টাকা চাইলেন হীরকবরণবাবু। মুক্তারামবাবু আঙুলে পৈতে জড়াতে জড়াতে কঠোর গলায় বললেন–তার আগে বলুন এরা কে?
আমার বন্ধু। জমির খোঁজ পাওয়া গেছে। তাই–
শুনেছি বাজপাখির চোখ মানুষের চোখের তিনগুণ বেশি শক্তিশালী হয়। নিমেষের মধ্যে জ্বলে ওঠা মুক্তারামবাবুর চোখে সেই শ্যেনদৃষ্টিই প্রত্যক্ষ করলাম। হীরকবরণের কলজে পর্যন্ত যেন এফোঁড় ওফেঁড় হয়ে গেল সেই চাহনিতে। ইস্পাতের ছুরির মতো ধারালো হাসি হেসে বললেন চিবিয়ে চিবিয়ে–তাই এত রাতে এলেন টাকা নিতে। হীরকবাবু, আমি ক্রিমিন্যাল চরিয়ে খাই। এত বোকা আমাকে ঠাওরাবেন না। এরা কোত্থেকে আসছেন আমি জানি। আপনি দশহাজার টাকা যে সোজা পথে পাননি–সেটাও আঁচ করেছিলাম বলে ঝুটঝামেলায় যেতে চাইনি। টাকা রেখেছিলাম কিন্তু প্রত্যেকটা নোটের পেছনে আপনাকে দিয়ে ইনিসিয়াল করিয়ে নিয়েছিলাম। নিন আপনার টাকা।
সিন্দুক খুলে তৎক্ষণাৎ দশহাজার টাকা বার করে দিলেন মুক্তারামবাবু। প্রত্যেকটা নোটের পেছনে ছোট সই করে তারিখ দিয়েছেন হীরকবরণ। আমরা যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেলাম। সই করা অরিখ দেওয়া নোটগুলোই এখন হীরকরণের বিরুদ্ধে অকাট্য প্রমাণ। লিকুইড কেকে এক নিমেষে সলিড গ্রাউন্ডে দাঁড় করিয়ে দিলেন হুঁশিয়ার, দূরদর্শী মুক্তারামবাবু। এখন হীরকরণ বলতে পারবেন না–এ নোট আমি নিইনি। নম্বরী নোট ব্যাঙ্কের হিসেবের সঙ্গেও মিলে যাবে।
মিলেও গেল। সন্তোষজনকভাবে প্রমাণিত হয়ে গেল হীরকব্রণ মুখার্জির কুকীর্তি।
হীরকবরণকে নিয়ে যাওয়া হল টিম্বার মার্চেন্ট কুঞ্জবিহারী গড়াইয়ের সামনে। কনট্রোলার অফ ওয়াগনূসের অধঃপতনের কাহিনি শুনে ভদ্রলোক মনে হল মূৰ্ছা যাবেন। জীবনে তিনি এরকম একজন স্বনামধন্য অফিসারকে এত হীন কাজ করতে দেখেননি। হ্যাঁ ঘুষ-টুষ নেন অনেকেই হীরকবরণ মুখার্জি জীবনে একটা আধলাও কারো কাছে নেন নি–ঘুষ তো দূরের কথা–ধার পর্যন্ত নিতেন না। অফিসে ব্যবসায়ী মহলে তাই হীরকবরণ বলতে হীরের টুকরোই বোঝাত।
সেই হীরকবরণ তার চেকবই থেকে একটি চেক ছিঁড়ে নিয়েছেন, একথা তিনি বিশ্বাস করবেন কী করে? মাস কয়েক আগে উনি এসেছিলেন গড়াই মশাইয়ের অফিসে। প্রায় আসতেন কুঞ্জবিহারীবাবুও যেতেন। কন্ট্রোলার অফ ওয়াগকে খাতির করতে হত, হাতে রাখতে হত–তাতে ওয়াগন সহজে পাওয়া যেত, কাঠ চালান নইলে অসম্ভব এই ওয়াগন-আকালের দিনে।–বিশেষ করে ওই অঞ্চলে। কিন্তু হীরকবরণ পয়সা নেন না–তাই নতুন বছরে একটা ডায়েরি দিয়েছিলেন। দামি ডায়েরি। কাকে কটা ডায়েরি দেওয়া হল, সে হিসাব নিজে হাতে লিখে রাখেতেন কুঞ্জবিহারীবাবু–যাতে সামনে বছর ডাইরি দিয়ে আপ্যায়নে ভুল-ত্রুটি না হয়। সেই খাতা বার করে দেখালেন নাম লেখা রয়েছে হীরকবরণ মুখার্জির।
