একদম ভেতর থেকে?
হ্যাঁ।–ওভাবে চেক বার করে নিলে কারও পক্ষে ধরা সম্ভব নয়। টিম্বার মার্চেন্ট ভদ্রলোকও জীবনে ধরতে পারতেন না যদি না চব্বিশ হাজার টাকা খোয়া যেত। যাক, যথাসময়ে আমরা হাজির হলাম। জানেন তো, তদন্তের শুরুতে সবাইকে সন্দেহ করতে হয়। কাউকে সাধু পুরুষ বলে মনে-মনে। ছেড়ে দেওয়াটাও অন্যায়। প্রাথমিক তদন্তে আমরা জেরা কনসেনট্রেট করলাম সেই সব লোকদের ওপর যারা টিম্বার মার্চেন্টের চেক সরানোর সুযোগ পেয়েছে।
এরকম লোক পেলাম একজনকেই। টিম্বার মার্চেন্টের তিনি পি-এ। বয়স খুব একটা নয়। বছর পঁয়ত্রিশ। সুশ্রী। শ্যামবর্ণ। চোখে চৌকো ফ্রেমের বাহারি চশমা। খুব চটপটে। মিষ্টভাষী। মিশুকে এবং অতিশয় কাজের লোক। ইকনমিক্সে এম-এ।
টিম্বার মার্চেন্ট ভদ্রলোকের নাম কুঞ্জবিহারী গড়াই। লেখা-পড়া বলা বাহুল্য কম করেছেন, কিন্তু টাকা করেছেন প্রচুর। জঙ্গলের ইজারা নিয়ে বসে বসে টাকা রোজগার তো–টাকার ওপর মায়া মমতা তাই একটু কম। চেক বইটা যে সযত্নে লুকিয়ে রাখতে হয়, সে খেয়ালও ছিল না। রেখে দিতেন নিজের সেক্রেটারিয়েট টেবিলের বাঁদিকের ড্রয়ারে। কস্মিনকালেও ড্রয়ারে তালা দিতেন না। বিশ বছরের কাঠের কারবারে কখনও বিশটা পয়সাও খোয়া যায়নি ড্রয়ার থেকে চেক হারাবার প্রশ্নই ওঠে না।
পি-এ ছোকরার নাম প্রদ্যোৎ পাল। অল্প শিক্ষিত মালিকের প্রায় সব কাজ সে একাই করত। চেক লেখা, হিসেব রাখা–সব। চেক কে নিতে পারে, এই হাইপোথিসিস ধরে এগোতে গিয়ে পেলাম প্রদ্যোৎ পালকে। হাইপোথিসিস মানে, একটা কিছু অনুমান করে নিয়ে তদন্ত শুরু করতে হয়– নিশ্চয় তা জানেন।
প্রদ্যোৎ ছোকরাকে যত জিগ্যেস করি, চেক দুটো সে নিল কখন, ততই সে নাকে কেঁদে বলতে লাগল–আমি সাতে নেই, পাঁচে নেই, কেন স্যার আমাকে কষ্ট দিচ্ছেন? সোজা আঙুলে ঘি উঠবে না দেখে থার্ড ডিগ্রি প্রয়োগ করলাম।
আমি সকৌতুকে বললাম–থার্ড ডিগ্রি কিন্তু একটা সায়ান্স বললেও চলে। ঠিক মতো অ্যাপ্লাই করতে পারলে সুফল ফলাবেই।
থার্ড ডিগ্রি মানে যে কচুয়া ধোলাই, সুধী পাঠককে নিশ্চয় আর তা ব্যাখ্যা করতে হবে না।
বিশ্ববন্ধুবাবু গম্ভীর মুখে বললেন–থার্ড ডিগ্রি সায়ান্স নয়। তবে যে যাই বলুক না কেন, থার্ড ডিগ্রি পৃথিবীর সব দেশেই আছে। সোজা আঙুলে ঘি না উঠলেই থার্ড ডিগ্রি দাওয়াই ছাড়ে সব মিঞাই।
ইট ইঝ অ্যান আর্ট। আমি কিন্তু থার্ড ডিগ্রির স্বপক্ষে লেগে রইলাম নাছোড়বান্দার মতো। আসলে আমি মনে মনে বিশ্বাস করি, মারের মতো ওষুধ আর নেই। শক্তের ভক্ত প্রত্যেকেই!
