হারানো রিভলভারটা আবির্ভূত হল তার মিনিট কয়েক পরেই।
সহসা তপনের খেয়াল হল কোথায় যেন কী একটা গণ্ডগোল হয়েছে। ডাণ্ডার মার আর গ্যাসের বিষে মুমূর্ষ হয়েও সঙ্গীত-সুধায় সে চাঙ্গা হয়ে উঠেছিল মিনিট কয়েকের মধ্যেই। আত্মবিস্মৃত হয়ে পিয়ানোর রীডের ওপর আঙুল চালনা করছিল ক্ষিপ্রবেগে।
আচম্বিতে ওর মনে হল সামনের সারির শ্রোতারা ঈষৎ উন্মনা হয়েছে। তাদের কান এখন পিয়ানোর দিকে নেই–সারি সারি চোখগুলো গেঁড়ির চোখের মতো ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে।
সম্বিৎ ফিরতেই তপন দেখল বিস্ফারিত চোখগুলো তার দিকে নিবদ্ধ নয়–নিবদ্ধ তার পেছন দিকে।
সুতরাং কাঁধের ওপর দিয়ে পেছনে তাকিয়েছিল তপন নিছক কৌতূহল বশে। এক পলকে যা দেখল কাজ হল তাইতেই। পিয়ানো ছেড়ে ছিটকে গেল তপন। একলাফে মঞ্চ থেকে প্রেক্ষাগৃহ, সেখান থেকে দরজা। পিস্তল নির্ঘোষটা শোনা গেল দরজায় পৌঁছোনোর আগেই! আশ্চর্য! এ-রকম নাটকীয় কাণ্ডর পর হট্টগোলে ফেটে পড়া উচিত ছিল প্রেক্ষাগৃহ। কিন্তু যুগটা নিওরিয়ালিজম্-এর। নাটকটিও নতুন। সুতরাং দর্শক সাধারণ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে ভাবল পিয়ানো ছেড়ে চম্পট দেওয়াটা বোধ হয় নাটকেরই অঙ্গ। ভাবল, নতুন চমক। অনেকে তো শতমুখে তারিফ করার জন্যে যুৎসই বুলি সাজাতে আরম্ভ করে দিল মনের মধ্যে।
কিন্তু সামনের সারির দর্শকরা ভ্যাবাচাকা খেয়ে ভাবল–তাইতো! এ আবার কি ধরনের নিওরিয়ালিজম! সিরিয়াস মুহূর্তে একী ছন্দপতন! তারা যে স্বচক্ষে দেখেছে রিভলভারটাকে পেছনের উইংসের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে আসতে দেখেছে নলচের মুখে আগুন–শুনেছে ফায়ারিংয়ের পিলে চমকানো আওয়াজ।
বেশি কিছু বোঝবার আগেই পর্দা নেমে এসেছিল হুড়মুড় করে। বিদ্যুৎবেগে মঞ্চে আবির্ভূত হয়েছিল দুই গোয়েন্দা-ইন্দ্রনাথ আর জয়ন্ত। রিভলভার সমেত গ্রেপ্তার করেছিল–
ক্যামেলিয়াকে!
তপন? না, মরেনি। আহতও হয়নি। আনাড়ির বুলেট তাকে স্পর্শও করেনি।
নাটক আবার শুরু হয়েছিল। তপন ফের বসেছিল পিয়ানোর সামনে।
মৌজ করে সিগারেট সেবন করতে করতে তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলেছিল ইন্দ্রনাথ–ওহে সরকারি টিকটিকি, ক্যামেলিয়াকে যেন আরুণি-নিধন আর স্বামীবধের অপরাধে নির্যাতন কোরো না। দুদিনের মধ্যে বিধবা হয়েছে বেচারা, পাগল হতে বেশি দেরি নেই।
আমতা আমতা করে বলেছিল জয়ন্ত–মাই ডিয়ার ইন্দ্রনাথ, ক্যামেলিয়া কিন্তু তপনকে খুন করবার চেষ্টা করেছিল ডাণ্ডা মেরে, গ্যাস দিয়ে আর গুলি করে।
তাতো করবেই। বলে আর দাঁড়ায়নি ইন্দ্রনাথ। ঊর্ধ্বশ্বাসে উধাও হতে হতে শুধু বলেছে–ভানুমতীর খেল-এর ঐন্দ্রজালিকের নামটি যদি জানতে চাও কাল সকালে এসো মৃগাঙ্কর বৈঠকখানায়। কফি আর মাছের কচুরীর নেমন্তন্ন রইল। আর হ্যাঁ, সঙ্গে আনবে তপন আর সুলতাকে।
মাছের কচুরীর পাহাড় বানিয়ে ফেলেছিল গৃহিণী। একদা বোম্বাই বাসিনী কোটিপতির দুহিতা যে পাঁচকশালায় প্রবেশ করলে ইন্দ্রের শচী হয়ে যায়–তা যে-না মাছের কচুরি চেখেছে, সে বুঝবে না।
উদগার তুলে হট কফিতে চুমুক দিল তপন। শুধোলো–এবার বলুন ইন্দ্রনাথবাবু, আরুণিকে খুন করেছে কে?
