টেবিল নিস্তব্ধ। তারপর বলল সুলতা–তুমি কিছু বলেছো বুঝি ক্যাসানোভাকে?
স-ব, দুষ্টু হেসে বলল ক্যামেলিয়া। না বললে পেট ফুলে মরেই যেতাম। এমন ঢঙে কথাটা বলল ক্যামেলিয়া যে টেবিলের প্রত্যেকেই দুম করে ফেটে পড়ল দমকা হাসিতে হাসতে হাসতে বললে সুলতা–আরুণির মৃত্যুটা যেন মাধ্যাকর্ষণের ত্রিশঙ্কুর-পাওয়া।
কথাটার মানে?–খুক খুক করে হাসতে হাসতে শুধোলো ইন্সপেক্টর জয়ন্ত চৌধুরী। ভোজসভায় হাজির থাকতে বাধ্য হয়েছিল সে কর্তব্যের তাগিদে। সদ্য মরেছে একটা মানুষ, এর মধ্যেই বিয়ের এত ঘটা কেন বাপু?
সুলতা ঠোঁট উল্টে বললে–মানে আবার কি? মাধ্যাকর্ষণের টানে আছাড় খেলে জানি ঘাড়ের হাড় ভাঙে। কিন্তু আরুণি মাধ্যাকর্ষণকে কলা দেখিয়ে শূন্যে ঝুলল ত্রিশঙ্কুর মতো, অথচ ঘাড়ের হাড়টি ভাঙল মট করে।
তবে হাড়টা ভাঙল কী করে? কড়িকাঠের ধাক্কায়? উল্টো মাধ্যাকর্ষণ নাকি?
গম্ভীর ভাবে প্রসঙ্গ পরিবর্তন করল জয়ন্ত। এ প্রশ্নের জবাব তার জানা নেই। জানার সুযোগও পেল না। দুদিন পরেই হত্যাকারী হানা দিল সুলতার ফ্ল্যাটে।
তপন ফিরোজা থিয়েটারে গিয়েছে। সুলতা মার্কেট থেকে ফিরেছিল ফ্ল্যাটে। দরজা বন্ধ করে এক কাপ কফি বানাচ্ছে আর গুণ গুণ করে গান গাইছে। ফিরোজা থিয়েটারে কেও যেতে হবে এখুনি। এমন সময়ে দরজায় টক-টক-টক শব্দ হল।
অন্যমনস্কভাবে এক পাল্লার ফ্লাসডোর ঈষৎ ফাঁক করেছিল সুলতা। কিন্তু ফাঁকের মধ্যে দিয়ে কিছু দেখবার আগেই একটা হাত দেখা গেল। হাতে খানিকটা কালো কাপড়। চক্ষের নিমেষে সুলতার চোখে চেপে ধরল হাতটা। আর একটা হাত বেষ্টন করল কণ্ঠনালী। হাতের অধিকারী প্রবেশ করল ভেতরে এবং একইভাবে চোখ আর গলার ওপর যুগপৎ চাপ বৃদ্ধি করে চলল সর্বশক্তি দিয়ে। কোনওরকম শব্দ করতে পারল না সুলতা। বুঝল সে অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছে। ফুসফুসটা বাতাসের অভাবে যেন ফেটে যাচ্ছে। পুরোপুরি অজ্ঞান হওয়ার আগে দরজার বাইরে শুনল মেয়েলি কণ্ঠের ডাক–সুলতা আছো? তারপর আর কিছু মনে নেই সুলতার।
জ্ঞান ফিরে পাওয়ার পর দেখল, সে শুয়ে আছে লাগোয়া বাথরুমে। গলায় বেশ ব্যথা। অতিকষ্টে দরজা পেরোলো সুলতা। শোবার ঘরে কেউ নেই। খাবার ঘর শূন্য। বসবার ঘরও তাই। তেপায়ার টুলটার ওপর জেডপাথরের কনফিউসিয়াসের মুর্তি চাপা ছোট্ট একটা চিরকুট ছাড়া ঘরের মধ্যে বেমানান কিছুই চোখে পড়ল না। চিরকুটটা তুলে নিল সুলতা। গোটা গোটা হরফে মেয়েলি ছাঁদে একটি মাত্র পংক্তি:
সুলতা, নতুন নাটকের একটা কপি এনো। প্রকাশক চেয়েছে।
আখতার ফিরোজা থিয়েটারের পুরোনো নায়িকা। এখন ছোটখাটো পার্ট করে। স্বামীর বইয়ের কারবার। সুলতার সব নাটক বেরোয় ওইখান থেকেই।
জ্ঞান হারানোর ক্ষণ-পূর্ব ডাটা মনে পড়ল। আখতারের গলাই বটে। হত্যাকারী ওই ডাক শুনেই ওকে টেনে নিয়ে গেছে বাথরুমে। আখতার দরজা খোলা দেখে ভেতরে এসেছে। শোবার ঘরে, খাবার ঘরে, বসবার ঘরে কাউকে না পেয়ে চিরকুট রেখে গেছে।
আচ্ছন্নের মতো খাবার টেবিলে বসে পড়ল সুলতা। কফি কাপটা টেনে নিল ঠোঁটের কাছে।
.
