সচকিত হল জিরো জিরো। কী করবে ভাবছে, অতর্কিতে বনের মধ্যে থেকে কক্ষচ্যুত উল্কার মতো ধেয়ে এল যেন সাক্ষাৎ বনদেবী।
অহো! অহো! কী রূপ! কী বিম্বাধর। কী তনুবর! কী বক্ষদেশ! টাইট জিন প্যান্ট আর গেঞ্জি পরা এহেন রূপসী শরীরী বিদ্যুতের মতো ছুটে এসে গজাননকে বলল, কুইক। খান বুদোশকে তুলুন গাড়ির মধ্যে।
খান বুদোশ। ফ্যালফ্যাল করে অপরূপার দিকে চেয়ে বললে গজানন।
আমাকে দেখবার অনেক সময় পাবেন। (অসহিষ্ণু স্বর বিম্বাধরার–ওরা যে এসে গেল। বলেই কোত্থেকে একটা রিভলভার বের করে দমাস করে মারল খান বুদোশের মাথায়। বেশ ভালো মার। জ্ঞান হারাল জিপসী-পাণ্ডা। ওদিকে গাছপালাদের ফাঁক দিয়ে দলে-দলে বেরিয়ে আসছে রংবেরঙের পোশাক পরা জিপসীদের দল।
দেখেই টনক নড়ল জিরো জিরোর। শুধু জিগ্যেস করলে, সুন্দরী, কে আপনি?
ত্রিশূল।
ও মাই গুডনেস, বলেই বীর বিক্রমে খান বুদোশকে টেনে নিয়ে গিয়ে ঢুকিয়ে দিল মারুতির পেছনের সিটে। ত্রিশূল সুন্দরীও সেখানে বসে পকেট থেকে নাইলন দড়ি বের করে বাঁধতে লাগল জিপসী সর্দারের হাত পা।
ততক্ষণে গাড়ি ঘুরে গিয়ে ছুটছে কলকাতায় দিকে–টপ স্পিডে। মাথার ফুলোটায় হাত বুলোতে-বুলোতে যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে গানটা গলা ছেড়ে গাইছে গজানন।
.
বারান্দায় দাঁড়িয়ে মাথা ঠান্ডা করে ফেলল গজানন। ত্রিশূল সংস্থাটার শুধু টাকার জোর নেই, রুচিও আছে বটে। খাসা বাংলো-বাড়ি! দার্জিলিংয়ে কালিম্পঙে যেমন কটেজ প্যাটার্নের দোতলা বাড়ি দেখা যায়, (গজানন শুনেছে বিলেতেও নাকি এমনই বাড়ি আছে)–অবিকল সেই ধরনের ছিমছাম বাড়ি গড়ে তুলেছে সল্টলেকের এই নিরালা সেক্টরে। চারপাশে অনেকখানি বাগান–মাঝে তন্বী শিখরদশনা পীন পয়োধরার মতো এই বাড়ি। বাস্তবিকই মনোরম।
ত্রিশূল সুন্দরীর নাম এলোকেশী, নামটা শুনে প্রথমে হেসেই ফেলেছিল গজানন। এলোকেশী তো তার পিসির নাম। ন্যাড়ামাথা বুড়িকে কতই না খেপিয়েছে গজানন। আর এই ডানাকাটা অপ্সরীর নাম কিনা এলোকেশী। যার চুল এলিয়ে দেওয়ার কোনও প্রশ্নই ওঠে না। কারণ চুল তো ব্যাটা ছেলের মতো ছোট-ছোট করে কাটা।
এলোকেশী মুক্তাহাসি হেসে গজাননকে নিয়ে এসেছে সল্টলেকের এই ডেরায়। একাই থাকে নাকি এখানে। দেশবিদেশ থেকে ত্রিশূল এজেন্টরা এলে নিশ্চয় ওঠে এখানে। এলোকেশী অবশ্য তা বলেনি, বুঝে নিয়েছে গজানন।
অচৈতন্য খান বুদোশকে একতলার হলঘরে শুইয়ে এলোকেশী গেল একটা দেওয়ালের সামনে। গজাননকে বললে, আপনি বারান্দায় যান–দোতলায়।
