দমা করে বেতাল শব্দ হল। ঝনঝন করে নেচে উঠল টেবিল ভর্তি কাপডিস প্লেট চামচ। দেখা গেল, বিপুল মুষ্টাঘাত করেছে ইন্সপেক্টর জয়ন্ত চৌধুরী। আর চেঁচাচ্ছে গাঁকগাঁক করে–কিন্তু কীভাবে? কীভাবে? কীভাবে?
এইভাবে, বলে শুরু করল ইন্দ্রনাথ রুদ্র।
.
আরুণির ওপর ক্যাসানোভার বিতৃষ্ণার কারণটা আর একবার ঝালিয়ে নিই। সুলতা দেবী সেই দৃশ্যের উপসংহারটুকু দেখেছিলেন। ক্যামেলিয়াকে আরুণি ধর্ষণ করতে চেয়েছিল, তাই না?
মুখ লাল হল সুলতা দেবীর। কবিতা বললে–মরণদশা আর কি! কথার ছিরি ছাঁদ নেই।
ইন্দ্রনাথ বললে–তাই আরুণির প্রাণপাখিকে উড়িয়ে দেওয়ার সংকল্প নিল ক্যাসানোভা। কিন্তু সেই সঙ্গে নিজের প্রাণ পাখিটিও যাতে সকালে ফাঁসির দড়িতে না উড়ে যায়, তাই আটঘাট বাঁধল সে। উদ্ভট নাটক করে করে ব্রেনের মধ্যে তার গজগজ করছিল উদ্ভট বুদ্ধি, তাই–
নাটকটা আমার লেখা, গম্ভীর মুখে বলল সুলত। এবং সেটা উদ্ভট নয়।
ওই হল গিয়ে। তাই একটা বিটকেল প্ল্যান ডালপালা মেলে ধরল ক্যাসানোভার উর্বর মস্তিষ্কে। ওর প্রথম কাজ হল, কড়িকাঠে একটা হুক পেঁচিয়ে লাগানো, সেই হুক থেকেই পরে খলনায়ক আরুণিকে ঝুলতে দেখা গেছে। সুযোগের অভাব ছিল না। দীর্ঘদিন ধরে নিষ্ঠাসহকারে সূচনা পর্ব সমাপ্ত করেছে ক্যাসানোভা। হুকটা আরুণির চোখে পড়লেও বিপদ নেই। হুক নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না। আরুণিও নিশ্চয় ঘামায়নি।
এর পরের ধাপে বেশ খানিকটা নেমবুটাল জোগাড় করতে হল ক্যাসানোভাকে। আখতারের ঘর থেকে শিশি ভর্তি নেমবুটাল সরাতে বেগ পেতে হল না মোটেই। বেশ খানিকটা ড্রাগ জিনের বোতলে মিশিয়ে রেখে দিল আরুণির ঘরে। ভুল করল সেইখানেই। কেননা নেমবুটাল মেশাতে হলে বোতলের মদে মেশাতে হবে। অথচ বোতলটি পরে পাওয়া যাবে এবং সন্দেহের উদ্রেক ঘটাবে। তাই ক্যাসানোভার প্ল্যান ছিল নিশ্চয় কামফতে হওয়ার পর নেমবুটাল মিশোনো মদের বোতল সরিয়ে সেখানে নিরীহ জিনের একটা বোতল রাখা, কিন্তু বোতল পালটা-পালটি করার মুহূর্তটি যেই এল বেমালুম বিষয়টি বিস্মৃত হল ক্যাসানোভা। অতি বড় হুঁশিয়ার অপরাধীও কিছু না কিছু ভুল করে। ক্যাসানোভাও সাজানো আত্মহত্যার দৃশ্যে রেখে গেল মার্ডারের স্পষ্ট সূত্র।
যথা সময়ে বাইরে রেস্তোরাঁয় খেয়ে দেয়ে মাল টেনে ড্রেসিংরুমে এল আরুণি ফের জিনের বোতল ট্র্যাক করার সাধু অভিলাষ নিয়ে। ঘুমের ওষুধের কাজ শুরু না হওয়া পর্যন্ত সবুর করল, তারপরে উঠে এল ছাদে বেশ খানিকটা দড়ি নিয়ে। ওঠবার সময়ে দেখে গেল, লিফষ্টা প্ল্যানমাফিক দোতলাতেই আছে–একতলায় নেই। ও জানত, বুড়ো ইস্পাহানি লিফট-র কলকজায় হাত দিতে চায় না কখনও বিগড়ে গিয়ে মাঝখানে আটকে যায় এই ভয়ে। অত রাতে ফিরোজা থিয়েটারে যে কেউ আসবে না–তাও জানত ইস্পাহানি। সুতরাং যেখানকার লিফট, সেইখানেই রেখে সে তামাক খাবে নিজের ঘরে বসে, সেই ফাঁকে ঘরের স্কাইলাইটের কাছেই লিফট-এর কলকজায় কেরামতি করতে পারবে ক্যাসানোভা।