ফিরোজা থিয়েটারে ফোন এল তপনের নামে। ডাকছে সুলতা।
কী ব্যাপার ডার্লিং? উচ্ছল কণ্ঠে বলল তপন। এত দেরি কেন?
ক্লান্ত কণ্ঠে বলল সুলতা–ওগো, আমাকে কফির মধ্যে বিষ খাইয়ে মারবার চেষ্টা চলছে। তুমি তাড়াতাড়ি এসো।
.
তীব্র অ্যাকোনাইট মিশানো ছিল কফির কাপে। রাসায়নিক পরীক্ষায় ধরা পড়ার অনেক আগেই স্বাদের তারতম্য থেকে সন্দেহ হয়েছিল সুলতার। কফির কাপ ঠোঁটের কাছে টেনে নিয়ে ভাবছিল–হাতে পেয়েও তার ধড়ে প্রাণটা রেখে গেল কেন হত্যাকারী? দয়া? উঁহু! নিশ্চয় অন্য পন্থায় নিকেশ করার আয়োজন করে গেছে। কফির কাপে বিষ মিশিয়ে দিয়ে যায়নি তো? গরম কফির কাপ টেবিলেই ছিল কিনা…
চুমুক দেয়নি সুলতা। আঙুলে করে এক ফোঁটা নিয়ে জিভের ডগায় রেখেছিল। চিন চিন করে উঠেছিল স্বাদ-সচেতন রসনা-কেন্দ্রগুলো। এ-স্বাদ তার প্রিয় কফির স্বাদ নয়। একটু তফাৎ আছে।
তাই বেঁচে গেল সুলতা।
কিন্তু ধনেপ্রাণে মারা পড়ার উপক্রম হল জয়ন্ত বেচারী। একি ফ্যাসাদ! একটা খুনের (!) নিষ্পত্তি হতে না হতেই আবার একটা খুনের প্রচেষ্টা! তবে কি আরুণি সত্যিই নিহত হয়েছে? সুলতা হয়ত জানে হত্যাকারীর পরিচয়–তাই তার মুখ বন্ধ করার জন্যেই বিষ নিয়ে হত্যাকারী ফের নেমেছে হত্যার আসরে? কে সেই হত্যাকারী? আখতার? কিন্তু হত্যার চেষ্টা করে কেউ চিরকুট রেখে নিজের নাম লিখে ঘোষণা করে যায়? ধুত্তোর! ঠিক এই সময়ে আরও একটা কথা মনে পড়তেই মাথা ঘুরে গেল জয়ন্তর। আখতারের ড্রেসিংরুমে নেমবুটাল ভর্তি শিশি থাকত। কারণ নিদ্রাহীনতা ছিল তার ক্রনিক ব্যাধি। আরুণির অপঘাত-মৃত্যুর কিছুদিন আগে নেমবুটাল ভর্তি শিশিটা চুরি গিয়েছিল তার ঘর থেকে। আরুণির মৃত্যু হওয়ার পর জানা গেল, তার জিনের বোতলে মেশানো ছিল নেমবুট।
আসলে হয়তো আদৌ চুরি যায়নি শিশিটা সন্দেহের আওতা থেকে রেহাই পাবার জন্যেই সাফাই গেয়েছে আখতার!
কিন্তু আখতার খুন করবে কেন? প্রৌঢ়ার ওপরেও কি নজর দিয়েছিল লম্পট আরুণি?
.
আরও দুদিন পর সাংঘাতিক একটা কাণ্ড ঘটল ফিরোজা থিয়েটারে। জোর কদমে রিহার্সাল চলছে। তপন দোতলায় নিজের ঘরে স্বরলিপি ওলটাচ্ছে। এমন সময়ে পাংশুমুখে উঁকি দিল ক্যামেলিয়া–ওকে দেখেছেন?