কিন্তু চেক দুখানা কীভাবে সরালেন হীরকবরণ; সেই পি-এ ছোকরাকে টাকা খাইয়ে কি? এ প্রশ্নের উত্তরে সত্যবাদী রূপে বিখ্যাত হীরকবরণ সত্যি কথাই বললেন।
ডাইরি হাতে নেওয়ার মুহূর্ত পর্যন্ত নাকি চেক চুরির কোনও প্ল্যান তার মাথায় ছিল না। এসেছিলেন কাজের কথা বলতে। সে কথা হয়েছে, ডায়েরিও পেয়েছেন নববর্ষের শুভেচ্ছাসহ, উঠে পড়লেই পারতেন–কিন্তু উঠলেন না। এদিকে খেতে যাবার সময় হয়েছে কুঞ্জবিহারী গড়াইয়ের। হীরকরণ মুখার্জিকে লাঞ্চের নেমন্তন্নও করলেন তিনি। দুজনে একদিন ভালোমন্দ খেলে ক্ষতি কি। কিন্তু হীরকবাবু গেলেন না। উৎকোচ-নির্লোভ বলেই বোধহয় গেলেন না। এই মনে করে কুঞ্জবিহারীবাবু বললেন–তাহলে আপনি একটু বসুন, আমি যাব আর আসব। সায় দিলেন হীরকবাবু। ঘর ফাঁকা হতেই উঠে গিয়ে দেখলেন ড্রয়ারে চাবি দেওয়া নেই। স্বপন জিগ্যেস করল–এই যে বললেন চেক চুরির কোনও প্ল্যান আপনার ছিল না–তাহলে ড্রয়ার দেখতে গেলেন কেন? হীরকবরণ বললেন–কি জানি কেন হঠাৎ মনে হল দেখিই না কি আছে ড্রয়ারে। প্রথম ড্রয়ারে পেলাম চেকবই। কি যে দুর্মতি হল, তৎক্ষণাৎ খান দুই চেক একেবারে গোড়া থেকে ছিঁড়ে বার করে নিলাম চেক বইয়ের ভেতর থেকে। কিছুক্ষণ পরেই ফিরে এলেন কুঞ্জবিহারীবাবু। চা খেয়ে অফিসে চলে এলাম। নেক্সট উইকে কলকাতা গিয়ে তুললাম চব্বিশ হাজার টাকা।
সব তো হল। কিন্তু মোটিভ কই? মোটিভ ছাড়া ক্রাইম সচরাচর হয় না। মোটিভ ছাড়া যারা ক্রাইম করে, তারা বিকৃত মস্তিষ্ক। জ্যাক দি রিপারের মতো উন্মাদ। ক্লেপটোম্যানিয়্যাকরা যেমন চুরি করে আনন্দ পায়–তেমনি আর কি! কিন্তু হীরকবরণ মুখার্জি সজ্জন। সুস্থমস্তিষ্ক এবং জীবনে প্রতিষ্ঠিত পুরুষ। তাঁর অভাব নেই, লোভ নেই। তা-সত্ত্বেও এতবড় অন্যায় কেন করলেন? মোটিভ কী?
এ কাহিনির সেইটাই সবচেয়ে মর্মান্তিক অংশ। হীরকবরণ মুখার্জি বিবেকবান সজ্জন পুরুষ–তাই বিবেকদংশন সহ্য করতে না পেরে এক অন্যায়কে ঢাকতে আর এক অন্যায় করে বসলেন। ক্ষণিকের ভুলে পদস্থলন তার হয়েছিল। জীবনে কখনো পাপ করেননি বলেই একটিমাত্র পাপের অনুতাপে তিনি জ্বলে পুড়ে যাচ্ছিলেন। তাই প্রায়শ্চিত্ত স্বরূপ আর একটি পাপের সঙ্গে পা বাড়ালেন।
মায়াবী মোটিভ একেই বলে।
হীরকবরণ মুখার্জির ডিপার্টমেন্টে রামতনু বলে একটি ছেলে কাজ করত। ছেলেটির দুনিয়ায় কেউ নেই–একটিমাত্র বোন ছাড়া। বোনটির বয়স যখন সতেরো, ঠিক তখন রামতনুকে বদলি হতে হল নর্থ-ইস্ট ফ্রন্টিয়ার রেলওয়েরই এমন একটা দুর্গম জায়গায় যেখানে অনুঢ়া বোনকে নিয়ে যাওয়া সেই মুহূর্তে সম্ভব নয়। রামতনুর মাইনেও এমন কিছু বেশি নয়। মেসে থেকে বাসাবাড়ি খুঁজতে হবে। তদ্দিনের জন্যে বোনটিকে কোথায় রাখা যায়?
