চেয়ার থেকে নামল ক্যাসানোভা। আরুণির কোমর থেকে খুলল দড়ির বাঁধন। সঙ্গে সঙ্গে দেহটা হেলে পড়ল। পা রইল টুলে–ফস রইল গলায়। কিন্তু দম বন্ধ হল না তুলোর দৌলতে। এ ভাবে অনেকক্ষণ বাঁচিয়ে রাখা যাবে আরুণিকে। দেহের খানিকটা ওজন টুলের ওপর পড়ায় গলায় ছাপ পড়ছিল অনেক কম।
তারপর লিফট-এর সঙ্গে বাঁধা দড়ির প্রান্তটা তুলে আনল ক্যাসানোভা। বাঁধল আরুণির পায়ে। ট্রাউজার্সের ক্রিজ নষ্ট হয়েছিল ওই জন্যেই। পাটের ফেঁসো নিয়েও কতই না গবেষণা করেছে জয়ন্ত। একবারও খেয়াল হয়নি স্রেফ ধোঁকা দেওয়ার জন্যেই পায়ের চামড়ার ওপর না বেঁধে ট্রাউজার্স সমেত দড়ি বেঁধেছিল ক্যাসানো।
এরপর টুলের পায়া ঘিরে একটা দড়ি জড়ালো ক্যাসানোভা। দড়ির দুটোপ্রান্তই বেঁধে রাখল স্কাইলাইটের শিকে। সবশেষে মুছল চেয়ারটা।
কাজ শেষ। ঘর থেকে বেরিয়ে এল ক্যাসানোভা। রাত তখন সাড়ে নটা। ইস্পাহানি ওকে এগিয়ে দিল নীচতলায়। একটু অপেক্ষা করে ক্যাসানোভা গেল পাবলিক টেলিফোন বুথে। ফোন করল ডক্টর লুথাকে আরুণির নাম নিয়ে। জরুরি দরকার, এখুনি আসতে হবে। একজন ডাক্তারকে অকুস্থলে হাজির না করলে এত আয়োজন ফেঁসে যেতে পারে। ডাক্তারের সার্টিফিকেট থাকা চাই এই মর্মে যে, হা ক্যাসানোভা বেরিয়ে যাওয়ার অনেকক্ষণ পরে মারা গিয়েছে আরুণি। তিনি আসার মিনিট কয়েক আগেই তার প্রাণপাখি উড়েছে।
থিয়েটারে ফিরে এল ক্যাসানোভা। বাড়ি থেকে থিয়েটারে আসতে ডক্টর লুথার কমিনিট সময় লাগে, সে হিসেব তার জানা। তাই ঠিক সময়ে থিয়েটারে এল সে লিফষ্টা নীচে নামিয়ে আরুণির দম বন্ধ করার জন্যে। কিন্তু গিয়ে কি দেখল? না আমাদের তপনবাবু তার হয়ে অপকর্মটি নিজেই করছেন অর্থাৎ লিফ্ট নামাচ্ছেন। ফলে আরুণিকে আর স্বহস্তে বধ করতে হল না ক্যাসানোভাকে।
মাগে! অস্ফুট কণ্ঠে বলল সুলতা। তপন কেবল টোক গিলল শুকনো গলায়।
ঘাবড়াবেন না, তপনবাবু না জেনে যা করেছেন তার জন্যে আপনাকে দায়ী করা চলে না কোনও মতেই। যাই হোক, লিফট নীচে নামতেই তিনতলায় আরুণির গোড়ালিতে বাঁধা দড়িতে টান পড়ল। টানের চোটে গোড়ালি গিয়ে পৌঁছোল স্কাইলাইটের ইঞ্চি কয়েক দূরে। ঘাড়ের পেছনটা কড়িকাঠের কোণে লাগতেই মট করে ভাঙল সারভাইকালভারটিব্রা অর্থাৎ কশেরুকার একটা হাড়।
চটপট ছাদে উঠল ক্যাসানোভা। স্কাইলাইটের ফাঁক দিয়ে হাত গলিয়ে খুলে দিল গোড়ালির বাঁধন। পেণ্ডুলামের মতো দোদুল্যমান হল আরুণির লাস। দড়িটা টেনে নিল ক্যাসানোভা। শিকে বাঁধা দড়ির দুপ্রান্ত ধরে টান দিতেই উলটে পড়ল টুলটা। দড়ির একপ্রান্ত ধরে টেনে বার করে নিল ক্যাসানোভা। ঘরের মধ্যে ঝুলতে লাগল কেবল আরুণির দেহ।
