কিন্তু জ্ঞানপাপী যে, তার চোখে সব দিকেই থাকে। কাউন্টার থেকে চোখের নির্দেশ কোন দিকে গেল, চোখের কোণ দিয়ে তা দেখেই দিশি সাহেব সই না করেই দৌড় দিলেন দরজার দিকে।
কিন্তু এইখানেই লন্ডন ব্যাঙ্কের চরম এফিসিয়েন্সির পরিচয় পাওয়া গেল। মাস কয়েক আগে জাল সই যারা ধরতে পারেনি তারাই চক্ষের পলকে দেখিয়ে দিলে জালিয়াতকে কীভাবে ধরতে হয়। মুহূর্তের মধ্যে বেজে উঠল অ্যালার্ম বেল–এক সঙ্গে বন্ধ হয়ে গেল সবকটা দরজা। ধরা পড়ল দিশি সাহেব।
কিন্তু চেকটা তখন তার হাতে নেই। গড়াগড়ি খাচ্ছে মেঝেতে। আমরা খবর পেয়ে দৌড়ে গেলাম। গিরে তার তম্বি দেখে অবাক হয়ে গেলাম। পরিচয় শুনে আরো অবাক হলাম। ভদ্রলোক নর্থ ইস্ট ফ্রন্টিয়ার রেলওয়ের কনট্রোলার অফ ওয়াগ। হেডকোয়ার্টার পাণ্ডুতে। পরিচয়পত্র পকেটেই ছিল। নাম, হীরকরণ মুখার্জি।
সত্যি কথা বলতে কি, আমাদের পর্যন্ত সন্দেহ হল–এ কাকে ধরতে কাকে ধরে বসল ব্যাঙ্কের দারোয়ান? হীরকবরণও হম্বিতম্বি করে বললেন–হোয়াট ননসেন্স। কে না কে চেক জাল করেছে তার আমি জানি কী? আমাকে কেন আটকাচ্ছেন?
কুণ্ঠিত গলায় স্বপন বললে–খুবই অন্যায় হয়েছে। কিন্তু আপনি কেন আজ ব্যাঙ্কে এসেছিলেন?
চেক ভাঙাতে নিশ্চয় নয়।
তবে?
বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে।
ব্যাঙ্কে কাজ করেন?
হ্যাঁ। বিল ডিপার্টমেন্টে।
নাম?
জিগ্যেস করবেন তো? করুন না।–দোয়েল দত্ত।
তৎক্ষণাৎ খবর গেল বিল ডিপার্টমেন্টে। সত্যিই দোয়েল দত্ত নামে এক ভদ্রলোক কাজ করেন সেখানে। কেরাণীর কাজ। সেকশন ইনচার্জও নন। তলব পেয়ে এলেন আমাদের সামনে। মাথায় প্রায় সবটুকু টাক দখল করেছে–বয়স সেইজন্যেই বেশি মনে হয়। ফর্সা। পুরু ঠোঁট। নেয়াপাতি ভুড়ি আছে। নিশ্চিন্ত, তৃপ্ত মুখচ্ছবি। সেই মুহূর্তে ঈষৎ উদ্বিগ্ন পুলিশের সামনে আসায়। চেক জালিয়াৎ ধরা পড়েছে। ব্যাঙ্কের সবাই জেনে গিয়েছিল–ইনিও জেনেছেন।
ঘরে ঢুকেই স্বভাবতই আগে কৌতূহল চরিতার্থ করার জন্যে চাইলেন হীরকবরণ মুখার্জির দিকে। ক্ষণেক পিট পিট করে চেয়ে যেন কুয়াশার মুখ দিয়ে অনেক দিন আগেকার চেনা মুখ আবিষ্কার করলেন।
বললেন অবাক কণ্ঠে হীরক না?
কনট্রোলার অফ ওয়াগ তাচ্ছিল্যের সঙ্গে আমাদের দিকে চাইলেন। দোয়েল দত্তর প্রশ্নের জবাব দেওয়ার দরকার আছে বলেও মনে করলেন না।
আমি বললাম দোয়েল দত্তকে–বসুন।
হীরকবরণ আর আমাদের দিকে পর্যায়ক্রমে চেয়ে বসে পড়লেন দোয়েল দত্ত। ভদ্রলোক শান্তিপ্রিয়। তাই অস্বস্তি পেয়ে বসেছে লক্ষ্য করলাম।
এঁকে চেনেন দেখছি। কি সূত্রে চেনেন?–আমার প্রশ্ন।
ক্লাস ফ্রেন্ড। আরামবাগে একসঙ্গে পড়তাম। এক ক্লাশে।
স্কুল ফ্রেন্ড?