বটে! আচম্বিতে সটান হয়ে বসল জয়ন্ত।
ঠাকুরপো! বুঝেছি, সবিস্ময়ে বলল কবিতা।
কিন্তু যেই আমি বিজ্ঞতা জাহির করতে গেলাম, ইন্দ্রনাথ আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললে–হ্যাঁ, ধরেছো ঠিক তোমরা। কিন্তু তপনবাবু যদি লিফট নাও চালাতেন, ক্যাসানোভা চালাত। তার কাজটা আপনি সেরে দিলেন দেখে সে অবশ্য অবাক হয়েছিল যথেষ্ট।
দড়ির একটা প্রান্ত সে বাঁধল হয় লিফট-এর কলকজার সঙ্গে, না হয় লিফট-এর মাথায়। দড়িটা কতখানি লম্বা রাখলে লিফট-এর টানে আরুণির মুণ্ডু ধড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে না, সেটা অবশ্য হিসেব করে মেপে রেখেছিল ক্যাসানোভা। তাই অপর প্রান্তটা গলিয়ে আনল স্কাইলাইটের ফোকর দিয়ে, ঝুলিয়ে দিল মেঝের ওপর। স্কাইলাইট দিয়েই আরও দুটি জিনিস ঘরে ফেলল সে। খানিকটা তুলো আর দু-গাছা দড়ি। আগে থেকেই একটা উপযুক্ত উচ্চতার টুলও রাখা হয়েছিল ঘরের মধ্যে।
মঞ্চসজ্জা সম্পূর্ণ হল। নাটকের সংলাপ বা ওই জাতীয় কিছু নিয়ে সফল নায়ক আরুণির সঙ্গে আলোচনার জন্যে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করা ছিল আগে থেকে। কারো মনে সন্দেহ না আনার জন্যেই এই ব্যবস্থা। আরুণির ঘরে এল কাঁটায় কাঁটায় নটায়। চেয়ারে দাঁড়িয়ে একগাছি দড়ি বাঁধল কড়িকাঠের হুকে। অপর প্রান্তে রইল একটা ফঁস। এমনভাবে ফাঁস তৈরি হল যাতে গিঁটটা চোয়ালের খাঁজে পড়ে।
এরপর আর একগাছি দড়ি বাঁধা হল আরুণির কোমরে। অন্য প্রান্তটা গলিয়ে আনল কড়িকাঠের হুকের মধ্যে দিয়ে এবং টান মারল হেঁইও বলে। নেমবুটালে অচেতন আরুণি দুলতে দুলতে উঠল শূন্যে। ত্রিশঙ্কুর মতো তাকে শূন্য মার্গেই রেখে দড়ির প্রান্তটা বাঁধল দরজার কড়ায়। টুলটা এমন ভাবে রাখল হুকের নীচে যাতে আরুণির পায়ের ভর রইল টুলের ওপরে। আবার উঠল চেয়ারে। গলা ঘিরে তুলোর পটি দিয়ে মুণ্ডুটা গলিয়ে দিল ফাসের মধ্যে। তুলোর পটির ওপর আলতো করে এঁটে দিল দড়ির ফাস।
সুইসাইড যারা করে, তাদের কেউ কেউ মৃত্যুকালেও একটু আরাম পেতে চায়। ক্যাসানোভার তাতে সুবিধে হল। কেননা, আরুণির মৃত্যুর যে সময় নির্ধারণ করেছিল ক্যাসানোভা, ততক্ষণ পর্যন্ত তাকে বাঁচিয়ে রাখার দরকার ছিল বই কি।
