বললেন, কমিশনার, বিপদমুক্ত হয়েছেন আপনার বন্ধু। কিন্তু ওই হাড়টা না পাওয়া গেলে এ সুখবর হয়তো আপনাকে শোনাতে পারতাম না।
মিনিট দশেক পরেই আর একটা পুলিশের গাড়ি এসে পৌঁছোল হসপিটালের প্রাঙ্গণে। গোয়েন্দার কাছে রিপোর্ট পেলাম, গাড়িটার নাম্বার প্লেট থেকে ধাক্কা মেরে উধাও হওয়া ড্রাইভারকে সনাক্ত করতে পেরেছি আমরা। বাড়িতেই ছিলেন ভদ্রলোক। মদের নেশা তখনও তাঁর কাটেনি। পুলিশের কাছে বিনা দ্বিধায় সব স্বীকার করেছেন তিনি। পার্টির উচ্চপদস্থ কর্মচারি তিনি। তা সত্ত্বেও এই গুরুতর অপরাধের জন্য আইনের রক্ত চক্ষুকে তিনি এড়াতে পারেননি। মাথা পেতে নিতে হয়েছিল ধর্মাধিকরণের গুরুদণ্ড।
দ্রুত গোয়েন্দাগিরি এবং তার চাইতেও বেশি কপালজোর–এই দুইয়ের ফলে এ-কেসে রক্ষা পেয়েছিল একজনের জীবন। অন্যান্য দেশে রাশিয়ান পুলিশদের বড় দুর্নাম আছে। তারা নাকি সোভিয়েট ইউনিয়নের যারা শত্রু তাদের গ্রেপ্তার করা এবং হনন করা ছাড়া অন্য কোনও বিষয়েই আগ্রহী নয়। কিন্তু আমি বলব দুনিয়ার যেখানে যত পুলিশ আছে তাদের সঙ্গে আমার এবং আমার সহ-কর্মীদের কোনও প্রভেদই নেই। আমরা সবাই সমান, একই আমাদের দায়িত্ব। কোনও জীবন বিনষ্ট করার চাইতে সে জীবন রক্ষা করার জন্যে হাজার রকম প্রচেষ্টা করতে আমরা দ্বিধা করি না।
* গ্রেগরী আরেকী (রাশিয়া) রচিত কাহিনি অবলম্বনে।
মানুষ দস্তানার কাহিনি
পুরোনো আমলের আইনরক্ষক অফিসার হিসেবে চোখের সামনেই দেখেছি সিডনি শহরকে গড়ে উঠতে। ঝোঁপঝাড়ভরা ছোটখাটো একটা নগরই দেখতে দেখতে ফুলেফেঁপে উঠে ঠাঁই দিল
বিশ লক্ষ বাসিন্দাকে। পাপ আর অপরাধের দিকে থেকেও এর চাইতে ভালো বা খারাপ শহর আর আছে বলে মনে হয় না আমার।
সুকঠোর দুস্তর পথ পেরিয়ে তবে আমাকে নিউ সাউথ ওয়েলসের কমিশনার হতে হয়েছিল। সত্য কথা বলতে কি বীটের কনস্টেবলের স্তর থেকে ধীরে ধীরে উঠতে হয়েছে আমাকে এই দায়িত্বপূর্ণ পদে। তেতাল্লিশ বছরের দীর্ঘ কর্মজীবনে আমার অন্তত বিশ্বাস আইনের সব রকম শত্রুকেই আমি দেখেছি। সামান্য চোর-ছ্যাচোড় থেকে শুরু করে জালিয়াত কলমেন দাঙ্গাবাজ খুনে-গুন্ডা–কিছুই বাদ যায়নি। এদের মধ্যে অনেকেরই উচ্চাশার বহর শুনলেও তা লেগে যায়।
বর্তমান শতাব্দী শুরু হওয়ার অল্পদিনের মধ্যেই সিডনি পুলিশ হেড কোয়ার্টারের নিরুদ্দেশ ব্যক্তি বিভাগে সার্জেন্টের পদে উন্নীত হলাম আমি। আঙুলের ছাপ নিয়ে অপরাধী সনাক্তের পদ্ধতি সে সময়ে সদ্য প্রচলিত হয়েছে। সম্পূর্ণ নতুন বিজ্ঞানসম্মত এই তদন্ত পদ্ধতি আমূল পরিবর্তন এনে দিয়েছিল গতানুগতিক পুলিশী ধারায়। অস্ট্রেলিয়াতে সর্বপ্রথম এই অভিনব পদ্ধতির প্রচলন হয় আমাদের ডিপার্টমেন্টেই।