আজ্ঞে।
কত বছর আগে?
ত প্রায় বিশ বছর।
আপনি এখন কোথায় থাকেন?
বেলেঘাটায়।
আর উনি কোথায় থাকেন?
তা তো জানি না।
হীরকবরণ মুখার্জি কথা বলতে গেলেন। হাতের ইঙ্গিতে নিরস্ত করলাম।
কেন জানেন না? আপনার বন্ধুতো। বিশ বছরের বন্ধু।
দেখুন, বিশ বছর আগে এক ক্লাশে পড়েছি বলেই বিশ বছর পরে কে কোথায় থাকে জেনে রাখতে হবে তার কোনও মানে নেই।–দোয়েল দত্ত নিজেকে কোণঠাসা মনে করে নিয়ে কাটা-কাটা গলায় বললেন।
আমি সুর নরম করে বললাম ঠিক। কিন্তু আমার প্রশ্নের উদ্দেশ্য হল আপনাদের মধ্যে বন্ধুত্বটা কোন পর্যায়ে তা আবিষ্কার করা।
কথাটা শুনেই চাবুক খাওয়ার মতো চমকে উঠলেন দোয়েল দত্ত। চোখের তারা দুটো আকারে বড় হয়ে গেল প্রশ্নের অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝে।
তা হলে আপনি কি বলতে চাইছেন জাল চেকের ব্যাপারে আমার হাত আছে।
আমি কিছু বললাম না।
দোয়েল দত্ত ঈষৎ তীব্র কণ্ঠে বললেন–জানেন বিশ বছরের মধ্যে হীরক আমার কাছে এসেছে বড় জোর দুবার?
খবরটা আগ্রহের সঞ্চার করল আমাদের মনে।
দুবার? মাত্র?
আজ্ঞে হ্যাঁ,–দোয়েল দত্তর স্নায়ু যে মোটেই শক্ত নয়, রেগে ওঠা দেখে তা বুঝলাম–যখন ওর চাকরি ছিল না আর আমার চাকরি হয়েছিল এইখানে–তখন একবার। তারপর যখন রেলে কি একটা বড় চাকরি পেয়ে চলে গেল–তখন আর একবার।
হীরকবরণ মুখার্জি এতক্ষণ কথা বলার সুযোগ না পেয়ে অস্থির হয়ে উঠেছিলেন। এবার হাত তুলে যেই কথা বলতে গেছেন, আমি বললাম–আপনি এখন কথা বলবেন না। শুনতে দিন–দোয়েলবাবু, শেষবার হীরকবাবু যখন এসেছিলেন, সেটা কত বছর আগে?
মনে মনে হিসেব করে নিয়ে দোয়েল দত্ত বললেন–প্রায় সতেরো আঠারো বছর আগে।
আশ্চর্য! এত বছর পরে দেখেও চিনতে পারলেন?
চিনতে একটু অসুবিধে হয়েছিল। কেননা, হীরক কখনও সুট-টাই পরত না।
এখন পরেন, বড় চাকরি করেন বলে–খুবই বড়।–শেষ শব্দ দুটোয় যে অহেতুক মোচড় দিইনি, হীরকবাবুর মুখে তার প্রতিক্রিয়া দেখেই বুঝলাম।
উষ্ণকণ্ঠে বললেন হীরকবরণ মুখার্জি আজ্ঞে হ্যাঁ, খুবই বড়। আপনার চাকরির চাইতেও বড়। ট্রাঙ্ককলে জানলেই পারেন!
জানব–যথাসময়ে। আপাতত শুধু বলুন, যে বন্ধুর সঙ্গে আঠারো বছর যোগাযোগ রাখেননি, আজ কেন তার সঙ্গে দেখা করতে এলেন।
এমনি।
কোনও কাজ না নিয়ে?
কাজ নিয়ে কেউ আড়–মারতে আসে না।
আপনার মতো বড় অফিসার অফিস টাইমে একজন কেরাণী বন্ধুর সঙ্গে আঠারো বছর পরে আড্ডা মারতে এসেছেন–আশ্চর্য নয় কি? দোয়েলবাবু আপনাকে কেরাণী বলছি বলে কিছু মনে করবেন না। কিন্তু আপনারও কি খটকা লাগছে না পদমর্যাদায় স্ফীত যে বন্ধু আঠারো বছর আপনার ছায়া মাড়ায়নি মর্যাদার হানি ঘটবে বলে, আজ সে হঠাৎ আড্ডা মারতে এল কেন?
