দোয়েল দত্ত চতুর ব্যক্তি। বুঝলেন, জল কোন দিকে গড়িয়েছে। তিনি সন্দেহমুক্ত। কিন্তু হীরকবরণ জড়াতে চাইছেন আঁকে!
তাই ঈষৎ কঠিন কণ্ঠে বললেন–হ্যাঁ লেগেছে।
গতবারও যদি ধরা পড়তেন, একই সাফাই গাইতেন হীরকবাবু, তাই না? অ্যালিবি রেডি করেই এসেছিলেন।
গতবার ধরা পড়তাম মানে? হোয়াট দি হেল ইউ মীন?
আই মীন ইউ আর এ পাক্কা ক্রিমিন্যাল, মিঃ হীরকবরণ মুখার্জি, চিবিয়ে চিবিয়ে বললাম আমি।–চব্বিশ হাজার টাকার চেকে সই জাল করে ভাঙিয়ে নিয়ে যাওয়ার মতো বুকের পাটা যার-তার থাকে না।
মুখ লাল হয়ে গেল কনট্রোলার অফ ওয়াগসের।–স্পিক প্রপারলি। আপনার মতো পেটি পুলিশ অফিসারের তক্তা নড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা আমার আছে জানবেন।
বিনীতকণ্ঠে বললাম–জানলাম। আপনিও জানুন, এই মুহূর্ত থেকে আপনি আনডার অ্যারেস্ট। রেডিওগ্রাম পাঠাচ্ছি পাণ্ডুতে। জবাব এলে তারপর দেখা যাবে।
রেডিওগ্রামের জবাব আসতে সাত আট দিন দেরি হবে ভাবিনি। বসেও থাকিনি। সমানে জেরা করে গিয়েছি কন্ট্রোলার অফ ওয়াগকে।
প্রথম দিনের কথা বলা যাক।
একরাত পুলিশ হাজতে থেকে মুখটা একটু শুকিয়ে গেলেও মেজাজটা একটু গরম হয়েছে দেখলাম হীরকবরণ মুখার্জির। তেল শুকায় সব মিঞারই লক-আপে রাত্রিবাস করলে। পাঁচরকম থার্ডক্লাস ক্রিমিন্যাল, প্রজাদের গন্ধ এবং উদ্বেগ-ভদ্রসন্তানরা সইতে পারে না।
কিন্তু হীরকবরণ মুখার্জির ধাত খুব কড়া। খুব বেশি টসকাননি।
টেবিলের সামনে থেকে ইচ্ছে করে সব চেয়ার সরিয়ে নিয়েছিলাম। দাঁড়িয়ে রইলেন হীরকবরণ। তীব্র চোখ পর্যায়ক্রমে চাইতে লাগলেন আমার আর স্বপনের দিকে। আমরাও টেবিলের ওপর আঙুল দিয়ে টকটক করতে নিরীক্ষণ করলাম তার মুখচ্ছবি। দেখলাম, হীরকবরণের চোখে একটা চাপা তীক্ষ্ণতা আছে। না রাগলে তা প্রকাশ পায় না। এ জাতীয় তীক্ষ্ণ বাজপাখির চোখের দিকে চাইলে দেখা যায়।
বললাম–ভালো আছেন?
ডেকেছেন কেন?
রেগে আছেন মনে হচ্ছে?
সমুদ্র দেখেছেন?
কি কথার কি জবাব। সাবধানে বললাম–দেখেছি। আপনি
আমি নিজে সমুদ্র। এমনিতে শান্ত-ঝড় উঠলে ভয়ংকর। আমার রাগের নমুনা যথা সময়ে টের পাবেন। প্রেসিডেন্ট অফ ইন্ডিয়া আমার কলেজ ফ্রেন্ড খেয়াল রাখবেন।
রাখলাম। এখন যা জিগ্যেস করব তার জবাব দিন। আপনার অফিস পাণ্ডুতে। কলকাতায় এসেছিলেন কেন?
বলব না।
বললে আপনার ভালো হত না?
সেটা আমি বুঝব। আমার প্রেস্টিজ আমার কাছে।
ও। প্রেস্টিজ যাবার ভয়ে বলবেন না কার কাছে এসেছিলেন?
হীরকবরণ জবাব দিলেন না।
স্বপন বললে–কোথায় উঠেছিলেন?