আপনি, বলে কঁচির নতুন প্যাকেট ছিঁড়ল ইন্দ্রনাথ।
ঠং করে একটা শব্দ হল। কাপ নামিয়ে রেখেছে তপন। চোয়ালটা শিথিল হয়ে ঝুলছে অদ্ভুতভাবে। আর, সুলতা অস্ফুট চিৎকার রোধ করার জন্যে হাত চাপা দিয়েছে মুখে।
ধীরেসুস্থে প্যাকেট ছিঁড়ল ইন্দ্রনাথ। দেশলাইয়ের খোলে ঠকঠক করে ঠুকল সিগারেটের প্রান্তদেশ। ঠোঁটে ঝুলিয়ে অগ্নিসংযোগ করল অপর প্রান্তে। বলল এক মুখ ধোয়া ছেড়ে–আপনাদের অনেকেরই বিশ্বাস মিঠে চেহারার ওই ক্যামেলিয়াই এতগুলি খুনের নায়িকা। বিশেষ করে তাকে যখন হাতে-নাতে ধরা গেছে তপনবাবুকে খুন করার প্রচেষ্টায়। ঠিক কিনা?
দুবার, শুকনো গলায় বলল তপন, দুবার সে চেষ্টা করেছিল আমাকে প্রাণে মারবার।
খুব একটা অন্যায় করেনি। ও আপনাকে ঘৃণা করত। ঘৃণার কারণ আর কিছুই নয়। আমরা জানবার অনেক আগেই ও জেনে ফেলেছিল, তার স্বামীকে বিষ দিয়ে মেরেছেন আপনি।
কাগজের মতো সাদা হয়ে গেল তপন। বিন্দু বিন্দু ঘাম দাঁড়িয়ে গেল কপালে। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল আচ্ছন্নের মতো। সুলতাও উঠে দাঁড়াল একই মুখচ্ছবি নিয়ে।
বিহ্বল কণ্ঠে বললে তপন–আপনার তাহলে বিশ্বাস, আরুণিকেও মেরেছি আমি?
তা আর বলতে, প্রসন্ন কণ্ঠে বলল ইন্দ্রনাথ। পরিহাসের বাষ্পও নেই কথার সুরে–আরুণিকেও খুন করেছেন আপনি।
সুলতা হিসহিসিয়ে উঠল সপিনীর মতো–আপনি…আপনি মানুষ না জানোয়ার?
প্রত্যুত্তরে অ্যাশট্রেতে ছাই ঝাড়ল ইন্দ্রনাথ। বলল একই রকম হৃষ্টকণ্ঠে-ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে ক্যামেলিয়া গিয়েছিল আর্সেনিক দিয়ে কীভাবে মানুষ খুন করা যায়, তা জানতে। তখনি সে জেনেছিল, চামড়ার মধ্যে দিয়েও আর্সেনিকের বিষক্রিয়া হয়। মনে পড়েছিল থুনির আর গালের একজিমা ঢাকবার জন্যে রোজ ঘন্টাখানেক ধরে মেক আপ করত ক্যাসানোভা। আরও মনে পড়ল, যে ক্রিম দিয়ে মেক আপ করা হত, সেটি দান করেছিলেন আমাদের তপনবাবু। ক্রিমটিতে যে সাদা আর্সেনিক বোঝাই, তা আমি কাল রাতে REINSGH টেস্ট করে দেখেছি। থিয়েটার থেকে ক্রিমের নমুনা এনে হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড, জল, তামার তার আর বুনসেন বার্নার নিয়ে বসেছিলাম আমার এক কেমিস্ট বন্ধুর ল্যাবোরেটরিতে। ক্যামেলিয়া কিন্তু এক্সপেরিমেন্টের ধার ধারেনি। মিথ্যে চিরকুট লিখে তপনবাবুকে নিয়ে গেছে নিজের ডেরায়। তারপর গ্যাস দিয়ে মারতে চেয়েছিল ভদ্রলোককে। জয়ন্তর স্যাঙাৎ যদি টেলিফোনে তার ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে বিষবিজ্ঞান অধ্যয়নের সংবাদটি না জানাতো, তাহলে এতক্ষণে তপনবাবুর মড়া নিয়ে কাটা ছেঁড়া আরম্ভ হয়ে যেত পুলিশ মর্গে। শুনেই বুঝেছিলাম শোকে পাগল হয়ে গিয়েছে ক্যামেলিয়া। বাঘিণীসত্ত্বা জেগেছে। তাই ভয় পেয়ে দৌড়েছিলাম। ক্যামেলিয়া যাবার সময়ে তপনবাবুর রিভলভার নিয়ে পালিয়েছিল বোধ হয় নিজে মরবার জন্যে। কিন্তু তাঁকে জ্যান্ত অবস্থায় পিয়ানো বাজাতে দেখে গুলি ছুঁড়েছিল থিয়েটারের মধ্যেই।
