তদন্তে প্রকাশ পেল যে নিহত ব্যক্তির স্ত্রীর সঙ্গে মোরের অবৈধ বন্ধুত্ব ছিল। স্বামী হত্যার দায়ে গ্রেপ্তার করা হল ভদ্রমহিলাকে। কিন্তু পরে তাকে খালাস করে দেওয়া হয়। খুনটা নাকি ইচ্ছাকৃত নয়। নেহাতই দুর্ঘটনা।
এজন্যে কিন্তু মোরের বিচার-পর্বে কোনও ছেদ দেওয়া হয়নি। আঙুলের ছাপের বিশেষজ্ঞ কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে মানুষ দস্তানা মাধ্যমে নিহত ব্যক্তির আঙুলের ছাপ উদ্ধারের চাঞ্চল্যকর কাহিনি বর্ণনা করলেন, তখন জুরিরাও একাগ্র মনে শুনলেন সেই বীভৎস কিন্তু কৌতূহলোদ্দীপক উপাখ্যান। মোরে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি অভিযোগই অস্বীকার করলে। ক্রাউন প্রসিকিউটরও প্রতিবাদী পক্ষের সঙ্গে একমত হয়ে বললেন যে মোরের বিরুদ্ধে কেটি যে সব সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে আছে, সেগুলো অবস্থাঘটিত পরোক্ষ প্রমাণ ছাড়া আর কিছুই নয়। কিন্তু তবুও এ সব প্রমাণ এত বেশি এবং এমনই জোরালো যে একবাক্যে মোরেকেই হত্যাকারী স্বীকার না করে উপায় নেই।
জুরিদের মতেও দোষী সাব্যস্ত হল মোরে। মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করার সময়ে এক হাত নিজের ঘাড়ে রেখে আর এক হাতের শক্ত মুঠিতে চেপে ধরল সে নেকটাইয়ের গিটটা। পরে মৃত্যুদণ্ড লাঘব করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয় তাকে। ১৯৫৩ সালের পয়লা ডিসেম্বর যক্ষ্মারোগাক্রান্ত মোরেকে মুক্তি দেওয়া হয় কারাগারের অন্ধকার থেকে। বিশ বছর শ্রীঘর বাস করে বন্ধু হত্যার চরম প্রায়শ্চিত্ত করে গেল সে রাজরোগকে আশ্রয় করে।
* ওয়ালটার হেনরী চাইল্ডস্ (অস্ট্রেলিয়া) রচিত কাহিনি অবলম্বনে।
মায়াবী মোটিভ
রহস্য নেই বলেই একে রহস্য-গল্প বলব না। রহস্য সৃষ্টিও করব না। শুধু এক গোয়েন্দার কাহিনি বলব। সরকারি গোয়েন্দা। এই কলকাতারই।
বিশ্ববন্ধু ব্যানার্জি মুচিপাড়া থানার ওসি ভদ্রলোক মাঝবয়সী। সুগঠিত দেহ। রোগা নন, মোটাও নন। দোহারা চেহারা বলতে যা বোঝায়। কানের পাশে এবং মাথার পেছনের চুলে সাদা রং ধরেছে। মুখটি ভারি। কিন্তু পায়ভারি নন। কথা মন দিয়ে শোনেন, নীরবে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেন, সাধ্যমতো উপকার করার চেষ্টা করেন। এ হেন সমাজহিতৈষী আদর্শ দারোগার প্রয়োজন প্রতিটি থানায়।
আমি গিয়েছিলাম একটা বড় রেফারেন্স নিয়ে আমার ভাইপোর একটি উপকারের আশায়। কিন্তু পরিচয় দেবার পর দেখলাম, রেফারেন্সের প্রয়োজন ছিল না। উনি আমাকে চেনেন।
বললেন, আপনি তো গল্প লেখেন?
