চকিতের মধ্যে শক্ত হয়ে গেল ইন্দ্রনাথের দেহ। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে কুন্দনকে জাপটে ধরলেন সুচরিতা। তীক্ষ্ণ কণ্ঠে চেঁচিয়ে বললেন, কুন্দন! কুন্দন!
মা! হাঁফাচ্ছে কুন্দন, তুমি ছাড়ো—
কুন্দন! শেষে তুই!
মা!
কুন্দন! বলতে-বলতে ঝরঝর করে কেঁদে ফেললেন সুচরিতা।
পাথর হয়ে গেল কুন্দন। শিথিল হাত থেকে খসে পড়ল তুরপুন।
মা…আমি….আমি!
নিঃশব্দে কাঁদতে লাগলেন সুচরিতা।
ঝড়ের মতো ছুটে বেরিয়ে গেল কুন্দন। যাওয়ার সময়ে বিষদৃষ্টি হেনে গেল ইন্দ্রনাথের পানে।
চোখে আঁচল চাপা দিয়ে কাঁদতে লাগলেন সুচরিতা।
কাছে গিয়ে নিবিড় কণ্ঠে বললে ইন্দ্রনাথ, রবিনবাবু উইল করে ফেলেছেন নিশ্চয়?
ঘাড় নেড়ে সায় দিলেন সুচরিতা।
কাকে কত দিয়েছেন?
অশ্রুবিকৃত কণ্ঠে বললেন সুচরিতা, দশ আনা ছআনা। মা নেই বলে দশ আনা কুন্দনকে। তাতেও ও খুশি নয়। ছআনার লোভে ছোট ভাইকে–বলতে-বলতে চোখ থেকে আঁচল নামিয়ে বললেন, খোকাকে পাব তো?
নিশ্চয় পাবেন। আপনিই তাকে ফিরিয়ে আনবেন।
আমি! আমি কী করে জানব–!
জানেন বইকি সুচরিতা দেবী, অদ্ভুত স্বরে বললে ইন্দ্রনাথ।
কী বলছেন–?
স্ক্রু-প্যাঁচালো চোখে চেয়ে রইল ইন্দ্রনাথ। তারপর খপ করে ছুতোরের টেবিল থেকে পেনসিল তুলে নিয়ে খসখস করে লিখল সাদা দেওয়ালে..
দু-টুকরো স্ফুলিঙ্গ জ্বলে উঠল সুচরিতার গোলগাল ফরসা মুখের অক্ষিগহ্বরে।
.
ইন্দ্রনাথ কী লিখল দেওয়ালে?
।মাতৃস্নেহের চরম পরীক্ষা এসেছিল ধাত্রী জননীর জীবনে–উইল লেখবার সময়ে। নাড়ী ছেঁড়া ধনকে সব পাইয়ে দেওয়ার অভিলাষে ছোট্ট একটি চক্রান্ত করেছিলেন সুচরিতা। রবিনবাবুর মন যাতে প্রথম পুত্রের ওপর বিষিয়ে যায়, তাই লোক লাগিয়ে নন্দনকে কিডন্যাপ করিয়েছিলেন কিছুদিনের জন্যে। ক্লোরোফর্মে বেহুশ হয়ে শুয়েছিলেন নিজে নিজে। ভাড়াটে কিডন্যাপার আঙুলের ছাপ কোথাও রাখেনি–কিন্তু মইটি রেখে গিয়েছে। মই মেরামতের টুকরো কাঠটিও রেখে দেওয়া হয়েছিল কুন্দনের স্টুডিওতে–ওরই র্যাদা দিয়ে চাচা হয়েছিল মইয়ের কাঠ। স্বামীকে সুচরিতাই জোর করে পাঠিয়েছিলেন থানায়। থানা আমোল না দেওয়ায় ইন্দ্রনাথের কাছে। সূত্র প্রমাণগুলো রহস্যসন্ধানীর চোখে ধরা পড়লেই ভাড়াটে কিডন্যাপারকে দিয়ে ফিরিয়ে আনত নন্দনকে।
কিন্তু ইন্দ্রনাথের খটকা লাগল ছেলের লাশ দেখবার ঝুঁকি নিয়েও থানা পুলিশ ডিটেকটিভদের শরণাপন্ন হওয়ার আগ্রহ দেখে। আগ্রহটা একা সুচরিতারই। মায়ের জাত তো এরকম হয় না।
তাই দেওয়ালে লিখল ইন্দ্রনাথ–পেটের বাচ্চা আর সতীন কাটা কখনও সমান হয়?
