হালে পানি না পেলে শেষ পর্যন্ত থার্ড ডিগ্রির শরণাপন্ন হতে হয়। স্বীকার করছি কাজটার মধ্যে খুব বীরত্ব নেই। কিন্তু রেজাল্ট নিয়ে আমাদের দরকার। একটা লোক কুকর্ম করেছে বুঝতে পারছি, হাতেনাতে ধরেও ফেলেছি, অথচ সাজা দেওয়া যাবে না প্রমাণের অভাবে হাসতে হাসতে হারিয়ে যাবে জনঅরণ্যের মধ্যে। আরও কতজনের সর্বনাশ করবে–ভাবা যায় না। এইজন্যেই জানবেন থার্ড ডিগ্রির হেল্প নিতে হয়। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার জন্যে, অপরাধীকে অপরাধ কবুল করানোর জন্যে অশাস্ত্রীয় যদি কিছু করি তো জানবেন সেটা মহৎ উদ্দেশ্যেই করা–নিজের স্বার্থে নয়।
কিন্তু হীরকবরণ সবকটা পরীক্ষায় পাস করে গেলেন। মানে কোনওরকমেই তাঁকে কবুল করানো গেল না। সাত দিন হয়ে গেছে। রেডিওগ্রামের জবাব তখনও আসেনি। আমরা বেদম হয়ে পড়েছি। রাত হয়েছে। আমার চেয়ারের বাঁ-ধারে মেঝের ওপর উপুড় হয়ে বসে আছেন হীরকবরণ। এককথায় তখন তার জর্জরিত অবস্থা বললেই চলে। চুপসে গেছেন। মুখের সে চেকনাই আর নেই। চোখের চাপা তীক্ষ্ণতাও নেই। আমার চেয়ারের ডানদিকে দাঁড়িয়েছিল স্বপন।
বলল–বিশুদা, তাহলে লকআপ পাশ লিখে একে সেন্ট্রাল লকআপে পাঠানো যাক?
তাই করো–বললাম আমি।
স্বপন কিন্তু লকআপ পাশ না লিখে টেলিফোন রিসিভার তুলে নিল। শুনলাম অপারেটরকে বলছে–মিসিং স্কোয়াড দিন। শুনলাম বটে, কিন্তু মিসিং স্কোয়াড কেন চাইছে, তা ভাবলাম না। জিগ্যেস করলাম না। হাতের কেসের সঙ্গে মিসিং স্কোয়াডের যে কোনও সম্বন্ধ থাকতে পারে, তা কল্পনাতেও আনতে পারিনি। আমি কেন, নাটের গুরু স্বয়ং হীরকবরণও তিলমাত্র সন্দেহ করেননি– আঁচ করতেও পারেননি কম কথার মানুষ স্বপন চৌধুরী, ভবিষ্যতের এ-সি-ডি-ডি (ওয়ান) স্বপন চৌধুরী কোন লাইনে যাচ্ছে, কি মোক্ষম প্যাঁচে ঘায়েল করতে যাচ্ছে বোবা হীরকবরণকে। নিঝুম হয়ে হীরকবরণ তখন মেঝের পানে চেয়ে ভাবছিলেন বোধহয় ওঁর দুর্দৈবের কথা। আর ভাবছিলাম মোগল আমল হলে এত প্রমাণ-টমাণের কেউ ধার ধারত না। হাতির তলায় ফেলে হীরকবরণের বুকের ওপর হাতির একটা পা চালিয়ে দিলেই মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসত স্বীকারোক্তি। স্বপন তখন ফিনিশিং টাচ দিচ্ছে টেলিফোনে। ওস্তাদের মার শেষ রাত্রেই হয়। কথাটা যে কত বড় সত্যি, স্বপনের কেদানি দেখে সেদিন বুঝলাম। হয়তো গোড়া থেকেই আঁচ করে রেখেছিল, কোন লাইনে ল্যাং মারবে হীরকবরণকে–কিন্তু ইচ্ছে করেই বলেনি এতক্ষণ। হীরকরণের হিরে চকচকে চেহারায় কালি না পড়া পর্যন্ত, মনোবল ভেঙে না যাওয়া পর্যন্ত চুপ করে থেকেছে। তারপর সময় বুঝে ছেড়েছে তুরুপের তাস। রিয়্যাল ডিটেকটিভ একেই বলে। স্রেফ ঝোঁপ বুঝে কোপ মারা, বুদ্ধির খেলায় হারিয়ে দেওয়া, নাটক সৃষ্টি করে ক্লাইম্যাক্সে পৌঁছে আচম্বিতে অতর্কিতে অপরাধীর মন ভেঙে চুরমার করে দেওয়া।
দেহে মনে আমিও তখন অবসন্ন। তাই অন্যমনস্ক ভাবে শুনলাম স্বপন বলছে–হ্যালো মিসিং স্কোয়াড? তারপর শুনলাম একটা চেহারার ডেসক্রিপশন বলে গেল। কিছুক্ষণ কান পেতে শুনল। সবশেষে রিসিভার নামিয়ে রেখে চেয়ার টেনে নিয়ে বসে বললে–দাও, লকআপ পাশটা লিখে ফেলি।
লিখতে লিখতে মাথা নীচু করে বললে–বাদলবাবু, বেঙ্গল কেবিনে ওয়াইফকেও বলে আসেননি?
