কাকে? ক্যাসানোভাকে?
হ্যাঁ। শরীরটা খারাপ করছে বলে হঠাৎ কোথায় যে গেল!
শরীর খারাপ ছিল? তাহলে বাড়ি গিয়েছে।
না, না। বাড়ি যাওয়ার হলে আমাকে বলত। দুজনের একসঙ্গেই যে বাড়ি ফেরার কথা। বলতে বলতে ক্যামেলিয়া কেঁদে ফেলে আর কি। তপনদা ও কোথায় গেল?
ক্যামেলিয়ার ভীতির কারণ অনুমান করা যায়। আরুণির রহস্যজনক মৃত্যুর এখনো কিনারা হয়নি। অথচ সুলতার প্রাণ নিয়ে টানাটানি আরম্ভ হয়ে গেছে। আবার মরণের ডংকা বাজায়নি তো হত্যাকারী? এবার হয়তো ক্যাসানোভার প্রাণ
উঠে পড়ল তপন। উদ্বিগ্ন ক্যামেলিয়াকে নিয়ে তন্ন তন্ন করে খুঁজল সারা ফিরোজা থিয়েটার।, ক্যাসানোভা ফটক পেরোয়নি। অথচ থিয়েটারেও নেই। তবে গেল কোথায়? হনুমানের মতো ছাদ থেকে লক্ষ্য দিয়ে চম্পট দেয়নি তো?
শেষের সম্ভাবনাটা এসেছিল জয়ন্ত গোয়েন্দার উর্বর মগজে। থিয়েটারেই হাজির ছিল সে নতুন কোনও সূত্র আবিষ্কারের চেষ্টায়। ছাদ থেকে লক্ষ্য প্রদানের সম্ভাবনাটা মাথায় আসতেই খেয়াল হল, সব দেখা হয়েছে–শুধু ছাদটা দেখা হয়নি।
ছুট! ছুট! ছুট! জিরাফ-দৌড় দৌড়ে লম্বা লম্বা লাফ মেরে লোহার মই পেরিয়ে ছাদে পৌঁছোলো জয়ন্ত তপন আর ক্যামেলিয়া।
আরুণির ঘরের কড়িকাঠ ফুঁড়ে উঁচু স্কাইলাইট আর লিফট-এর কলকজা ঢাকা ছোট্ট শেডটার মাঝামাঝি জায়গায় মুখ থুবড়ে শুয়েছিল সুদর্শন ক্যাসানোভা। হাত কয়েক দূরে খানিকটা বমি। সারা দেহে কোনও চোট নেই। দেহে প্রাণ নেই। শুধু একটু ফিকে বিস্ময় লেগে আছে রোমান্টিক মুখে।
.
ক্যামেলিয়া ফিট হয়ে গিয়েছিল। প্রাণহীন আর জ্ঞানহীন দুটি দেহকে লোহার মই বেয়ে নীচে নামানো হল অতি কষ্টে। জয়ন্ত বিদ্যুত্বাতির নীচে দেখল, ক্যাসানোভার জিভ অস্বাভাবিক ফোলা, চোখের পাতাও লাল এবং ফুলো, হাতের চেটো কর্কশ এবং খড়িওঠা আঙুলের নখ ঘিরে সাদা পাটি। একজিমা থুনির নীচ থেকে ছড়িয়ে পড়েছে দুই গালে।
আর্সেনিক পয়জনিং। একদিনের বিষক্রিয়া নয়–দীর্ঘদিনের। সবকটা লক্ষণই তাই। বিশেষ করে চর্মরোগ। অথচ আগে একজিমা থাকায় অতটা গা দেয়নি ক্যাসানোভা। যদি দিত, চর্মরোগের অকস্মাৎ বিস্তার নিয়ে যদি ডাক্তার কনসাল্ট করত, তাহলে প্রাণটা বেঘোরে যেত না। বেচারা!
সন্দেহ এসে পড়ল ক্যামেলিয়ার ওপর। এ-ধরনের মেয়েরা সব পারে। স্ত্রী ছাড়া খাবারে বিষ মেশাবে কে? ঘেয়ো স্বামীকে বোধহয় মনে ধরেনি। তাই
সুতরাং ভানুমতীর খেল নিয়ে অর্ধোন্মদ জয়ন্ত গোয়েন্দা একজন ছোটখাটো গোয়েন্দা মোতায়েন করল ক্যামেলিয়ার পেছনে। তারপর চলে এল আমার ডেরায় ইন্দ্রনাথের শরণাপন্ন হয়ে। জরুরি অবস্থায় যোগাযোগের জন্যে আমার টেলিফোন নাম্বার দিয়ে এল ক্ষুদে গোয়েন্দাকে।
শুধু সেই জন্যেই বেঁচে গেল একটা প্রাণ!
