কিন্তু জিগ্যেস তো করা হল শুধু আমাকে। গজাননের গলা তীক্ষ্ণ হয়ে গেছে।
আপনার মুখ এখানে নতুন বলে,–বলেই রামভেটকি নোটবই বের করে একটা পাতা খুলে বলল, যা লেখা আছে, তাই বলুন।
দেখল গজানন। একটাই মন্ত্র। ছোট্ট।
বলল, হ্রীং।
ক্রিং। বলল রামভেটকি।
ক্রিং। বলল এলোকেশী।
পথ ছেড়ে সরে দাঁড়াল প্লেন ড্রেসের কম্যান্ডো।
গাড়ি ছেড়ে নেমে পড়েছে তিনজনে। গাছপালার মধ্য দিয়ে কিছুদূর যেতেই চোখে পড়ল একটা কটেজ প্যাটার্নের বাড়ি। দু-দিকে অ্যাসবেসটসের এবং অন্য দু-দিকে লাল টালির ঢালু ছাদ। অ্যাসবেসটসের চালে আঁকা একটা লাল হরতন।
এটা কি তাসের দেশ? বলে ফেলেছিল গজানন।
রামভেটকি কিছু না বলে গটগট করে গিয়ে দাঁড়াল দরজার সামনে। দরজা মানে একটা গোটা টেক্কা তাস। সামনে দাঁড়াতে-না-দাঁড়াতেই পাল্লা সরে গেল পাশে। পরপর ঢুকে এল তিনজনে। গজানন দেখল ও-পাশে আর একটা ঘর। এদিকের দরজা থেকে ওদিকের দরজা পর্যন্ত তেরোজন ঘণ্ডামার্কা কম্যান্ডো দাঁড়িয়ে লাইন দিয়ে। প্রত্যেকেই অ্যাটেনশন ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে চেয়ে আছে সামনের দিকে।
এদের সামনে দিয়ে গজানন, রামভেটকি আর এলোকেশীকে যেতে হল ওদিকের দরজার সামনে এবং যাওয়ার সময়ে আড়চোখে গজানন দেখলে প্রত্যেকেই খর চোখে দেখে নিচ্ছে তিনজনের মুখ, কেউ-কেউ হাতের ছবির সঙ্গে মিলিয়ে দেখছে ঠিক লোক যাচ্ছে কিনা সামনে দিয়ে। গজাননের ছবিও তাহলে আছে এদের কাছে।
সামনের দরজা আপনা হতেই খুলে গেল রামভেটকি কপাটের সামনে হাজির হতেই। ভেতরে একটা লম্বা টেবিলে শোয়ানো খান বুদোশের বীভৎস দেহাবশেষ। পাশে দাঁড়িয়ে দাড়িওলা এক বৃদ্ধ। চোখে চশমা, গায়ে সাদা অ্যাপ্রন।
পরিচয় করিয়ে দিল রামভেটকি, জিরো জিরো গজানন, ইনিই আমাদের ব্যালিস্টিক এক্সপার্ট ডক্টর সিঙ্কারো। এককালে হিটলারের কনসেনট্রেসন ক্যাম্পে ছিলেন। গ্যাস চেম্বারে ঢুকে ছেলেবেলায় মরতে-মরতে বেঁচে গেছিলেন। সিঙ্কারো ওঁর ছদ্মনাম, আসল নাম জানলে বুঝবেন হিটলারের কত কাছের লোক ছিলেন ইনি। ডক্টর সিঙ্কারো, কী বুঝলেন? যে অস্ত্র দিয়ে এইভাবে মানুষ খুন করা হচ্ছে, তা তৈরি হয়েছে কোন দেশে?
নো, ছোট্ট জবাব ডক্টর সিঙ্কারোর। বৃদ্ধের চুলগুলো ধবধবে সাদা, এলোমেলো, অনেকটা আইনস্টাইনের মতো মুখে কেবল পাইপটা নেই।
তার মানে কোন দেশ আমাদের পেছনে লেগেছে, তা জানা যাচ্ছে না। আর কোনও খবর? কাঁপা গলায় আশ্চর্য বাংলা বলে গেলেন ডক্টর সিঙ্কারো। গজানন তো হতবাক।
হিটলার যখন বাঙ্কারে বসে বার্লিনের সাবওয়েতে জল ঢুকিয়ে গাদাগাদা মানুষকে ইঁদুরের মতো চুবিয়ে মারছে, তখন একজন বলেছিল, নতুন অস্ত্রটা এদের ওপর পরখ করুন নাজলে চুবিয়ে মেরে কী হবে? চেহারাগুলো হবে এই রকম। বলে একটা কন্ধকাটা নাশ দেখিয়েছিল–যার মুন্ডুটা অবতার সিং-এর মুণ্ডুর মতো মাঝখান থেকে অর্ধেক উধাও।
মাই গড! নিমেষে অ্যাটেনশন হয়ে গেল রামভেটকি। এ অস্ত্র তাহলে জার্মান ব্রেনের?