তন্ময় হয়ে গেলাম আমি আঙুলের ছাপের এই বিশাল দুনিয়ায়। বিভিন্ন ছাপের রেখার ফাঁস, আবর্ত আর বেঁকা খিলের সম্পর্কে বিস্তর জ্ঞানলাভের পর নিউ সাউথ ওয়েলস কারাগারের আট হাজার বাসিন্দার একটি রেকর্ড তৈরি করে ফেললাম।
সে সময়ে ডিপার্টমেন্টের কর্মীসংখ্যা পাঁচজনের বেশি ছিল না। কিন্তু আজ প্রায় একশো মেয়েপুরুষ নিয়ে গড়ে উঠেছে এই বিভাগের কর্মীবর্গ। সারা অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড আর অন্যান্য প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশের প্রায় দশ লক্ষ অপরাধী আর সন্দেহভাজনের আঙুলের ছাপের সারি সারি ফাইলও সংরক্ষিত রয়েছে আমাদের রেকর্ড বিভাগে। দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের হেড কোয়ার্টার হয়ে দাঁড়িয়েছে নিউ সাউথ ওয়েলসের আঙুলের ছাপের বিভাগ। শুধু তাই নয়। সারা বিশ্বে যে-কটা অত্যন্ত দক্ষ ফিংগার প্রিন্ট ডিপার্টমেন্ট বর্তমানে রয়েছে, আমাদের এই বিভাগটি তাদেরই অন্যতম।
কর্মজীবনের গোড়ার দিকে আঙুলের ছাপ সম্বন্ধে এই বিশেষ জ্ঞান অর্জন করেছিলাম বলেই মানুষ দস্তানা হত্যা-তদন্তের সুরাহা করতে পেয়েছিলাম আমি।
প্রথমেই বলে রাখি, আমি কমিশনার হয়েছিলাম মাত্র কয়েক বছরের জন্যে। ১৯৩৩ সালের বড়দিনে একটা লাশ চোখে পড়ল দুই ভদ্রলোকের। মুরুবিজী নদীতে ছুটির দিনে মাছ ধরতে গিয়েছিল দুজনে। স্টেটের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের সবচেয়ে সমৃদ্ধিশালী কৃষিপ্রধান কেন্দ্র ওয়াগা থেকে কয়েক মাইল গেলেই পাওয়া যাবে এই নদীটি।
লাশটি পুরুষমানুষের। খুন করা হয়েছিল তাকে বেশ কিছুদিন আগেই। কিন্তু তীরের কাছে উপড়ে পড়া একটা গাছের শাখাপ্রশাখার দেহটা আটকে পড়েছিল কটা দিন। তাছাড়া মুখখানা এমনভাবে থেঁতলে দেওয়া হয়েছিল যে সনাক্তকরণের উপায় ছিল না।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে সনাক্ত করার শুধু একটি পন্থাই আমি জানতাম এবং তা হল আঙুলের ছাপের সাক্ষ্য। যদিও এক্ষেত্রে এ পন্থায় সুফলের সম্ভাবনা সুদূরপরাহত। কেননা, নিহত ব্যক্তি হয়তো সমাজের বিলক্ষণ সম্মানীয় পুরুষ এবং সারা জীবনে পুলিশের দপ্তরে আঙুলের ছাপ দেওয়ার দুর্ভাগ্য তাঁর কোনওদিনই হয়নি। আইনভঙ্গের দায়ে পুলিশের হাতে ধরা না পড়লে নিউ সাউথ ওয়েলেসের কোনও নাগরিকেরই আঙুলের ছাপ রাখতাম না আমরা।
কেসটা সম্পর্কে তদন্ত করার জন্যে গোয়েন্দারা হেডকোয়ার্টার থেকে রওনা হলেন। চিফ ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টর প্রায়রকে ডেকে আমি বলে দিলাম–আপনার সাঙ্গোপাঙ্গরা আর যাই করুক না কেন, আমার কিছু বলার নেই। কিন্তু আঙুলের ছাপ যেন নিয়ে আসে ওরা। লাশ সনাক্ত করতে গেলে সম্ভবত এছাড়া আর কোনও উপায় আমাদের নেই।