গজানন এতটা পথ ড্রাইভ করে এসে ভেবেছিল এলোকেশীর সঙ্গে কিঞ্চিৎ হাস্য পরিহাস করবে অথবা একত্রে রামভেটকিকে ফোন করবে। তাই একটু মনঃক্ষুণ্ণ হয়েই হনহন করে চলে গেল দোতলায়।
যাওয়ার আগে আড়চোখে দেখে নিল পকেট থেকে ডটপেন বার করছে এলোকেশী। এই সেই ধরনের ডটপেন যার দৌলতে রামভেটকি পাতাল বিবরের দ্বার উন্মোচন করেছিল। এখানেও নিশ্চয় সেইরকম ব্যাপার ঘটবে। দেওয়াল চিচিং ফাঁক হয়ে যাবে আলিবাবার রত্ন গুহার মতো।
কিন্তু দাঁড়িয়ে দেখবার প্রবৃত্তি হয়নি। এলোকেশী যখন সরাতে চায়, তখন সরেই যাওয়া যাক।
তখন সবে সন্ধে নামছে। সামনের বাগানে আধো-অন্ধকার। গজানন সিগারেট ফিগারেট খায় না। পাইপ টানে অথবা নস্যি নেয়। নস্যির ডিবেটা বার করে বাঁ-হাতের তেলোতে বেশ খানিকটা ঢালছে, এমন সময়ে চোখের কোণ দিয়ে দেখতে পেল নিচের বাগানে গাছপালার তলা দিয়ে সাঁৎ করে মিলিয়ে গেল একটা ছায়ামূর্তি।
হাতের নস্যি থেকে চকিতে চোখ তুলেছিল গজানন। কিন্তু ছায়ামূর্তি যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। ওপর থেকে ভালো করে ছাই দেখাও যায় না। কাজেই নস্যিটাকে সশব্দে নাকের ফোকরে চালান করে দিয়ে প্রবল বেগে নেমে এল নিচের তলায়। সামনের ঘরটা পেরিয়ে তবে যেতে হবে বাগানে। কিন্তু ঘরটা আর পেরোতে হল না।
সোফা থেকে গড়িয়ে পড়েছে খান বুদোশ। পুরো বুকখানা জুড়ে রয়েছে একটা গোল গহ্বর। ধড়ের ঠিক মাঝখানে এরকম খাঁ-খাঁ শূন্যতা চোখে দেখা যায় না।
গজাননের মনের চোখে ভেসে ওঠে অবতার সিং-এর মুন্ডুহীন ধর। এখানে রয়েছে বক্ষহীন ধড়।
কারা করছে এই কু-কাণ্ড? কীভাবে?
.
ত্রিশূল-এর গোপনঘাঁটির কি শেষ নেই? গজানন তাজ্জব হয়ে গেল এই কলকাতারই বুকে আর একটা অত্যাধুনিক ঘাঁটি দেখে।
ওকে সল্টলেকের বাড়ি থেকে নিয়ে এসেছিল রামভেটকি। এলোকেশী গুম হয়ে বসে রয়েছে পাশে। নক্ষত্ৰবেগে গাড়ি এল দমদম এয়ারপোর্টের দিকে। তারপর ঢুকে গেল একটা বাগানবাড়ির মধ্যে।
খান বুদোশের বক্ষহীন ধড় আগেই পাচার করে দিয়েছিল রামভেটকি।
গাড়ি দাঁড়াতেই প্লেন ড্রেস পরা একজন কম্যান্ডো (চেহারা দেখলেই বোঝা যায়। কদমছাঁট চুল, বুলডগের মতো মুখ, পেটাই চেহারা।) এসে শুধু বলল গজাননকে, আজকের মন্ত্র?
সব ব্যাটাকে ছেড়ে দিয়ে বেঁড়ে ব্যাটাকে ধর টাইপের ব্যাপারটা হয়ে গেল না? চড়াৎ করে রক্ত চড়ে গেল গজাননের মাথায়। একে তো সংস্কৃতটা সে জানে না, তার ওপর ডাইনে বাঁয়ে ত্রিশূল-এর দুই কেউকেটা থাকতে তাকে মন্ত্র জিগ্যেস করা কেন?
মুচকি হেসে (গরিলা মুখে যতটা হাসা যায়) রামভেটকি বললে, সিকিউরিটি কাউকে বিশ্বাস করে না–আমাদেরকেও নয়। মন্ত্রটা আমাদের তিনজনকেই বলতে হবে।