কোলের ওপর দু-হাত জড়ো করে মৃদু হেসে বললাম–লিখি। আপনাদের নিয়ে।
কিন্তু কি জানেন মৃগাঙ্কবাবু, মাঝে-মাঝে দু-একটা বাংলা গল্প পড়ে দেখেছি আপনারা ছেলে ভুলোনো গল্প লেখেন। যেমন, অমুক ডিটেকটিভ অমুক জায়গা থেকে একটা জিনিস কুড়িয়ে পেয়ে ঝট করে পকেটে রেখে দিল–সেইটাই নাকি একটা বড় প্রমাণ। কিন্তু সেটা সেইখানেই পাওয়া গিয়েছে, তার কি প্রমাণ? আপনাদের সখের গোয়েন্দা তা নিয়ে মাথা ঘামায় না।
মানছি। বাংলা গোয়েন্দা সাহিত্যের এত দুর্গতি এই কারণেই। আমরা কিছু না জেনেই লিখি। মেডিক্যাল জুরিসপ্রুডেন্স পড়ি না, ইন্ডিয়ান পেনাল কোডের পাতা ওল্টাই না, ফরেন্সিক সায়ান্স ল্যাবরেটরির দরজা মাড়াই না। অথচ লিখি।
বিশ্ববন্ধুবাবু বললেন–বিলেত আমেরিকার সব গল্পই কি এদেশে খাপ খায়? টেকনিক আলাদা, সমাজ আলাদা, আমরা আলাদা।
সেইজন্যেই আমি বিশ্বাস করি আপনাদের সঙ্গে না মিশে গোয়েন্দা গল্প লেখা উচিত নয়। শুধু কাহিনির জন্য নয়, আপনাদের না জেনে, আপনাদের স্বভাব চরিত্র না বুঝে, আপনাদের অ্যাডমিনিস্ট্রেশন সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল না হয়ে যে গল্প লেখা হয়–তা বিশ্বাসযোগ্য হতে পারে না কিছুতেই। তা ছাড়া সরকারি এই গোয়েন্দামাত্রই মূর্খ আর সখের গোয়েন্দারা অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী ট্র্যাডিশন ভাঙবার জন্যে আমি আপনাদের গৌরবময় দিকটা তুলে ধরবার উদ্দেশ্যে সম্প্রতি এক-আধটা গল্প লিখেছি। ইন্ডিয়ান পুলিশ জার্নাল, ওয়ার্ল্ড ডিটেকটিভ এজেন্সির মান্থলি বুলেটিন আর স্পেশ্যাল ব্রাঞ্চের একজন সুদক্ষ পুলিশ অফিসার আমাকে এ ব্যাপারে যথেষ্ট সাহায্য করেছেন।
বিশ্ববন্ধুবাবু টেবিলের ওপর দু-হাত রেখে ঘাড় কাত করে একমনে শুনছিলেন। আমি থামতেই বললেন–আমিও আপনাকে একটা স্টোরি বলে হেল্প করতে পারি। জাল চেকের কেস। আমি তদন্ত করেছিলাম, সঙ্গে স্বপন ছিল–স্বপন চৌধুরী–এখন এ-সি-ডি-ডি-ওয়ান।
ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের যে দুজন অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার, স্বপন চৌধুরি তাঁদের একজন। শুনে আগ্রহান্বিত হলাম। মুখে আর কিছু বললাম না। শুধু ঘাড় বেঁকিয়ে চোখ কুঁচকে তাকালাম।
বিশ্ববন্ধুবাবু বৈঠকি সুরে বললেন–স্বপন তখন আমার মতোই সাব-ইন্সপেক্টর। দুজনেই আছি ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টে। এমন সময়ে লন্ডন ব্যাঙ্কে চব্বিশ হাজার টাকার একটা চেক ভাঙানো হল। বেয়ারার চেক। সইটা জাল। জালিয়াত টাকা নিয়ে চলে যাবার সাতদিন পর জানা গেল সইটা জাল।
আমি বললাম–লন্ডন ব্যাঙ্ক? বলেন কি! এত বড় ব্যাঙ্কেও জাল সই ধরা পড়ে না? কোন ব্র্যাঞ্চ? চৌরঙ্গী রোড?
না। নেতাজি সুভাষ রোড। সইটা যে জাল, ব্যাঙ্কের কেউ ধরতে পারেনি। যার নামে অ্যাকাউন্ট, তিনি টিম্বার মার্চেন্ট। পাণ্ডু থেকে ওয়াগনে কাঠ এনে কলকাতায় কাঠের দোকানে চালান দেন। দিন সাতেক পরে অ্যাকসিডেন্ট্যালি তিনি ব্যাঙ্কের স্টেটমেন্ট দেখতে গিয়ে দেখলেন, চব্বিশ হাজার টাকা নগদে তোলা হয়েছে। অথচ উনি জানতেন এরকম কোনও টাকা তোলা হয়নি। চেক নাম্বার মিলিয়ে চেক বইয়ের কাউন্টার পার্ট দেখতে গিয়ে দেখলেন–কাউন্টার পার্টই নেই। তার পরেরটাও নেই। মোট দুটো চেক ছিঁড়ে নেওয়া হয়েছে চেক বই থেকে।
