আমাদের পরম সৌভাগ্য অল্পায়াসেই হদিশ পাওয়া গেল পার্সি স্মিথের। লোকটার কতকগুলো অসুবিধে ছিল। যেমন, যাচ্ছেতাই রকমের তোতলামো। কাজেই চট করে লোক তাকে ভুলতে পারত না। অচিরেই স্মিথ সম্বন্ধে আরও অনেক খবর সংগ্রহ করে ফেললাম আমরা। যাযাবরের মতো দেশময় চর্কিপাক দিত নিজের ওয়াগনেট হাঁকিয়ে। এটা কিন্তু দেশভ্রমণের বাতিক নয়। জীবিকার তাগিদে এ-শহর থেকে সে-শহরে ঘুরত টুকিটাকি কাজ পাওয়ার আশায়। মন্দার বছরগুলিতে অন্যান্য অনেক বেকারের মতো বাধ্য হয়ে এইরকম ভ্রাম্যময় কর্মজীবন নিতে হয়েছিল তাকে। যেখানেই কাজ পেত, সেইখানেই আস্তানা গেড়ে বসে যেত স্মিথ। কিন্তু দিন কয়েকের বেশি কোনও কাজই টিকত না। কাজ শেষ হলেই তল্পিতল্পা নিয়ে ওয়াগনেট হাঁকিয়ে যাত্রা করত অন্য কোনও অঞ্চলে।
দীর্ঘকাল ধরে খোঁজ-খবর নেওয়ার পর অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত স্মিথের গতিবিধির পূর্ণ বিবরণ পেলাম। ১৮ ডিসেম্বর মোরে নামে এক বন্ধুর সঙ্গে তাকে দেখা গিয়েছিল। সেই দিনই তার ওয়াগনেট যে জায়গায় দাঁড়িয়েছিল তার কয়েক মাইল দূরেই পরে পাওয়া গিয়েছিল। তার মৃতদেহ।
সাক্ষীরা ১৯শে ডিসেম্বরেও স্মিথকে দেখতে পেয়েছিল তার ওয়াগনেটে। কিন্তু পরের রাত্রে মোরে একলাই ফিরে এল যাযাবর কর্মীদের ক্যাম্পে। তার ভঁবুর গায়ে অনেকেই রক্তের দাগ লেগে থাকতে দেখেছিল। মোরে কিন্তু নির্বিকার ভাবে একটা ঘোড়া আর কয়েকটা ব্যক্তিগত জিনিস বিক্রি করে দিলে সঙ্গীসাথীদের মধ্যে। পরে দেখা গিয়েছিল প্রতিটি জিনিসেরই প্রকৃত মালিকানা স্বত্ব ছিল স্মিথেরই।
জিজ্ঞাসাবাদের জন্যে মোরেকে খুঁজে পেতে আনার হুলিয়া বেরিয়ে গেল তক্ষুনি। আবার প্রসন্ন হলেন আমাদের ভাগ্যদেবী। দেখা গেল, আদত লোকটা পুলিশের হেপাজতে রয়েছে। বড়দিনে ছোটখাটো অপরাধের অভিযোগে অল্প কয়েক দিন হল পুলিশ গ্রেপ্তার করেছিল তাকে। হপ্তা-দুয়েকব্যাপী হাজত বাস করে এই অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত করছিল সে। ইতিমধ্যে আরও একটা খবর পেলাম আমরা। জেমস এন্ডেজ নামে এক গ্যারেজের মালিক ওয়াগার কাছেই থাকতেন। ১৬ ডিসেম্বর তিনিও দেখেছিলেন মোরেকে এবং তার চার দিন পরেও আবার শ্রীমানের দর্শনলাভের সৌভাগ্য হয় তাঁর। দ্বিতীয় দর্শন ঘটে তাঁর গ্যারেজেই। একটা ওয়াগনেট হাঁকিয়ে এসেছিল মোরে। টুকটাক কয়েকটা মেরামতি কাজের জন্যে নগদ টাকাও ধরে দিয়েছিল সে।