বিশ্ববন্ধুবাবু বললেন, থার্ড ডিগ্রি অনেক রকমের আছে। ধরুন চোখের ওপর স্পট লাইট ফেলে জেরা করা। ঘর অন্ধকার করে প্রদ্যোৎ পালকে গোল হয়ে ঘিরে বসে এইভাবে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে গেলাম। কিন্তু পেট থেকে একটা কথাও বার করতে পারলাম না। মাথার ওপর টপটপ করে জলের ফোঁটা ফেললাম এক নাগাড়ে–তবুও মনোবল শিথিল হল না। শেষকালে টেবিলের ওপর হাত উপুড় করে রাখতে বললাম। আঙুলের নখের ডগায় জ্বলন্ত সিগারেটের ভেঁকা দিলাম। কোনও মানুষ তিন সেকেন্ডের বেশি সহ্য করতে পারে না। এক ছোকরা একটা মেয়েকে কিডন্যাপ করে লুকিয়ে রেখেছিল। বিস্তর আড়ং ধোলাই দেওয়ার পরেও যখন ঠিকানাটা কিছুতেই বার করা গেল না–তখন নখের ডগায় সিগারেট ধরলাম–দু-সেকেন্ডের মাথায় সে বললে–বলছি স্যার। কিন্তু প্রদ্যোৎ পালকে এই ট্রিটমেন্টেও নোয়াতে পারলাম না। তখন সন্দেহ হল, ছোকরা হয়তো সত্যিই নির্দোষ অথবা রাম র্দুদে।
ছেড়ে দিলাম প্রদ্যোৎ পালকে। ব্যাঙ্ককে জানিয়ে দেওয়া হল, আর একটা চেক ভাঙাতে আসামী আসতে পারে। চেকের নাম্বার মুখস্থ করে রাখল কাউন্টার কর্মচারীরা।
মাস কয়েক কেউ এল না। আমরাও হাল ছেড়ে দিলাম। এরকম কত কেই শেষ পর্যন্ত আনসলভড় থেকে যায়। এ কেসেরও সুরাহা কখনোই সম্ভব নয়। কোনও ব্লু নেই। ধরব কাকে?
সুতরাং আমি স্বপন কেসের কথা ভুলে গেলাম। টিম্বার মার্চেন্ট কুঞ্জবিহারীবাবুও টাকার শোক ভুলে গেলেন। প্রদ্যোৎ পালও আমাদের আতংক কাটিয়ে উঠল।
ঠিক এই সময়ে এন এস বসু রোডের লন্ডন ব্যাঙ্কে আবার এসে পৌঁছল ছত্রিশ হাজার টাকার একটা বেয়ারার চেক। এত মাস পরে কাউন্টার ক্লার্কদের মনে রাখার কথা নয় চেক নাম্বারটা। রোজ অমন কত চেক আসছে। কিন্তু দৈবক্রমে যার হাতে চেকটা ভাঙাবার জন্যে এগিয়ে দেওয়া হল–সেই ভদ্রলোকের হঠাৎ কীভাবে জানি মনে পড়ে গেল নাম্বারটা।
কিন্তু চমকে উঠলেন না। ভাবান্তর দেখালেন না। স্বাভাবিকভাবে যেমন সবাইকে বলেন, সেই ভাবেই বললেন–আপনার সই?
চেক যিনি এনেছিলেন, তিনি রীতিমতো সুদর্শন পুরুষ। বছর পঁয়তাল্লিশ বয়স। গায়ে টেরিলিনের দামি স্যুট, পায়ে বাটা কোম্পানির সবচেয়ে দামি জুতো, হাতে হিরের আংটি, মুখে পাইপ। পাক্কা সাহেব বললেই চলে।
প্রশ্ন শুনে নীরবে ঘাড় হেলিয়ে জানালেন–হ্যাঁ।
পেছনে আর একটা সই করুন। খুব সহজভাবেই বললেন কাউন্টারের ভদ্রলোক। সবাইকেই বলেন। কিন্তু এঁকে বলার পর যেই দেখলেন কলম বার করে ঘাড় হেঁট করে সই করছেন দিশি সাহেবটি, অমনি চোখের ইঙ্গিতে দূরের দারোয়ানকে জানালেন গেট বন্ধ করতে।
