো নয় যে টানলে বড় হবে। উৎকোচ নিয়ে এতদিনের সুনাম আর শ্রদ্ধাকে বলি দিতে রাজী নন। তাই সব দিক বজায় রেখে কাকপক্ষীকে না জানতে দিয়ে প্রথম যে কাজে হাত দিলেন–তা নিয়েই এই গল্প।
গল্প শেষ করে বিশ্ববন্ধুবাবু হেসে বললেন–মৃগাঙ্কবাবু, এ গল্পের ডিটেকটিভ চমকে দেওয়ার মতো কোনও কু পায়নি–শুধু দেখিয়েছে উপস্থিত বুদ্ধির খেলা। কিন্তু সে সুযোগও সে পেত
-হীরকরণ কোনওদিনই ধরা পড়তেন না–যদি তিনি প্রফেশনার ক্রিমিন্যাল হতেন–তাহলে আর দ্বিতীয় বার ওই ব্যাঙ্কে তিনি আসতেন না। ওই একটি মাত্র ভুলের জন্যে তাঁকে শেষ পর্যন্ত জেলেই যেতে হল–পাঁচ বছরের জন্যে।
* উল্টোরথ পত্রিকায় প্রকাশিত। জুলাই-আগস্ট, ১৯৭৬
মুর্তি জালিয়াতির চালিয়াতি
কাহিনিটা ২৫ বছরের পুরোনো। একাদশ শতাব্দীর শিবপুরম নটরাজ মূর্তি স্মাগলড হয়ে পৌঁছেছিল আমেরিকায়। পঞ্চলোহা মূর্তিটার ওজন পঞ্চাশ কিলোগ্রাম। ১৯৫৬ সালে তাকে উদ্ধার করা হয় মৃত্তিকার তলদেশ থেকে। স্ট্যাচুটি মেজেঘষে ঝকঝকে সুন্দর করে দেওয়ার গুরুদায়িত্ব দেওয়া হল এক মূর্তি কারিগরকে। ধুরন্ধর কারিগরটি অভিনব উপায়ে প্রতারণা করলেন কর্তৃপক্ষকে– আসল দিলেন বেচে। একটা হুবহু নকল বানিয়ে ফেরত দিলেন স্ট্যাচু মালিককে।
কিন্তু কারও চোখে ধরা পড়ল না এতবড় জালিয়াতি। পরপর বারোজন ভারতীয়র হাতবদল হল জাল মূর্তি। কারিগর বেচেছিলেন পাঁচ হাজার টাকায়। হাতবদল হতে-হতে সেই মূর্তির দাম গিয়ে দাঁড়াল পাঁচ লক্ষ টাকায়। বিপুল অঙ্কের দামটি পকেট থেকে বার করল এমন এক কারবারি যার বিলক্ষণ সুনাম আছে হন্ট স্ট্যাচু কেনাবেচায়।
নিউইয়র্কের এক সংগ্রাহক মূর্তিটি হাতে পেয়ে আনন্দে উল্লসিত হয়ে তো বলেই ফেললেন– পাঁচ লক্ষ রুপেয়া এর দামই নয়–হওয়া উচিত নব্বই লক্ষ।
মূর্তিটি বর্তমানে রয়েছে সাইমন নর্টন ফাউন্ডেশনে। তারা কত দাম দিয়েছিল হন্ট স্ট্যাচুটির মালিক হওয়ার জন্যে, তা অবশ্য এখনও জানা যায়নি–কোটির ওপর তো বটেই।
কিন্তু আমেরিকা এক আশ্চর্য দেশ। অন্যদেশের সম্পত্তি চুরি করে এনে হজম করবে দেশের একটা নামী সংস্থা, তা জেনেশুনে চোখ বুজে থাকার পাত্র তারা নয়। প্রতিবাদের ঝড় উঠল দেশময়। ইন্ডিয়া হলে পাবলিকের আপত্তিতে বয়ে যেত যে-কোনও মূর্তি সংগ্রাহকের, কিন্তু সাইমন নর্টন ফাউন্ডেশন শেষপর্যন্ত রাজি হল চোরাই মাল ফিরিয়ে দিতে।
কিন্তু ধুরন্ধর ইন্ডিয়ান কারিগরকে তো আর বিশ্বাস করা যাচ্ছে না। আরও চারটে অনুরূপ বিগ্রহ তাকে দেওয়া হয়েছিল মাজাঘষার জন্যে তাদের কপালে কী জালিয়াতি ঘটেছে, কে এখন সে রহস্যের সমাধান করবে? ডিটেকটিভ কোথায়? ফেলুদা, ব্যোমকেশ, ইন্দ্রনাথ-কিরীটির তলব তত এখনও পড়েনি।
এই একটি ঘটনা থেকেই অ্যান্টিক সামগ্রী দেখলেই এখন সমঝদার ব্যক্তিরা আঁতকে উঠছেন। আসল কি নকল যাচাই করবে কে? মিউজিয়ামে এমনি অ্যান্টিকের তো পাহাড় জমে রয়েছে। কিন্তু তার মধ্যে কোনটা জাল, কোনটা আসল চীজ–তা কে জানছে? চুরি যেমন ধরা পড়ছে না, জালিয়াতিও তেমনই ধরাছোঁয়ার বাইরে।
আশ্চর্য, নয় কী?
পুরীর জগন্নাথ মহাপ্রভুর হিরের চোখ চুরি হয়ে গেল যখন, তখন ছোটখাট মন্দির দেবালয়ের লুঠতরাজের কাহিনি দেশবাসীর কানে আদৌ কি পৌঁছোচ্ছে? ১৯৭৩ সালের আর্টস অ্যান্ড অ্যান্টিকুইটিস অ্যাক্ট-য়ের যথা প্রয়োগ করার লোক কোথায়? তা না হলে চিতোরগড় অস্ত্রাগারে এমার্জেন্সির সময়ে সংরক্ষিত একশোটা মূল্যবান বিগ্রহ হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে কেন? কর্তৃপক্ষের টনক নড়ল মাত্র গতবছর, যখন বিগ্রহ-মালিক মূর্তিগুলো ঘষামাজার জন্যে চেয়ে পাঠালেন দরখাস্ত মারফৎ।
