রেখে গিয়েছে শুধু একটি চিঠি। কয়েক লাইনের বাংলা চিঠি। তাতে লেখা?
অ্যানথ্রপলজিস্ট স্যার ফ্রান্সিস গ্যালটন ফিংগ্রারপ্রিন্টের প্রথম পরীক্ষা চালিয়েছিলেন ভারতবর্ষে। ড্যাকটিলোগ্রাফি আজকে একটা মস্ত বিজ্ঞান। কিন্তু ওপথে আমাদের ধরা যাবে না। আঙুলের ছাপ রইল না কোথাও। নন্দনকে ফিরিয়ে দেব শুধু টাকার বিনিময়ে। দশ লাখ কি খুব বেশি হল? কালো টাকার পাহাড় জমিয়েছেন মনে নেই?
বৈভব যদি অধিক প্রিয় হয়, নন্দনের লাশ ফেরত দিয়ে যাব। আর যদি তা না চান তো বাগানের রাধাচূড়ায় একটা সাদা কাপড় ঝুলিয়ে রাখবেন সামনের পূর্ণিমায়। টাকা সংগ্রহ করব পরে। আমরা বিজ্ঞান-জানা তরুণ দল। গোয়েন্দাও বটে। থানা পুলিশ করলে টের পাব পাঁচ মিনিটের মধ্যেই। লাশ পাবেন চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে।
ইন্দ্রনাথ তাই প্রথমে জিগ্যেস করেছিল, এই চিঠি পাওয়ার পরেও থানা পুলিশ করলেন? আপনার সাহস তো কম নয়?
রবিনবাবু শুকনো হেসে বলেছিলেন, প্রশংসাটা সুচরিতার প্রাপ্য। আমার চেয়ে ওর মনের জোর বেশি। এই দেখুন না, পুলিশ প্রকারান্তরে আমাকে দশ লাখ টাকা দিতে বলায় সুচরিতাই টেনে এনেছে আপনার কাছে।
সেই সুচরিতা আর কুন্দন দাঁড়িয়ে আমাদের সামনে। ধাত্রীজননীর গা-ঘেঁষে এমনভাবে দাঁড়িয়ে আছে কুন্দন, যেন মহীরুহের পাশে লতাটি।
চোখ মুছে সুচরিতা বললেন, এই আমার বড় ছেলে কুন্দন। বড় ভালো ছেলে। স্কুলে কখনও সেকেন্ড হয়নি। এখন ঢুকেছে আর্ট কলেজে।
ইন্দ্ৰনাথ শুধু বললে, দেখেই বুঝেছিলাম।
কুন্দন মাথা হেঁট করে দাঁড়িয়ে রইল। ছেলেটি প্রকৃত শিল্পী। অন্তর্জগত নিয়েই তন্ময়।
সুচরিতা গর্বিত সুরে বললেন, ওর স্টুডিও দেখলে আপনার তাক লেগে যাবে। একাই একশো। কখনও কুমোর, কখনও পটুয়া, কখনও ছুতোর। সবরকম হাতের কাজের ব্যবস্থা আছে। একতলায়।
একতলায়?
হ্যাঁ, ওইখানেই ওর স্টুডিও। ছেলের আমার বন্ধু টন্ধু তেমন নেই। দিন রাত ওই স্টুডিওতেই মাটি ডলছে নয় তো তুলি চালাচ্ছে, অথবা ব্ল্যাদা ঘষছে।
র্যাঁদা শব্দটা শুনেই আপনা হতে আমার চোখ নেমে এল পায়ের কাছে রাখা মইয়ের দিকে।
ইন্দ্রনাথ হেসে বললে, তা হলে তো স্টুডিওটা একবার দেখে আসতে হয়।
মৃদু আপত্তির সুরে কুন্দন বললে, বড় নোংরা সেখানে–।
হোক। তবুও স্টুডিও তো।–তোমার আপত্তি না থাকলে–
না, না, আপত্তি কীসের! আসুন।
নিখোঁজ নন্দনের তদন্তে এসে শিল্পী কুন্দনের শিল্পপ্রতিভা নিয়ে ইন্দ্রনাথের হঠাৎ আগ্রহ আমাকে বিস্মিত করেনি। র্যাদা শব্দটি ওর মনেও সাড়া ফেলেছে নিশ্চয়।
একতলায় পশ্চিমদিকের একটি বড় ঘর। জানালার পাশেই রাধাচূড়া। ঘরের এক দেওয়ালে আলমারি ঠাসা বই। টেবিলের ওপর হ্যান্ডব্যাগের খোপে কমপ্লিট ডু-ইট-ইওরসেল ম্যানুয়েল। আর একদিকের দেওয়ালে থরে থরে সাজানো বিভিন্ন সাইজের তুলি, রঙের শিশি, ছুতোরের যন্ত্রপাতি। আরেক দেওয়ালের গায়ে কাঠ আর মাটির স্তূপ। ঘরের মাঝখানে ইজেল আর কুমোরের চাকা, ছুতোরের বেঞ্চি, আর একটা অর্ধসমাপ্ত মৃন্ময় মূর্তি।
বিমুগ্ধ বিস্ময়ে চতুর্দিকে চোখ বুলিয়ে বললে ইন্দ্রনাথ, বাঃ! কুন্দনের দেখছি বহুমুখী প্রতিভা।
পুত্রগর্বে গর্বির্তা সুচরিতা বলে উঠলেন, কাঠের চেয়ারবেঞ্চি আর মাটির মূর্তি বানিয়ে ও কী করে জানেন?