সুলতা দেবী, কি বেস কথা বলেছিলেন এখন বুঝছেন তো? জয়ন্তকে জিগ্যেস করেছিলেন, হাড়টা ভাঙল কী করে? কড়িকাঠের ধাক্কায়? উল্টো মাধ্যাকর্ষণ নাকি? শুনেই টনক নড়েছিল ক্যাসানোভার। চোরের মন বোঁচকার দিকেই থাকে। ওর দৃঢ় বিশ্বাস হয়েছিল, আপনি ওর গুপ্তরহস্য জেনেছেন। তাই পরলোকে যাওয়ার প্রয়োজন হয়ে পড়ল আপনার।
কি বেইমান! বুঝিয়ে-সুঝিয়ে আমিই বিয়ে দিলাম ওদের–সুলতা ফুঁসে উঠল।
ইন্দ্রনাথ ঝকঝকে চোখে তাকিয়ে বললে–কি সুন্দর প্ল্যানখানা দেখেছেন। জটিল সন্দেহ নেই। কিন্তু পরিষ্কার তকতকে। খোঁচ নেই কোথাও। সমস্ত ঘটনাটা ঘটতে লেগেছে দশ মিনিট। ইস্পাহানির দরজা খোলা ছিল আগাগোড়া, তার চোখও ছিল এই দিকে। শুধু একটা খটকা লেগেছিল আমার। টুলটা উলটে পড়ার শব্দ শুনে ইস্পাহানি কেন উঠে আসেনি। এলে ক্যাসানোভার জবর সাক্ষী জুটতে। থিয়েটারে গিয়ে কারণটা আবিষ্কার করলাম। ইস্পাহানি বার্ধক্য হেতু কানে একটু কম শোনে। ক্যাসানোভার হিসেবে এ সম্ভাবনাটা ছিল বলেই ডাক্তারকে হাজির করেছিল টেলিফোন করে। কিন্তু ঘুণাক্ষরেই আঁচ করতে পারেনি, যাকে খতম করার জন্যে এত জোগাড়যন্ত্র তারই দেওয়া আর্সেনিক বিষে সে নিজেই খতম হয়ে চলেছে তিল তিল করে। একেই বলে ভগবানের মার, দুনিয়ার বার।
ইন্দ্রনাথ থামল। উৎপাত-যন্ত্র টেলিফোনটাও যেন এতক্ষণ ধরে রুদ্ধশ্বাসে শুনছিল ওর বচন-মালা। রহস্যোঘাটন পর্ব সমাপ্ত হতে না হতেই এমন আওয়াজ করে উঠল যে কান ঝালাপালা হয়ে গেল ঘরশুদ্ধ সকলের।
ধরল কবিতা। বলল–জয়ন্ত ঠাকুরপো, লালাবাজারের ফোন। তোমার ব বিপুল উৎসাহে লম্ফ দিয়ে রিসিভার ধরল জয়ন্ত। কান পেতে শুনল কিছুক্ষণ, তারপর মেঘ গর্জনের মতো বলল গুরুগম্ভীর গলায়–কেন্স সেট হয়ে গেছে, স্যার। আমি আসছি।
ইন্দ্রনাথ কাষ্ঠ হেসে বললে–বাহাদুরিটা তুই-ই নিস্ রে। প্রোমোশন হবে। আর আমাকে দিস শুকনো ধন্যবাদ।
মাভৈঃ, অভয় দিলাম। আমি তোকে দেব তুই যা চাস।
গল্পের নাম কী দেবে? বচন ফকিরের কল্কে? টিটকিরি দিল কবিতা।
ভানুমতীর খেল, দরজার কাছ থেকে বলল জয়ন্ত এবং বেমালুম অদৃশ্য হয়ে গেল ভোজরাজ কন্যা ভানুমতীর মতোই।
* বিচিন্তা পত্রিকায় প্রকাশিত। শারদীয় সংখ্যা, ১৯৭৩।
মই
রবিনবাবুর বয়স ষাটের অধিক। খুব ফরসা। ঢ্যাঙা। খাড়াই নাক। চওড়া কপাল। চোখ দুটি কিন্তু এখনও উজ্জ্বল। মাথার সব চুল পেকে সাদা হয়ে গিয়েছে। নাকের নিচে দুপাশে পাকানো একজোড়া গোঁফ আছে সাদা। এমনকি ভুরুর চুল পর্যন্ত সাদা। পরনে গিলেহাতা আদ্দির পাঞ্জাবি এবং পায়জামা। হাতে রুপো বাঁধানো ছড়ি। রবিনবাবু একা আসেননি। গিন্নিকে এনেছেন। রবিনবাবুর তুলনায় তিনি অল্পবয়স্কা। সিঁদুর দিতে দিতে মাথার দিকের চুল প্রায় উঠে গিয়েছে। ইনিও খুব ফরসা। সাদাপেড়ে সাদা সিল্কের শাড়ি দিয়ে সর্বাঙ্গ মুড়ে বস্তার মতো বসে আছেন। স্থূলাঙ্গী। সে তুলনায় রবিনবাবু বেশ ছিপছিপে।
