আরে বউদি, অসহায় কণ্ঠস্বর ইন্দ্রনাথের–সমস্যার সমাধান তো গল্প শুনতে শুনতেই করে ফেলেছি। তাই–
তাই বিভ্রান্ত জয়ন্ত ঠাকুরপোকে আরও বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছ? দর বাড়াচ্ছো, না?
কি মুশকিল! কি মুশকিল!
মুশকিল আসান তো তোমার হাতেই বন্ধু, গৃহিণীর হাতে বন্ধুবরের নাকানিচোবানির দৃশ্য দেখে ব্যঙ্গ কণ্ঠে বললাম আমি–আরুণি যদি নিহতই হয়ে থাকে তো হত্যাকারীর নামটা বলে দিলেই তো ল্যাটা চুকে যায়।
ধাঁ করে যদি বলেই দিলাম, তাহলে সাসপেন্স রইল কোথায়?
আইভরি থাকলে কিন্তু তখন তর সইত না, টিটকিরি দিল কবিতা।
আইভরি মানে মিস আইভরি লাহা। ইন্দ্রনাথ রুদ্রর সুযোগ্যা সহকারিণী।
শার্লক হোমস ক্লাব মামলায় তার আবির্ভাব ঘটেছিল বিপুল বিস্ময়, কৌতুক আর রহস্যের মধ্যে দিয়ে। এক খোঁচাতেই কাজ হল।
দু-হাত মাথার ওপর তুলে বলল ইন্দ্রনাথ–আর না, বউদি, সারেন্ডার করছি। হত্যাকারীর নাম–
ঠিক সেই সময়ে ঝন ঝন করে বাগড়া দিল টেলিফোনটা। খপাং করে রিসিভার তুলল কবিতা, ধরন দেখে মনে হল রিসিভার ছুঁড়ে মারতে পারলেই বাঁচে তারের অপর প্রান্তের মানুষটিকে।
কাকে চাই? জয়ন্ত চৌধুরীকে? আছেন।
লাফিয়ে গিয়ে রিসিভার তুলল জয়ন্ত। মিনিটখানেক পরে নামিয়ে রাখল। ঘুরে দাঁড়িয়ে বললে অদ্ভুত স্বরে–আমার টিকটিকির ফোন। ক্যামেলিয়ার পেছনে গিয়েছিল ন্যাশানাল লাইব্রেরির রিডিং রুমে। ক্যামেলিয়া সেখানে বিষবিজ্ঞানের বই নিয়ে আর্সেনিক পয়জনিংয়ের চ্যাপ্টার খুলে পড়ছে। আশ্চর্য! ক্যামেলিয়ার মতো মেয়ে মানুষ খুন করে?
মেয়েরা সব পারে, সুযোগটাকে লুফে নিয়ে কবিতার দিকে অপাঙ্গে তাকিয়ে যেন শোধ তুলল ইন্দ্রনাথ। ওরা দেবী হতে পারে, দানবীও হতে পারে।
শ্লেষটা দাগ কাটল না কবিতাকে। বিমূঢ়কণ্ঠে ও বললে–ক্যামেলিয়া? দুদিন যেতে না যেতেই নিজের হাতে বরণ করল বৈধব্য?
পা নাচাতে নাচাতে বললে ইন্দ্রনাথ–বলিহারি যাই মেয়েদের বুদ্ধিকে। বউদি, সাসপেন্স কিন্তু শেষ হল না–সবে শুরু হল।
আবার সাসপেন্স!
কী করি বলো। আমি নিরুপায়। জয়ন্ত জিপ এনেছিস?
কেন?
আর একটা খুন ঠেকাতে হবে। বলতে বলতে গম্ভীর হয়ে গেল ইন্দ্রনাথ। তপন-সুলতার টেলিফোন নাম্বার জানা আছে?
আছে।
ডায়াল কর..কে ধরেছে? বলতে বলতে সর্বাঙ্গ টানটান হয়ে উঠল ইন্দ্রনাথের।
রিসিভার নামিয়ে বলল জয়ন্ত–একটু আগে একটা চিরকুট এসেছিল তপনের নামে। চিরকুটে বলা হয়েছে অমুক ঠিকানায় যেন এক্ষুনি চলে আসে তপন।
কে বলেছে?
জয়ন্ত চৌধুরী।
জয়ন্ত চৌধুরী! মানে জাল চিঠি। তুই তো এখানে, বলতে বলতে লাফিয়ে দাঁড়িয়ে উঠল ইন্দ্রনাথ। চুল খামচে ধরে বললে–কি গাধা আমি! খামোকা সময় নষ্ট করলাম এতটা! এখুনি না বেরোলে সর্বনাশ হয়ে যাবে। ঠিকানাটা মনে আছে?