.
এই পর্যন্ত ধৈর্য সহকারে শ্রবণ করেছিল ইন্দ্রনাথ রুদ্র। এমন শান্ত সুন্দর স্বপ্নিল চোখে তাকিয়ে সিগারেট টানছিল যে মনে হচ্ছিল যেন কালিদাস, শেক্সপীয়ার, রবীন্দ্রনাথ একযোগে ভর করেছেন তার কল্পনাকেন্দ্রে। সবশেষে উদাস গলায় অবতারণা করেছে টিকটিকি প্রসঙ্গ। টিকটিকিটা ছাদের স্কাইলাইট দিয়ে এসে, কড়িকাঠ বরাবর হাঁটছিল।
ইন্দ্রনাথ তখন বলেছিল, টিকটিকিটাকেই যদি হত্যাকারীর হাত কল্পনা করা যায়, তাহলেই তো সমাধান হয়ে যায় হত্যা রহস্যর।
তড়াক করে লাফিয়ে উঠে বিকট বিশ্রী গলায় পেঁচিয়ে জানতে চেয়েছিল জয়ন্ত গোয়েন্দা কীভাবে? কীভাবে? কীভাবে?..
চেঁচামেচিতে বোধহয় ভড়কে গিয়েই অথবা ঘরের বাতাস অপছন্দ হওয়ায় ঠিক সেই মুহূর্তেই সুড়ুৎ করে স্কাইলাইট দিয়ে উধাও হয়েছিল টিকটিকিটা। ইন্দ্রনাথ সেইদিকে আঙুল তুলে বলেছিল– ওইভাবে।
.
শুনে চেঁচাতেও ভুলে গেল জয়ন্ত গোয়েন্দা। পুলিশী হুংকার বিস্মৃত হয়ে অসহায়ের মতো চাইল কবিতার দিকে, আমার দিকে। নীরবে যেন বলতে চাইল–দ্যাখো, তোমাদের ইন্দ্রনাথের ফচকেমিটা দ্যাখো। মরছি নিজের জ্বালায়, এখন কি ইয়ার্কি করবার সময়।
কবিতার শিরদাঁড়া কিন্তু সিধে হয়ে গিয়েছিল টিকটিকির দিকে ইন্দ্রনাথ আঙুল তুলতেই। অক্ষম লেখক স্বামীর এই সক্ষম গোয়েন্দা বন্ধুটিকে সে চেনে। ও জানে, প্রগলভ ইন্দ্রনাথ যখন সহসা দুর্বোধ্য হয়ে যায়, নিজেই একটা ধাঁধা হয়ে যায়, তখনি বুঝতে হবে ওর ভেতরের ধাঁধা আর ধাঁধা নেই–সরল হয়ে গিয়েছে।
কন্দর্পকান্তি ইন্দ্রনাথ রুদ্রর ওপর তাই অবিচল আস্থা আর অপরিসীম ভক্তি আমার গৃহিণীর। বাইরে কিন্তু বিরাম নেই খুনসুটির। সম্পর্কটি ভারি মধুর, আমার বেশ লাগে ওদের কপট কলহ দেখতে।
ইন্দ্রনাথের টিকটিকি-ধাঁধা শুনেই তাই মুখিয়ে উঠল আমার সুন্দরী বধূ। ডাগর চোখ ঘুরিয়ে গোল মুখ আরও গোল করে যেন তুবড়ি ফোঁটালো শাণিত রসনায়–ঠাকুরপো, তুমি মার্চ মাসে জন্মেছো নিশ্চয়? ওই সময়ে রবি মীন চিহ্নে ছিল নিশ্চয়?
হকচকিয়ে গেল ইন্দ্রনাথ–কেন? কেন? কেন?
জিভের মোচড় দিয়ে অদ্ভুতভাবে ভেংচে বললে কবিতা–কেন? কেন? কেন? কেন? ওই সময়ে যারা জন্মায়, তারা মদ আর মাদক দ্রব্যে অত্যন্ত আসক্ত হতে পারে। তা কি মহাশয়ের জানা নেই?
কিন্তু–
কিন্তু আবার কি? তেড়ে উঠল কবিতা–কোকেন গাঁজার নেশা না থাকলে এই রকম একটা সিরিয়াস মোমেন্টে টিকটিকি নিয়ে অর্বাচীনের মতো কেউ কথা বলে?
