ম্যাকরে, ক্রসবি আর রেমাসকে দ্রুতগামী গাড়িতে ওয়াগা পাঠিয়ে দিলেন প্রায়র। সিডনির গোয়েন্দা বাহিনী আর ওয়াগার পুলিশ-ফোর্স একযোগে অতিরিক্ত যত্ন নিয়ে তন্নতন্ন করে খুঁজে দেখলেন নদী এবং তার দু-তীরের জমি। লাশটা পাওয়া গেছে যেখানে, খুনটা সেখানে হয়নি, তা ঠিক। কিন্তু ঠিক কোন জায়গায় তার প্রাণবায়ু বেরিয়েছে, তাও বলা সম্ভব ছিল না কারও পক্ষে। কেননা, উপড়ে পড়া গাছটার ডালপালার ফাঁকে দেহটা কত হপ্তা যে আটকা পড়েছিল এবং নদীর জলে লাশটা ফেলে দেওয়ার পর স্রোতের টানে যে কতখানি পথ তা পেরিয়ে এসেছে তাই বা জানছে কে। আরও খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে লাশ পরীক্ষা করতে গিয়ে ওরা আবিষ্কার করলে লোকটির ডান হাতটারই কোনও পাত্তা পাওয়া যাচ্ছে না। অর্থাৎ নিহত ব্যক্তিকে সনাক্ত করার শেষ ক্ষীণ সম্ভাবনাটুকুও অন্তর্হিত হল তার নিখোঁজ ডান হাতের সঙ্গে সঙ্গে।
কিন্তু নদীর তীর বরাবর ঝোঁপ-ঝাড়ের মধ্যে তল্লাশী-পর্ব চালাতে গিয়ে আরও একটা জিনিস আবিষ্কার করলে একজন গোয়েন্দা। ছোট্ট একটা চ্যাপ্টা বাদামি থলি।
থমকে গিয়ে ঝুঁকে পড়েছিল গোয়েন্দা প্রবর থলিটা তুলে নেওয়ার জন্যে। সূত্রের সন্ধান পাওয়ার আশায় আনন্দে আর তর সইছিল না তার। আর তার পরেই নিঃসীম বিভীষিকায় বিস্ফারিত হয়ে উঠল তার দুই চোখের তারা। জিনিসটা বাদামি থলি নয়। মানুষের চামড়ার এতটুকু একটা টুকরো। তখনও ডান হাতের বুড়ো আঙুলের বিবর্ণ নখটা লেগে ছিল চামড়ার সঙ্গে।
সন্তর্পণে মোড়কের মধ্যে করে এই নতুন আবিষ্কারকে পাঠিয়ে দেওয়া হল হেড কোয়ার্টারের আঙুলের ছাপ বিভাগে। জিনিসটা পরীক্ষা করার পর শল্য-চিকিৎসকদের আর কোনও সন্দেহই রইল না। বিবর্ণ নখ সমেত চামড়ার টুকরোটা এক সময়ে একজন পুরুষ মানুষেরই ডানহাতের অংশ ছিল।
ওয়াগার পুলিশ-ডাক্তার রিপোর্ট দিলে নিহত ব্যক্তির কব্জি কৃমিকীট খেয়ে ফেলেছে।
নদীর স্রোতে ভেসে আসার সময়ে কোনও কাঠের গুঁড়িতে আটকে যায় লাশটা হাতটা সম্ভবত বেরিয়েছিল জলের ওপরে। তখনই হাতের নরম মাংস নিয়ে মহাভোজ শুরু করে দেয় কৃমিকীটবাহিনী–পড়ে থাকে শুধু চামড়ার খোলসটা। পরে যখন স্রোতের হ্যাঁচকা টানে লাশটা ভেসে যায় নদীর তীর থেকে, তখনই এই চর্ম-আবরণই ছিঁড়ে গিয়ে লেগে থাকে ঝোঁপঝাড়ের মধ্যে। তীক্ষ্ণ-চক্ষু গোয়েন্দা প্রবর পরে যা উদ্ধার করে আসলে তাকে, মানুষ দস্তানা ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না।
ঠিক এই জিনিসটাই চাইছিলাম আমরা। ১৯৩৪ সাল শুরু হওয়ার অনতিকাল আগে পুলিশ ল্যাবরেটরিতে একজন পুলিশ সার্জন মৃত পুরুষের চামড়াটা নিয়ে জলে ভিজিয়ে নরম করে যে নাটকীয় মুহূর্তের সৃষ্টি করেছিলেন, তাও আমি কোনও দিন ভুলব না।