আছে।
ভানুমতীর খেল
চল।
দুড়দাড় করে দুই বন্ধু নেমে গেল সিঁড়ি দিয়ে।
.
ঠিকানায় যথাসময়ে পৌঁছোল দুজনে।
বাড়িটা ন্যাশনাল লাইব্রেরীর ধারে কাছেই। নির্জন পাড়া। বাড়িটা দোতলা। একতলায় থাকে একটা পাঞ্জাবি পরিবার।
হুড়মুড় করে দোতলায় উঠল দুই গোয়েন্দা। ফ্ল্যাটের দরজায় তালা ঝুলছে বাতাস কে বলল জয়ন্ত–হ্যারে, এ যে গ্যাসের গন্ধ!
তুই বাতাস শুঁকবি না, দরজা ভাঙবি? খেঁকিয়ে উঠল ইন্দ্রনাথ। উৎকণ্ঠায় মেজাজ তিরিক্ষে হলে যা হয় আর কি।
জয়ন্ত দরজার পাল্লার দিকে চেয়ে বললে–মজবুত দরজা রে। তার চাইতে তালাশুদ্ধ কড়া উপড়ে আনা যাক।
বলে, জিপ থেকে হাতখানেক লম্বা একটা লোহার রড নিয়ে এল সে। কড়ায় ঢুকিয়ে সামান্য চাড় দিতেই খসে পড়ল কড়া।
নিস্তব্ধ ঘরগুলো যেন নিঃশব্দে হেসে উঠল ওদের উদভ্রান্ত মুখচ্ছবি দেখে। কোনও ঘরে কেউ নেই।
অথচ তীব্র হয়েছে গ্যাসের গন্ধ। বাকি ছিল একটা ঘর। রান্নাঘর। শেকল খুলে ভেতরে ঢুকতেই পাওয়া গেল তপনকে জ্ঞানহীন, কিন্তু তখনো প্রাণহীন নয়।
.
গ্যাসের চাবি বন্ধ করে দরজা জানলা খুলে দিল ইন্দ্রনাথ। পাখা চালিয়ে দিয়ে জল ছিটে দিতেই চোখ মেলল তপন। বলল তার আহাম্মকের মতো আচরণ বৃত্তান্ত। জয়ন্ত চৌধুরীর হস্তলিপির সঙ্গে তার পরিচয় ছিল না। তবুও শমন পেয়ে ছুটে এসেছিল এই ঠিকানায়। কারণ আর কিছুই নয়। ঠিকানাটি তার পরিচিত। সঙ্গে এনেছিল রিভলভার।
ঘরের দরজা ভেজানো ছিল। ঢুকতেই পেছন থেকে ডাণ্ডা পড়ল মাথায়। তারপর আর কিছু মনে নেই।
রিভলভারটা? নেই। কোমরে নেই, ঘরের কোথাও নেই। যাওয়ার সময়ে হত্যাকারী নিয়ে গেছে হত্যার আর একটা হাতিয়ার।
ঘড়ির দিকে তাকিয়েই চমকে উঠল তপন–সর্বনাশ! আজকে যে আমাদের শো শুরু হচ্ছে। ইন্টারভ্যালের পর থেকেই যে পিয়ানোয় বসতে হবে আমাকে।
এই অবস্থায়? চটে গিয়ে বললে জয়ন্ত। প্রাণটা ফিরে পেয়েছেন স্রেফ ইন্দ্রনাথের বুদ্ধির জোরে। এখনো টলছেন আপনি। এখন বাজনা আসবে?
আসবে। গোঁয়ারের মতো দরজার দিকে টলতে টলতে এগিয়েছে তপন। আজকের প্রথম শোয়ে হাজির আমাকে থাকতেই হবে।
.
শো আরম্ভ হয়ে গিয়েছে। চাপা উত্তেজনায় থমথম করছে ফিরোজা থিয়েটার গ্রীনরুম। তপন এখনও আসেনি।
ইন্টারভ্যাল হয়ে গেল। তবুও তপন এল না। নিঃসীম শংকায় ছেলেমানুষের মতো কেঁদে ফেলল সুলতা। থিয়েটার কর্তৃপক্ষ শংকিত হলেন অন্য আশংকায়। দর্শকরা চেয়ারগুলো আস্ত রাখবে কি তপনের মিউজিক না শোনার পর? এতদিন ধরে ফলাও করে বহু বিজ্ঞাপন বেরিয়েছে তপনের নাম দিয়ে। এখন? কিন্তু তপন এল। পর্দা ওঠবার আগেই ঝড়োকাকের মতো সে এল। দুপাশে জয়ন্ত আর ইন্দ্রনাথ। ড্রেসিংরুমে গেল না। মেকআপও নিল না, এসেই বসল পিয়ানোয়। বিশাল হলঘর গমগম করে উঠল তার হাতের জাদুতে।
