এতগুলো কথা বেশ খুশি খুশি স্বরে বলে থামল ইন্দ্রনাথ। তারপর বললে হাসি মুখে–তপনবাবু, সুলতা দেবী, আপনাদের অহেতুক উদ্বেগের মধ্যে রাখতে চাই না। বসুন আপনারা। শুনে রাখুন, দু-দুটো মরণফাঁদ পাতা হয়েছিল ফিরোজা থিয়েটারে। দুটোকেই অপারেট করেছেন একা তপনবাবু। দুটোর মধ্যে একটা পাতা হয়েছিল অবশ্য শুধু তপনবাবুর জন্যেই।
ঢোঁক গিলল তপন। সুলতার সাদা মুখে আবার রক্ত ফিরে আসতে দেখা গেল।
নিজের মনেই বলল তপন–দুটো মরণ ফাঁদ…
হ্যাঁ। কারণ এ মামলায় হত্যাকারীর সংখ্যা দুই–এক নয়।
কী বলছ ঠাকুরপো? এতক্ষণে মুখ খুলল কবিতা। দুজন হত্যাকারী?
দুই হত্যাকারীই এখন মৃত, শান্ত স্বর ইন্দ্রনাথের।
আরুণি আর ক্যাসানোভা! ছিপিখোলা সোডার বোতলের মতো বিস্ময় ধ্বনি করল তপন।
হ্যাঁ। ক্যাসানোভা খুন করেছে আরুণিকে। আরুণি আপনার প্রাণ নিতে গিয়ে নিয়েছে ক্যাসানোভার। ভাগ্যের কি পরিহাস দেখুন। মরবার পরেও ঘাতককে মেরে গেল আরুণি।
কপালের ঘাম মুছতে মুছতে সুলতা বললে–কিন্তু আমার ওপর চড়াও হওয়ার সখ হল কার?
ক্যাসানোভার। কারণ একটা বেস কথা বলে ফেলেছিলেন ম্যারেজ ডিনারে। মনে পড়ছে?
বেফাঁস কথা! কী?
জয়ন্তকে জিগ্যেস করেছিলেন, তবে হাড়টা ভাঙল কী করে? কড়িকাঠের ধাক্কায়? উল্টো মাধ্যাকর্ষণ নাকি?
আমি তো বুঝতেই পারছি না সে কথার সঙ্গে–
বুঝিয়ে দিচ্ছি। প্রথমে ক্যাসানোভা বধের দুর্বোধ্য জায়গাগুলো বোঝবার চেষ্টা করা যাক। প্রথম থেকেই জানতাম ক্যামেলিয়া নির্দোষ। স্বামীকে সে ভালোবাসত। খুন করা তার কল্পনাতীত। অথচ স্বামীর খাবারে বিষ মেশানোর সব চাইতে বেশি সুযোগ তারই। কিন্তু বিষ দেওয়ার জন্যে কেউ বিয়ে করে না। তাহলে? কাজটা অন্য কারো। আর্সেনিককে ক্যাসানোভার দেহে ঢোকানো হয়েছে অন্য কোনও পথে। কী পথে? ভাবতে ভাবতে মনে পড়ল চামড়ার মধ্যে দিয়ে আর্সেনিক পয়জনিংয়ের নজির নতুন নয়। বহুবিধ কসমেটিকস এর মধ্যে দিয়ে, বিশেষ করে ফেস ক্রিমের মাধ্যমে এ দুর্ঘটনা বহুবার ঘটেছে অতীতে। আরও মনে পড়ল, একজিমার দাগ ঢাকবার জন্যে মেক আপ নিয়ে মেহনৎ করাটা খুবই স্বাভাবিক ক্যাসানোভার পক্ষে। মনে পড়ল দানবীর তপনবাবুর ক্রিমদানের বৃত্তান্ত। নিজের অজান্তে বিষাক্ত ক্রিম দিয়ে মেরে ফেলেছেন ক্যাসানোভাকে। তাই বলছিলাম ক্যাসানোভার হত্যাকারী ওঁকেও বলা চলে।