এগজ্যাক্টলি। কিন্তু এখন আর জার্মানদের হাতে নেই। পরে আমি অনেক খুঁজেছি। অস্ত্রটাকেও চোখে দেখিনি–ডিজাইনও পাইনি।
কীভাবে এরকম গর্ত হচ্ছে বলে মনে হয় আপনার?
মাথা চুলকোলেন ডক্টর সিঙ্কারো, সেইটাই তো মাথায় আসছে না। একটা বিস্ফোরণ ঘটছে। শরীরের মধ্যে কিন্তু রক্ত-মাংস-হাড় সব হাওয়া হয়ে যাচ্ছে কীভাবে, ঠিক বুঝতে পারছি না।
একটা হাতিয়ার হাতে পেয়ে গেলে বুঝতে সুবিধে হবে?
চোখ উজ্জ্বল হল ডক্টর সিঙ্কারোর–নিশ্চয়।
.
গজানন দাঁড়িয়ে আছে মেরিন ড্রাইভার-এর একটা খানদানী হোটেলের বারান্দায়। দুর্গাপুরের জঙ্গল তন্নতন্ন করে খুঁজে খান বুদোশের দলকে আর পাওয়া যায়নি। পায়ে হেঁটে নয়, ট্রেনে চড়ে তারা নাকি এসেছে আমেদাবাদে। দলে আছে গাপ্পা বুদোশ–খান বুদোশের ছোট ভাই। নওজোয়ান গাপ্পা বুদোশ নাকি চেহারায় চলনে বলনে ইউরোপিয়ান। রামভেটকির ধারণা এই গাপ্পাই হল পালের গোদা। ইরান থেকে খেদিয়েছে, এখন কোন দেশের টাকা খেয়ে ইন্ডিয়ায় মানুষ খতম করে চলেছে, তা গাপ্পাকে গায়েব করতে পারলেই ধরা যাবে।
তাই গজানন এসেছে প্রাণটাকে হাতে নিয়ে। একা। কিন্তু ও জানত না ওকে গার্ড দেওয়ার জন্যে এলোকেশীকেও পাঠানো হয়েছে ওর অজান্তে।
জানল বোম্বাই হোটেলে পা দেওয়ার দিনই রাতে। মেরিন ড্রাইভ-এর হাওয়া খেয়ে ঘরে ঢুকতে যাচ্ছে গজানন, এমন সময় নজরে পড়ল মাইক্রো-ক্যামেরাটা টেপ দিয়ে লাগানো দরজার ফ্রেমে পায়ের কাছে।
নিজেই লাগিয়ে দিয়েছিল ঘর থেকে বেরোনোর সময়ে। রামভেটকির দেওয়া ক্যামেরা। ডটপেনের ডগা পেঁচিয়ে খুলে নিলেই বেরোয় এই ক্যামেরা। আর একটা ডটপেনের মধ্যে থাকে মাইক্রোব্যাটারি। পাশাপাশি রাখলেই চুম্বকের টানে জুড়ে থাকে ব্যাটারি আর ক্যামেরা। ক্যামেরা তখন অটোমেটিক হয়ে যায়, অন্ধকারে বা আলোয় ঘরের মধ্যে যে-ই ঢুকুক না কেন, তার ছবি উঠে যাবেই।
ফ্রেমের ফাঁকে প্রায় অদৃশ্য ও খুদে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে হাসল গজানন। এই মুহূর্তে তারও ছবি উঠছে ক্যামেরার। সেকেন্ডে পাঁচটা। বিজ্ঞানের বিস্ময়কর আবিষ্কার।
ঘরে ঢুকল গজানন। দরজা বন্ধ করে দিয়ে আলো জ্বালল। ঘরে কেউ নেই। জামাকাপড় খুলে সটান ঢুকে গেল স্নান ঘরে। পাঁচ তারা হোটেলের স্নান কক্ষ দেখলে দিল্লির বাদশারাও ট্যারা হয়ে যেতেন নিশ্চয়। গজানন তো হবেই। বেলেঘাটায় কে কবে দেখেছে এমন এলাহি ব্যবস্থা।
