কোথায় আবার বাড়িতে। এই তো আজ সকাল কাঁদতে কাঁদতে বেলঘরে গেল। বলিহারি যাই আপনার আক্কেলকে। আমাদের গুডউইল পর্যন্ত টাইট করে ছেড়েছেন মশায়। আজ পর্যন্ত ওঙ্কার মিত্তিরের হোটেলে পুলিশ ঢোকেনি কখনো–আপনার কৃপায়–
এই পর্যন্ত শুনেই অন্তরাল থেকে সামনে এসে দাঁড়ালাম আমি আর স্বপন। স্বপনের হাতে আইডেনটিটি কার্ড। তৎক্ষণাৎ বাকি কথাটা কোৎ করে যেন গিলে নিয়ে চক্ষের নিমেষে হেঁ-হে করে হেসে বললেন ওঙ্কার মিত্তির–আসা হোক! আসা হোক! কী সৌভাগ্য! পেয়েছেন তাহলে বাদলবাবুকে।
পেয়েছি।–অল্পকথার মানুষ স্বপন অল্প কথাতে বললে–হোটেল রেজিস্টার বার করুন।
কাষ্ঠহাসি মিলিয়ে গেল ওঙ্কার মিত্তিরের চারকোল ফেস থেকে। বিনা বাক্যব্যয়ে কাউন্টারের কোণ থেকে রেজিস্টার টেনে নিয়ে এগিয়ে দিল স্বপনের দিকে।
খাতায় লেখা হীরকবরণ মুখার্জির আর এক নাম–বাদল ভৌমিক। এসেছেন সপরিবারে। স্ত্রী, দুই মেয়ে এবং ছেলেকে নিয়ে। আজ সকালেই তারা চোখের জল মুছতে মুছতে গেছেন বেলঘরিয়ায়–হীরকবাবুর পৈত্রিক ভিটেতে।
মনে পড়ল হাওড়ার হোটেলে রেজিস্টারেও হীরকবরণ লিখেছিলেন বেলঘরিয়ায় যাচ্ছি। এই একটা ব্যাপারে তিনি মিথ্যার আশ্রয় নেননি। বিপদের আশংকা নেই জেনেই নেননি। ভয় আসল ওই নামকে নিয়ে। ওই জন্যে দু-হোটেলে লিখেছেন দুটো নাম।
স্বপন বের কর হীরকবরণের আর একটা ফটোগ্রাফ। পেছনে ওঙ্কার মিত্তিরকে দিয়ে হোটেলের রবার স্ট্যাম্প মারিয়ে সই করিয়ে নিল যে ফটো যার তিনি বাদল ভৌমিক নামে অমুক তারিখ থেকে অমুক তারিখ পর্যন্ত বেঙ্গল কেবিনে থেকে রহস্যজনক ভাবে নিখোঁজ হয়েছিলেন। মিসিং স্কোয়াডে খবর দেওয়া হয়েছিল। রেডিওতে অ্যানাউন্সমেন্ট হয়েছিল, হাসপাতালে খোঁজ নেওয়া হয়েছিল।
ঠিক এই অনুমানটি করেছিল স্বপন–দি পুলিশ ডিটেকটিভ। যে লোক কলকাতার বাইরে থেকে এসে একবার হোটেলে উঠেছে, সে নিশ্চয় এবারও হোটেলে উঠেছে। এই কদিন যদি একজন বোর্ডার উধাও হয়ে গিয়ে থাকে, মাথা বাঁচাবার জন্যে ম্যানেজার মিসিং স্কোয়াডের শরণাপন্ন হবেই। সুতরাং…
সেই রাতেই জিপ হাঁকিয়ে গেলাম বেলঘরিয়ায়। হীরকবরণের বাড়ি দেখে তাক লেগে গেল। ভালো কথা, রুটিন জেরার সময় হীরকবরণ বলেছিলেন, তার বাবা নেই, বউ নেই, কেউ নেই। বউ যে আছে ওঙ্কার মিত্তিরের কাছে শুনে এসেছিলাম। বাড়িতে ঢুকে দেখলাম, বাবাও আছেন। সত্তর বছরের বৃদ্ধ। হীরকবরণ তার একমাত্র সন্তান। পুত্রগর্বে গর্বিত। আজকালকার বাজারে এরকম একটা চাকরি করা ভাগ্যের ব্যাপার। হীরকবরণ বাড়িতে কম কথা বলেন। ব্যক্তিত্ব রাখেন। এমনকি পিতৃদেবও অকারণে কথা বলেন না ছেলের সঙ্গে। মেয়ে, ছেলে, বউও মুখ তুলে কথা বলেন না তার সামনে। পাড়াপড়শি সম্মান করে। সবাই জানে তিনি কৃতি পুরুষ। জীবন সংগ্রামে বিজয়ী পুরুষ।
