ছড়ির রূপো-হাতলে হাত বুলোত বুলোতে রবিনবাবু বললেন, ইন্দ্রনাথবাবু, এই হল ব্যাপার। জানলার নিচে শুধু মইটা পাওয়া গিয়েছে।
গালের ব্রন খুঁটতে-খুঁটতে ইন্দ্রনাথ বললে, কীসের মই?
কাঠের।
আঙুলের ছাপ?
একদম নেই।
সেইসঙ্গে খোকাও নেই, পাশ থেকে ডুকরে কেঁদে-ওঠা স্বরে বললেন রবিনবাবুর গিন্নি। ইন্দ্ৰনাথ উঠে দাঁড়িয়ে বললে, চলুন দেখে আসি।
.
রাসবিহারী এভিনর ওপরে বাগানওলা বাড়ি যে কজনের আছে, নিঃসন্দেহে তারা বিত্তবান। রবিনবাবুও এই মুষ্টিমেয়দের মধ্যে পড়েন। চা-বাগান আছে, কয়লার খনি আছে। সুতরাং লক্ষ্মীর পায়ে শেকল পরিয়ে রেখেছেন সিন্দুকের মধ্যে। দোতলার বিরাট চওড়া বারান্দায় দাঁড়ালে বড় রাস্তা দেখা যায় আউট হাউসের মধ্যবর্তী গেটের মধ্যে দিয়ে! আউট হাউসে এইমাত্র ঘুরে এসেছে ইন্দ্রনাথ। জিজ্ঞাসাবাদ করে নতুন কিছু জানা যায়নি। এস্টেটের কর্মচারী, দারোয়ান, চাকর সে রাতে ঘর ছেড়ে বেরোয়নি তুমুল বৃষ্টির জন্যে। তাই দেখেনি কাউকে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে হেঁট হয়ে মইটার দিকে তাকিয়েছিল ইন্দ্রনাথ। পুলিশ বিশেষজ্ঞরা ওই মই খুঁটিয়ে পরীক্ষা করেছেন। কিন্তু কিডন্যাপার অতিশয় ধুরন্ধর। আঙুলের ছাপ রেখে যায়নি, কোথাও কোনও সূত্র ফেলে যায়নি। শুধু ওই মইটা ছাড়া।
বারান্দার রেলিংয়ে ভর দিয়ে হেঁট হয়ে মই নিরীক্ষণ করতে করতে ইন্দ্রনাথ বললে, মৃগ, এরকম মই তো ফ্রি স্কুল স্ট্রিটে বিস্তর পাওয়া যায়, তাই না?
হ্যাঁ। ঘরাঞ্চি ঠিক নয়, বাঁশের মইও নয়। প্যাকিং কাঠ কেটে তৈরি।
মইয়ের ওপরের ধাপটা ঈষৎ চওড়া। অন্যান্য ধাপের মতো সরু নয়। কাঠটাও অন্যরকম। সাদাটে। গোটা মইটা কিন্তু নীলচে কাঠের তৈরি।
ইন্দ্রনাথ চেয়েছিল ওই ওপরের ধাপের দিকেই। চেয়ে থাকতে থাকতেই বললে মৃদু কণ্ঠে, মৃগ, ধাপটার গায়ে কতকগুলো ফুটো রয়েছে।
পেরেকের ফুটো, বললাম আমি। প্যাকিং কেস ভাঙা কাঠে অমন থাকে।
ফুটোর মধ্যে মরচে নেই।
তার মানে বাক্সটা রোদে জলে বেশিদিন থাকেনি, বললাম আমি।
কাঠটার রং এদেশি কাঠের মতো নয়।
কারণ ওটা বিদেশি কাঠ। বিলিতি পাইন। কাঠের শুয়ে দেখছিস না কত মিহি। রঙটাও সাদা। সাহেবদের দেশের কাঠ তো।
সদ্য কেনা মই। কিডন্যাপিংয়ের জন্যেই যদি কেনা হয়ে থাকে, তাহলে নিশ্চয় ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের দোকান থেকে কেনা?
তার কোনও মানে নেই, বললাম আমি। কিডন্যাপার যদি বালিগঞ্জ অঞ্চলের মানুষ হয়, তাহলে এপাড়া থেকেই কিনতে পারে।
এদিকে এরকম দোকান আছে?