হাজতের মধ্যে মোরেকে প্রশ্ন করা হলে অম্লান বদনে সে বললে ওয়াগনেটটা তার কাছে বিক্রি করেছে ও ডাউড নামে এক ভদ্রলোক। ওয়াগার কাছেই তার নিবাস। কিন্তু বহু লোকের এজাহারের সঙ্গে এতটুকু সাদৃশ্য ছিল না তার এই জবানবন্দীর। কাজে-কাজেই স্মিথকে হত্যার অপরাধে গ্রেপ্তার করা হল।
বিচার শুরু হয় ১৯৩৪ সালের ৮ মে। তিলধারণের স্থান ছিল না ওয়াগার ছোট্ট আদালত-ভবনে। কেসটার প্রচার তো কম হয়নি। কাজেই বহু মহিলাও সেদিন ভিড় করেছিলেন পাবলিক গ্যালারিতে। নার্ভাস হয়ে গিয়েছিল মোরে। অশান্ত মনোভাবের অভিব্যক্তি ফুটে উঠেছিল
তার অসুস্থ-চঞ্চল হাবভাবে। প্রতিবাদীর বিশেষ সুবিধার সুযোগ নিয়ে সে চ্যালেঞ্জ করে বসল বারোজন। জুরিকে।
জুরিকে দিয়ে চরম শপথ নেওয়ার আগে হামেশাই আদালত-কক্ষের গোলমাল থামানোর জন্যে হাতুড়ি পিটতে হয় ধর্মাবতারকে। কিন্তু সেদিন টু শব্দটি শোনা গেল না ঘরের মধ্যে। একের পর এক সাক্ষী কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে যা বললে, তা একটু একটু করে জুড়ে গড়ে উঠল অবস্থাঘটিত প্রমাণ বা পরোক্ষ প্রমাণের এক সুদৃঢ় যুক্তি শৃঙ্খল। প্রথম সাক্ষী দিলে ক্যাম্পবাসীদেরই একজন। মোরেকে রক্তমাখা তাঁবু নামাতে দেখেছিল সে। রক্তের দাগের হেতুও জিজ্ঞেস করেছিল সে। উত্তর ধমকে উঠেছিল মোরে। মুখ বন্ধ করে নিজের চরকায় তেল দেওয়ার মূল্যবান উপদেশ শুনিয়েছিল দাঁত কিড়মিড় করে।
গ্যারাজের মালিক আরও একটা নতুন সংবাদ পরিবেশ করলেন। ওয়াগনেটের ক্যানভাসের মধ্যে গাঁথা একটা ছুরি দেখতে পেয়েছিলেন তিনি। রক্তরঞ্জিত ছিল ছুরিটার হাতল। আরও প্রমাণ পাওয়া গেল। এক ভদ্রলোকের কাছে একটা সোনার ঘড়ি বিক্রি করেছিল মোরে। এস অক্ষরটি খোদাই করেছিল ঘড়ির গায়ে। অন্যান্য জিনিসের সঙ্গে মাঝারি আকারের একটা জ্যাকেটও কিনেছিলেন ভদ্রলোক ওর কাছে থেকে। এস চিহ্নিত ঘড়ি এবং বিশেষ মাপের জ্যাকেট দুটোই সূচনা করছে সেই একই সন্দেহের।
সাক্ষীদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ নিলেন যিনি তাঁর নাম জোন্স। পুলিশের কাছে তিনি বিবৃতি দিয়েছিলেন যে মোরে আর স্মিথের মধ্যে দারুণ কথা কাটাকাটির সময়ে তিনিও হাজির ছিলেন। রেগে আগুন মোরে শেষকাল স্মিথকে খতম করে দেওয়ার হুমকি দেখায়। আদালত থেকে যখন ডাক পড়ল এই সাক্ষীর, তখন কিন্তু তাঁর আর পাত্তা পাওয়া গেল না। কাজেই সেদিনের মতো মুলতুবী রাখা হল বিচারের পর্ব। পরের দিন সকালে আদালত শুরু হতেই বিচারপতি জিগ্যেস করলেন এজাহার দেওয়ার জন্যে সাক্ষী প্রস্তুত আছেন কিনা। কিন্তু সাক্ষীর বদলে কাঠগড়ায় উঠে এলেন এক পুলিশ অফিসার। বললেন–সাক্ষী মৃত। মাথার পেছনে বুলেট বিদ্ধ অবস্থায় তার লাশ আবিষ্কার করেছি আমরা।