একজন গোয়েন্দাকে ডান হাতে সার্জিক্যাল দস্তানা পরবার নির্দেশ দিলেন ডাক্তার। তারপর চামড়াটা টানটান করে বিছিয়ে ধরতেই দস্তানা পরা ডান হাতটা সন্তর্পণে ভেতরে ঢুকিয়ে দিলেন গোয়েন্দা ভদ্রলোক।
প্রায় খাপে-খাপে লেগে গেল চামড়াটা। এর পর কালির প্যাডে আঙুল টিপে ধরে কাগজের ওপর ছাপ দিলেন গোয়েন্দাটি। অর্থাৎ মানুষ দস্তানার ছাপ থেকেই নিহত ব্যক্তির আঙুলের ছাপ উদ্ধার করা হল।
কিন্তু খুনিকে পাকড়াও করতে হলে আরও অনেক কাঠখড় পোড়ানো দরকার। লাশটা পড়ে ছিল ওয়াগা জেলা হাসপাতালের মর্গে। ডান হাতের ছাপ উদ্ধার করার পর বাঁ-হাতের চামড়াটাও লাশের দেহ থেকে ছাড়িয়ে আনা একান্ত দরকার। কিন্তু মুশকিল তো এই বাঁ-হাত নিয়েই। পচে গলে দফারফা হয়ে এসেছিল চামড়াটার।
অত্যন্ত বীভৎস কাজের দায়িত্ব পড়ল ডাক্তারের ওপর। কিন্তু পেছপা হলেন না তিনি। সাদা গাউন, মুখোশ আর টুপি পরা তিনজন গোয়েন্দার সাহায্য নিয়ে শুরু করলেন অপারেশন। তারপর ছাড়ানো চামড়াটা সন্তর্পণে প্যাক করে হুঁশিয়ার বার্তাবাহকের হাতে পাঠানো হল হেড কোয়ার্টারে। সেখানকার ডাক্তাররা আর একবার মানুষ দস্তানা কৌশলের আশ্রয় নিয়ে আমাদের হাতে তুলে দিলেন বাঁ-হাতের সবকটি আঙুলের ছাপ।
তারপর শুরু হল অত্যন্ত বিরক্তিকর একঘেয়ে কিন্তু রীতিমতো পদ্ধতি মাফিক এক তল্লাসী পর্ব। ফিংগার প্রিন্ট দপ্তরে আঙুলের ছাপ ছিল প্রায় পাঁচ লক্ষ। এই রাশি রাশি ছাপের মধ্যে কোন ছাপটি যে আমাদের সংগৃহীত ছাপের অনুরূপ তারই সন্ধানে তন্ময় হয়ে গেলাম আমরা।
কাজটা সময়সাপেক্ষ। ঘণ্টার পর ঘন্টা কেটে গেল বিরামবিহীন ক্লান্তিহীন এই অনুসন্ধানে। তারপর সার্থক হল আমাদের এত পরিশ্রম। মানুষ দস্তানার সঙ্গে হুবহু মিলে যাওয়া ছাপের হদিশ পেলাম ছাপ পঞ্জির মধ্যে। এর পরেই সর্বত্র নিহত ব্যক্তির চেহারার একটা বর্ণনা ছড়িয়ে দিলেন ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টর প্রায়র। বর্ণনাটা এই রকম : চল্লিশ থেকে পঞ্চান্ন বছর বয়স, উচ্চতা পাঁচ ফুট সাত ইঞ্চি, মাঝারি গড়ন, দাড়ি-গোঁফ কামানো পরিষ্কার গোল মুখ, ওজন প্রায় ১০ স্টোন ৭ পাউন্ড। ওপরের আর নীচের সারিতে দাঁত নেই কয়েকটা। পরনে কালো রঙের টিউনিক, ধূসর ফ্লানেল শার্ট, নীল রঙের পুরু ডুংগারি কাপড়ের ট্রাউজার্স, শক্ত চামড়ার রুচার হাফ-বুট আট নম্বর সাইজ, মোজা নেই।
লোকটার নাম পার্সি স্মিথ। কিন্তু নামটা কাগজে দিলাম না বিশেষ কারণে। আমাদের মতলব ছিল নাম ঘোষণা করে খুনিকে সচকিত না করে তুলে গোপনে তার গতিবিধি নজর রাখা। বছর চারেক আগে মাতলামো আর উঞ্চবৃত্তির জন্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল স্মিথকে এবং এই লোকই যে সেই স্মিথ, সে সম্বন্ধে সন্দেহের ছায়ামাত্র ছিল না আমাদের কারো মনে।