তপনবাবু, এই সব কারণেই প্রথমে আপনাকেই সন্দেহ করেছিলাম। কী হল? মন খারাপ হল নাতো? জানেন তো, আমরা গোয়েন্দারা ভূশণ্ডির কাক। সর্বজ্ঞ মহাপুরুষ যেন–অন্তত আমার লেখক বন্ধু মৃগাঙ্কর গল্পগুলো পড়ে এইরকম মিথ্যে ইমেজ খাড়া হয়ে যায়। আসলে তা নয়, আমরা সন্দেহ করি সবাইকেই। তারপর বাদ দিতে থাকি একে একে। আপনিও বাদ পড়লেন দুটি কারণে। প্রথমতঃ আপনার অকুণ্ঠ সরলতা এবং প্রাণ ভোলা কথাবার্তা। বিষাক্ত ক্রিমের জার জেনে শুনে কেউ অর্পণ করলে এতটা সহজ হতে পারে না। দ্বিতীয়তঃ ক্যাসানোভাকে মেরে আপনার লাভ কী? কিছু না। ক্যামেলিয়াকে নিয়ে ক্যাসানোভার সঙ্গে আপনার কোনও প্রেমের ত্রিভুজ গড়ে ওঠেনি। ফলে, ওর ওপর কোনও বিদ্বেষ নেই আপনার। অবশ্য জ্যাক দি রিপারের মতো উন্মাদ খুনে যদি হন আপনি, তাহলে স্বতন্ত্র কথা। আপনার ড্রেসিংরুমে আরুণি গিয়েছিল নিজের জার থেকে বিষযুক্ত ক্রিম আপনার জারে চালান করতে। কিন্তু আপনি বুঝলেন উল্টো। আপনাকে বোঝানোও হল–ক্রিম ফুরিয়ে গিয়েছে আরুণির। তাই কঁচুমাচু মুখে সটকে পড়ল ঈর্ষাকাতর নায়ক। এ-কাহিনীতে অবশ্য সে খল নায়ক। প্রতিযোগিতায় আপনার কাছে হেরে–
প্রতিযোগিতা কেন বলছেন? ক্ষীণকণ্ঠে প্রতিবাদ জানায় সুলতা। প্রেমের? আমি কি তাকে প্রেম করতাম?
সরি। আমি তা মনে করিনি। যাই হোক, ঈর্ষার বিষে জ্বলেপুড়ে কাণ্ডজ্ঞানহীন হয়ে গিয়েছিল আরুণি। বিষযুক্ত ক্রিম কিছুদিন ব্যবহার করলেই তপনবাবু অসুস্থ হতেন, ডাক্তার দেখাতেন, আর্সেনিক পয়জনিং ধরা পড়ত–কিন্তু এমনই পাথর চাপা কপাল লোকটার, হাতে নাতে ধরা পড়ল আপনার কাছে। তারপরেও বেচারির বুদ্ধিশুদ্ধি তালগোল পাকিয়ে গেল আপনি দিব্বি সুস্থ থাকায়। ও হয়তো চেয়েছিল বিষযুক্ত ক্রিম ফিরিয়ে নিতে–কিন্তু কেন নেয়নি সে রহস্য আমি উদ্ধার করতে পারিনি।
ওই ঘটনার পর থেকে আমার জিনিসপত্র আলমারিতে তালা দিয়ে রাখতাম, বলল তপন।
ঠিক। ওই জন্যেই সে ক্রিম পুনরুদ্ধার করতে পারেনি, অথচ ক্রিমের বিষাক্ত ফলাফলও দেখতে পায়নি।
সে জন্যে আমি কৃতজ্ঞ আমার স্ত্রীর কাছে, বলল তপন। সেইদিনই ও নতুন ক্রিমের জার না আনলে ওকে আজ বিধবা হতে হত। তবে হ্যাঁ, ক্যামেলিয়া সধবা থেকে যেত।
সাময়িকভাবে থাকত, বলল ইন্দ্রনাথ। আর্সেনিক পয়জনিংয়ে না মরলেও ফাঁসির দড়িতে মরত ক্যাসানোভা…আরুণির অনেক আগে থেকেই ক্যাসানোভার শরীরে বিষ ঢুকতে শুরু করেছিল বলেই সন্দেহের আঁচ থেকে রেহাই পেয়েছেন তপনবাবু। নইলে ধরে নেওয়া যেত, আপনি ক্যাসানোভাকে খুন করেছেন এই কারণে যে ক্যাসানোভা জানত আপনি আরুণিকেও খুন করেছেন। কিন্তু আসলে তা তো হয়নি। আরুণির প্রাণপাখি উড়িয়ে দিয়েছিল একজনই–ক্যাসানোভা।
কাষ্ঠহেসে বললে তপন–কিন্তু আপনি যে বললেন আমিই–