কী?
বিক্রি করে। সেই টাকা অন্ধদের স্কুলে দান করে।
এবার আমিও বিস্মিত হলাম। এ যে দৈত্যকুলে প্রহ্লাদ। বাপ কালো টাকার হিমালয় রচনা করেছেন–ছেলে প্রায়শ্চিত্ত করছে নিজের গতর দিয়ে।
কুন্দন মাথা হেঁট করে বললে, মা তুমি থামো।
সস্নেহে কুন্দনকে ধমকে উঠলেন সুচরিতা, তুই থাম।
স্মিতমুখে মা ছেলের কথা শুনতে-শুনতে যন্ত্রপাতির তাকের কাছে গিয়ে দাঁড়াল ইন্দ্রনাথ। আমার চোখ নিমেষে অনুসরণ করল ওকে। সর্বাগ্রে একটি ব্ল্যাদা তুলে নিয়ে উলটেপালটে দেখল ইন্দ্রনাথ। সব শেষের রাদাটির ফলার পানে অনিমেষে চেয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর গেল বিপরীত দিকের দেওয়ালে। সেখানে কাঠের স্তূপ আর মাটির গাদা। শিকারি কুকুর যেমন গন্ধ শুঁকে-কে খরগোসের কান টেনে বার করে, বন্ধুবরও সন্ধানী চোখে তাকিয়ে কাঠের গাদা থেকে টেনে তুলল এক টুকরো কাঠ। বিলিতি পাইন কাঠ। কাঠটার গায়ে কতকগুলো পেরেকের ফুটো। ফুটোগুলো যে প্যাটার্নে রয়েছে, সেই একই প্যাটার্নে পেরেকের ফুটো একটু আগেই আমি দেখে এসেছি দোতলায় রাখা কাঠের মইতে। ওপরের ধাপের কাঠটা কেটে নেওয়া হয়েছে এই কাঠ থেকেই।
চোখ তুলল ইন্দ্রনাথ। ধীরে-ধীরে পাথরের মতো কঠিন হয়ে গেল মুখ। বললে মৃদু কঠিন কণ্ঠে, ছিঃ কুন্দন! সম্পত্তির লোভটাই বড় হল! কোথায় রেখেছ নন্দনকে?
কুন্দন যে গুডি টাইপের গুড বয় নয়, তার প্রমাণ পেলাম পরক্ষণেই। আস্ত একটা ভিজে বেড়াল। এতক্ষণ মাথা হেঁট করে থাকা শান্ত মানুষটাই নিমেষে যেন জ্বলে উঠল। ইন্দ্রনাথের মৃদু কঠিন কণ্ঠের তীব্র শ্লেষ যেন সেই, দেশলাইয়ের আগুন। ছুঁয়ে গেল বারুদের স্তূপ। ছিলে ছেঁড়া ধনুকের মতো টান-টান চেহারায় কিছুক্ষণ চেয়ে থাকার পরেই ঘৃণাকুটিল কণ্ঠে শুধু বললে, আপনি… আপনি।
বলেই লাফ দিয়ে গিয়ে পড়ল যন্ত্রপাতির দেওয়ালের সামনে, খপ করে তুলে নিল একটা তুরপুন এবং ছোরার মতো উঁচিয়ে তেড়ে এল ইন্দ্রনাথের পানে।