আমরা কথা রেখেছিলাম, হ্যান্ডকাফ দিইনি। এমনকী বাপকেও সব কথা বলিনি–সেই মুহূর্তে। কিন্তু অত রাতে পুলিশ জিপে ছেলেকে আধমরা চেহারায় ফিরতে দেখে বুঝলেন অভাবনীয় কিছু ঘটেছে। তারপর যখন ছেলে শোবার ঘরে ঢুকে দেওয়ালের সিন্দুক খুলে বার করল থরে থরে সাজানো আনকোরা সোনার গয়না–তার তখন আর কিছুই বুঝতে বাকি রইল না।
লিস্ট করলাম গয়নার।
গয়নার সঙ্গেই ছিল সব ক্যাশমেমো। দাম ফেলে যোগ করলাম। মোট চোদ্দ হাজার। আর পাওয়া গেল খানকয়েক ফুলস্ক্যাপ কাগজ। তাতে প্রায় দুশো বার কুঞ্জবিহারী গড়াইয়ের নামটা সই করা। মস্ক করেছেন হীরকবরণ।
এই পর্যন্ত যখন এগিয়েছি, বাড়িতে তখন চাপা কান্না শুরু হয়ে গেছে। বাড়িশুদ্ধ লোক জানত, হীরকবরণ এত গয়না কিনেছেন বিবাহযোগ্য দুই মেয়ের জন্যে, সেই মেয়ে দুটিই রাঙা চোখে কাঁদতে কাঁদতে এসে গায়ের বারোমেসে গয়না পর্যন্ত খুলতে আরম্ভ করল–যাতে বাবা ছাড়া পায়। বছর কুড়ি-বাইশ বয়স হবে মেয়ে দুটির। মার্জিত মুখশ্রী। কিন্তু ভয়ে উদ্বেগে উৎকণ্ঠায় মাথার ঠিক নেই। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে একটার পর একটা চুড়ি খুলে নামিয়ে রাখতে লাগল আমার আর স্বপনের পায়ের কাছে। পুলিশের কাজ করলেও আমরা মানুষ। ঘরসংসার করি। ভেতরে বিচলিত হলেও অবিচল থাকতে হল বাইরে।
কিন্তু বাধা দিলেন হীরকবরণ নিজেই।
বললেন–ও গয়না আমার টাকায় কেনা। চোদ্দো হাজারের হিসেব এই গয়নায় দিলাম।
বাকি দশ হাজার?–অনেক কষ্টে নীরস গলায় জিগ্যেস করলাম আমি।
তাও আছে। আসুন।
নীচে নেমে এলাম। বৃদ্ধ সুনীলবরণ, হীরকবরণের বাবা হাত জড়িয়ে ধরলেন স্বপনের আর আমার। কেলেঙ্কারী যেন না হয়–ওই তাঁর একমাত্র ছেলে। সচ্চরিত্র, শিক্ষিত, দায়িত্বসম্পন্ন। এতবড় ফ্যামিলি রয়েছে ওর মাথার ওপর। হীরক আজ রাতে ফিরবে তো?
কথা দিতে পারলাম না। জিপে ওঠালাম হীরকবরণকে। একটা ঠিকানা দিলেন উনি। জায়গাটা বেলঘরিয়াতেই অ্যাডভোকেটের বাড়ি।
বললেন–দশহাজার টাকার জমি কিনব ঠিক করেছিলাম। টাকাটা গচ্ছিত রেখেছিলাম অ্যাডভোকেটের কাছে। জমির দালালকে বলা ছিল সেরকম জমি পেলেই যেন দেখা করে ওঁর সঙ্গে।
অ্যাডভোকেটের নাম মুক্তারামবাবু। প্রবীণ, বিচক্ষণ, হুঁশিয়ার। প্রথম কথাতেই প্রকাশ পেল তাঁর চরিত্রে সদাসতর্ক বৈশিষ্ট্য। বেরিয়ে এলেন খালি গায়ে। ব্রাহ্মণ। চওড়া বুকে সাদা পৈতে। মুখে বুদ্ধির ছাপ। তীক্ষ্ণ চোখে দেখলেন আমাকে আর স্বপনকে।