আছে। কলকাতার অন্যান্য অঞ্চলেও আছে। নিউমার্কেটের পেছনে ওদের বড় ঘাঁটি।
আর কোনও কথা বলল না ইন্দ্রনাথ। প্রখর হল চক্ষু। হাত বাড়িয়ে মইটা টেনে আনল বারান্দার ওপর।
কী দেখছিস? শুধোই আমি।
নিরুত্তরে ওপর ধাপটার দিকে চেয়ে রইল ইন্দ্রনাথ। অনেকক্ষণ পরে সঙ্কুচিত চোখে বললে আস্তে-আস্তে, কাঠটা র্যাদা দিয়ে চাচা হয়েছে দেখছি।
তা তো হবেই, দুই ভুরু কাছাকাছি এনে বন্ধুবরের দৃষ্টিরেখা অনুসরণ করলাম, ঠিক ঠাহর করতে পারলাম না অ্যাঁদা দিয়ে কাঠ চাঁচা নিয়ে মন্তব্য করা হল কেন।
ইন্দ্র বললে, বাঁদা জোরে চাপার দরুন মাঝে-মাঝে কাঠের গায়ে বসে গিয়ে আটকে গিয়েছে। যেখানে-যেখানে এইভাবে আটকেছে, সেই-সেই জায়গায় তাকালেই বুঝবি, বাঁদাটা ভাঙা।
র্যাদা ভাঙা!
হ্যাঁ, ফলাটার মাঝখানে সামান্য ভাঙা ফাঁক আছে। সেই ফাঁকা জায়গায় কাঠ কাটেনি– উঁচু হয়ে রয়েছে।
ভারি আবিষ্কার করলি! বললাম তাচ্ছিল্যের সুরে, তোর আগেই ফোরেনসিক এক্সপার্টরা ও জিনিস দেখেছে। তারা নিশ্চয় ঘাস কাটেন না।
না, না, ঘাস কাটবেন কেন।–এমনি বললাম। নন্দনের হদিশ কি আর ওই ভাঙা ব্ল্যাদা থেকে বেরোবে।তাই মাথা ঘামাননি।
কান্নাজড়ানো কণ্ঠস্বর শুনলাম পেছনে, ইন্দ্রনাথবাবু, তাহলে কি খোকাকে পাওয়া যাবে না?
রবিনবাবুর স্ত্রী। নন্দনের গর্ভধারিণী। নিঃশব্দে এসে দাঁড়িয়েছিল পেছনে।
ইন্দ্রনাথ বললে, দেখুন আমার যথাসাধ্য আমি করব। তার আগে বাড়ির সবাইকে দেখতে চাই।
কুন্দনকে ডাকব?
ডাকুন।
আয়নার মতো চকচকে মার্বেল মেঝের ওপর শুভ্র নগ্ন পা ফেলে একজন সুদর্শন তরুণ এসে দাঁড়াল সামনে। বয়স কুড়ি-বাইশের বেশি নয়। সুকুমার মুখশ্রী। গড়ুর নাসিকা। সুদীর্ঘ চোখ। কৃষ্ণকালো মণিকায় সুগভীর ব্যঞ্জনা। দীর্ঘদেহী কন্দর্পকান্তি এই তরুণ যে শিল্পচেতনায় উদ্বুদ্ধ তার প্রমাণ ওই চোখে। বেশভূষা সাদাসিধে। খদ্দরের ঢিলেহাতা পাঞ্জাবি আর ধুতি। এই হল রবিনবাবুর প্রথমপক্ষের সন্তান। মাত্র এক বছরের শিশুকে আয়ার হাতে সঁপে দিয়ে তিনি ধরাধাম ত্যাগ করেছিলেন কর্কট রোগের আক্রমণে।
অপরিসীম মাতৃস্নেহ দিয়ে শিশু কুন্দনকে কৈশোরের সিংহদ্বারে নিয়ে এসেছিলেন এই আয়া। নাম সুচরিতা। কৃতজ্ঞতার ঋণ শোধ করেছিলেন রবিনবাবু আয়াকে স্ত্রীর আসনে অভিষিক্ত করে। কুন্দনের বয়স তখন পনেরো। নন্দন এল বছর ঘুরতেই। সমান স্নেহ দিয়ে নন্দন আর কুন্দনকে সিঞ্চিত করে চললেন সুচরিতা। গর্ভধারিনী নন বলেই বরং কুন্দনের প্রতি তাঁর স্নেহ বর্ষিত হল একটু অধিক পরিমাণেই।
পাঁচ বছরের সেই নন্দনই দুদিন আগে নিখোঁজ হয়েছে। তার মায়ের ঘর থেকে। মই বেয়ে দোতলার বারান্দায় উঠেছে কিডন্যাপার। সুচরিতাকে ক্লোরোফর্ম দিয়ে ঘুম পাড়িয়েছে। নন্দনকে নিয়ে অদৃশ্য হয়েছে বৃষ্টিঝরা অমানিশায়।