বলব না।
স্বপন খুব কম কথা বলে। এই জবাবের পর একটি কথাও বলল না। দাঁড়িয়ে উঠে আমাকে বললে–চলো বিশুদা। হোটেলগুলোয় ঘুরে আসি। হীরকবরণ সামান্য ভুরু কুঁচকোলেন। আমি বললাম–চলুন আপনার ফটো নেওয়া যাক।
পুলিশ ফটোগ্রাফার তৎক্ষণাৎ হীরকবরণের ছবি তুলে খানকয়েক এনলার্জমেন্ট দিয়ে গেল টেবিলে। জিপ নিয়ে আমি আর স্বপন বেরিয়ে পড়লাম। কলকাতা আর হাওড়ার সবকটা প্রথম আর দ্বিতীয় শ্রেণির হোটেলে গিয়ে ছবি দেখালাম। রদ্দিমার্কা হোটেলগুলো বাদ দিলাম–কেননা হীরকবরণ মুখার্জির মতো চালিয়াৎ লোক এসব হোটেলে যাবে না অনেক খোঁজবার পর হাওড়ার একটা হোটেলে ফটো দেখেই চিনে ফেললেন ম্যানেজার। হোটেল রেজিস্টার খুলে দেখালেন, হীরকবরণ সেখানে নিজের নাম লিখিয়েছে প্রবাসজীবন হালদার।
ম্যানেজার অবশ্য হলফ করে বললেন, ছবিটা প্রবাসজীবনেরই। আরও বললেন, মাস কয়েক আগে ভদ্রলোক হোটেলে উঠেছিলেন। দিন কয়েক ছিলেন।
হোটেল-বাস সাঙ্গ করে চলে যাওয়ার সময়ে সব হোটেল রেজিস্টারে লিখতে হয় কোথায় যাওয়া হচ্ছে। প্রবাসজীবন সেই ঘরে লিখেছিল–বেলঘরিয়া।
ফটোর পেছনে হোটেল ম্যানেজারকে দিয়ে লিখিয়ে নিলাম, এঁর নাম প্রবাসজীবন হালদার। অমুকদিন থেকে অমুকদিন পর্যন্ত এই হোটেলে ছিলেন। যাওয়ার সময়ে বেলঘরিয়ায় যাচ্ছি লিখে গিয়েছিলেন। হোটেলের সীল দিয়ে সই করে দিলেন ম্যানেজার।
অফিসে এসে হীরকবরণকে দেখালাম লেখাটা। যেন অদৃশ্য হাতে একটা চড় খেলেন ভদ্রলোক। মুখ লাল হয়ে গেল। ভালো খেয়ে দেয়ে এমনিতেই লাল-লাল চেহারা। তার ওপর মিথ্যে ধরা পড়ে যাওয়ার লাঞ্ছনা। দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে ধরে ছেড়ে দিয়ে বললেন–হ্যাঁ, আমার ছবি, আমারই ছদ্মনাম, তাতে হয়েছে কী?
ছদ্মনাম নিলেন কেন?
আমার খুশি। ভারতীয় সংবিধানে নতুন নাম নেওয়ার বিরুদ্ধে কোনও বিধান আছে কি?
আমার জানা নেই। শুধু এইটুকু জানি চোর-বাটপাররা নাম ভঁড়ায়, সাধু-সত্যবানরা নয়–বেলঘরিয়ায় গিয়েছিলেন কার কাছে?
যাইনি। একটা কিছু লিখতে হয়, তাই লিখেছিলাম।
আমি চোখ পাকিয়ে চেয়ে রইলাম, হীরকবরণ ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি দুলিয়ে চেয়ে রইলেন। কম কথার মানুষ স্বপন ততক্ষণে ফের আঙুল দিয়ে টরেটক্কা বাজিয়ে চলেছে টেবিলের ওপর। যেন সংকেতে বলতে চাইছে, বিশুদা, এ-বড় শক্ত চাই। এ ভাঙবে তবু মচকাবে না। চেক ওর, জাল সইটাও ওর, আগের টাকাও এ নিয়েছে কিন্তু প্রমাণ নেই, এভিডেন্স নেই, ব্লু নেই। রেডিওগ্রামের জবাব আসার পর যখন শুনবে হ্যাঁ, ইনিই দোর্দণ্ডপ্রতাপ কনট্রোলার অফ ওয়াগ, তখন মানে মানে ছেড়ে দেওয়া ছাড়া পথ পাবে না, বিশুদা, এ বড় শক্ত চাই।