* দক্ষিণী বার্তা পত্রিকায় প্রকাশিত। (শারদীয় সংখ্যা, ১৯৭৭)
মধ্যরাতের মস্কো
ব্যক্তিগত শোকাবহ ঘটনার গল্প দিয়ে দৈনিকের পাতা ভরাতে অভ্যস্ত নই আমরা রাশিয়ানরা। অনেকরকম দুঃখময় দুর্ঘটনা ঘটতে দেখা যায় অনেকের অদৃষ্টে। বহু হতভাগ্য নর-নারী নিছক উচ্চাশা অথবা তীব্র অনুভূতির তাড়নায় হরেকরকম অপরাধও করে ফেলে। ফলাও করে এই সব কাহিনির প্রচার আমরা করি না। এর চাইতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা নিয়েই মাথা ঘামাতে হয় আমাদের। শুধু আমাদের জাতভাইদের দিক দিয়েই নয়, পৃথিবীর সব দেশের বাসিন্দাদের পক্ষেই গুরুত্বপূর্ণ এই সব সমস্যা। অনেক সমালোচকদের মতে ব্যষ্টির প্রতি অবহেলা থেকেই নাকি আমাদের এই ধরনের মতবাদ বা দৃষ্টিভঙ্গির উদ্ভব হয়েছে। প্রকৃত সত্যটুকু কিন্তু ঠিক তার বিপরীত। আমরা বিশ্বাস করি, সামান্য কয়েকটা চোর-ছ্যাঁচোড়, খুনে-গুন্ডা, জালিয়াত-বদমাশ আর নারীধর্ষণকারীদের তৎপরতা আর তাদের সমুচিত দণ্ডদানের সমস্যাগুলোকে হারিয়ে যেতে দেওয়া উচিত নয়।
সে যাই হোক, সারা দুনিয়ার পুলিশ সহকর্মীর সঙ্গে আমার কর্মজীবনের সবচেয়ে মনে রাখবার মতো কাহিনি বলবার সুযোগ যখন আমাকেও দেওয়া হয়েছে, তখন সে সুযোগের পরিপূর্ণ সদ্ব্যবহার আমি করব। শুনুন তবে এই ঘটনার বৃত্তান্ত।
১৯৫৫ সালের আগস্টের শেষাশেষি গ্রীষ্মের সেই রাতটার কথা এখনও ছবির মতোই মনে পড়ে আমার। রাতের তমিস্রা গাঢ় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দিনের দাবদাহও কমে এসেছিল অনেকখানি। আমার অধীনস্থ মস্কো মেট্রোর একজন ইন্সপেক্টরের ডিউটি শেষ হওয়ায় বাড়ির দিকে রওনা হয়েছিল। আর্কাডি গুরেলভিচ মানুষটি বড় ভালো। কাজ-কর্মে তার জুড়ি মেলা ভার, কমরেড হিসেবেও চমৎকার। প্রতিবেশী হিসেবে এই রকম মানুষকেই সবাই পেতে চায় যে যার পল্লীতে। একই ফ্ল্যাট-বাড়িতে থাকতাম আমরা। পাঁচতলার আর্কাডি আর দোতলায় আমি সপরিবারে। একই আমোদ-প্রমোদ কেন্দ্রে খেলাধুলো করত আমাদের ছেলেমেয়েরা, একই স্কুলে পড়তে যেত সবাই দল বেঁধে। সভা-সমিতিতে, সিনেমা-থিয়েটারে, পাবলিক স্কুলের সামাজিক অনুষ্ঠানে একই সঙ্গে যেতাম আমরা দুই পরিবার।
বছর পঁয়তাল্লিশ বয়স আর্কাডির। দুনিয়ায় দুটি জিনিস তার দারুণ প্রিয়; একটি কম্যুনিস্ট পার্টি এবং অপরটি ফুটবল খেলা। আগস্টের সেই রাতে সাবওয়ে স্টেশন থেকে বেরিয়ে যখন সে বাড়ির পথ ধরল, তখন ঘড়ির কাঁটা মধ্যরাত পেরিয়ে গেছে। রাস্তার আলোগুলো অর্ধেক নিভিয়ে ফেলা হয়েছে। আলো অন্ধকার মিশানো জনহীন পথঘাটে প্রাণী বলতে সে তখন একা।
আচম্বিতে রাস্তার মোড় থেকে বাঁক নিয়ে টায়ারের তীব্র আর্তনাদ তুলে পথ ছেড়ে ফুটপাতের ওপর বেগে ধেয়ে গেল ছোট্ট একটা মোটরকার। সামনেই পড়ল আর্কাডি। এমনই প্রচণ্ড বেগে তার ওপর এসে পড়ল গাড়িটা যে আর্কাডির দেহটা ছিটকে গিয়ে আছড়ে পড়ল সামনের উইন্ডস্ক্রিনের ওপর–বলা বাহুল্য সেই প্রচণ্ড সংঘাতে স্ক্রিনের কাঁচও অটুট রইল না।