ঘরের মধ্যে আমি আর হীরকবরণ ছাড়া বাদলবাবু বলে কেউ নেই। কিন্তু বাদলবাবু নামটা শুনে হীরকবরণের গায়ের ওপর যেন এক গামলা গরম জল ঢেলে দেওয়া হল। তিড়বিড়িয়ে লাফিয়ে উঠেই ছাইয়ের মতো ফ্যাকাশে বিবর্ণ মুখে চেয়ে রইলেন স্বপনের পানে।
স্বপন লেখা থামিয়ে খুব সহজভাবে মুখ তুলে বলল–আসবার সময়ে বলে এলেই পারতেন। ভাবনা চিন্তা হয়তো!
হীরকবরণের মুখের চেহারা তখন আপনাকে বলে বোঝাতে পারব না। ঠোঁটের পাশে চামড়া কাঁপছে থিরথির করে, চোখদুটো যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাইছে বাইরে–মুখের কোথাও আর সেই অনমনীয় দৃপ্ত মনোভাবের তিলমাত্র ছায়া নেই। নকআউট করেছে স্বপন। মিডল উইকেট ডাউন।
ঢোঁক গিলে স্বপনকে বললেন হীরকবরণ–স্যার, একটু পাশের ঘরে আসবেন? উঠে দাঁড়িয়ে স্বপন বললে–চলুন। আমাকে চোখের ইঙ্গিতে বসতে বলে হীরকবরণকে নিয়ে গেল পাশের ঘরে। পরে শুনলাম, কী হয়েছিল সেখানে। সটান স্বপনের দু-পা জড়িয়ে ধরেছিলেন হীরকবরণ। বলেছিলেন– আমি সব বলব স্যার কিন্তু দয়া করে হ্যান্ডকাফ লাগিয়ে বাড়ি নিয়ে যাবেন না। বন্ধুর মতো সঙ্গে চলুন। সব ফিরিয়ে দেব। কিন্তু বাড়ির লোকের সামনে, পাড়াপড়শির সামনে হাতকড়াটা লাগাবেন না।
নিজে থেকেই সব কবুল করে বললেন হীরকবরণ। বাদলবাবু–এই ছদ্মনামটি এবং হ্যারিসন রোডের বেঙ্গল কেবিনের নাম শুনেই হীরকবরণ ধরে নিয়েছিলেন–স্বপন চৌধুরী সারাদিন এত কম কথা বলেছে সব জানে বলে। সুতরাং মান বাঁচাতে প্রাণ খুলে কথা বলাই ভালো।
জিপে হীরকবরণকে বসালাম আমার আর স্বপনের মাঝখানে। কিন্তু সাবধান থাকার আর দরকার ছিল না। হীরকবরণ তখন সব টাকা ফিরিয়ে দিয়ে ইজ্জত বাঁচাতে চান। নিজেই পথ দেখিয়ে নিয়ে গেলেন হ্যারিসন রোডের বেঙ্গল কেবিন হোটেলে। ফ্যামিলি হোটেল। আগে এগিয়ে দিলাম হীরকবরণকে। ম্যানেজার গোল কাউন্টারের সামনে বসে আলপিন দিয়ে দাঁত খুঁটছিলেন। যেন কাঠকয়লা দিয়ে তৈরি একটা ফ্রানকেন্সটাইন মূর্তি। যেমন বিরাট মুখ, তেমনি বিরাট চেহারা। হীরকবরণকে দেখেই আলপিন নামিয়ে হাঁ-হাঁ করে উঠলেন–আচ্ছা বেআক্কেলে লোক তো মশাই আপনি। কোথায় ডুব দিয়েছিলেন? ওয়াইফকেও তো বলে যাবেন? থানা-পুলিশ পর্যন্ত হয়ে গেল। ছিঃ ছিঃ ছিঃ। পেছন ফিরে আমাদের দেখে নিয়ে ক্লিষ্ট কণ্ঠে বললেন হীরকবরণ–ওরা কোথায়?
