সেই ক্যামেলিয়াকে সহসা স্টেজের পেছনে দড়ির গাদায় ফেলে আরুণি..ক্যামেলিয়ার কোমল তনু ননী দিয়ে গড়া নয়। আরুণির কবল থেকে ছিটকে বেরিয়ে আসতে দেরি লাগেনি। ক্ষতির মধ্যে ব্লাউজটা একটু ছিঁড়ে গিয়েছিল। আর এগোতে পারেনি আরুণি।
সমস্ত ব্যাপারটা ঘটল অতি নিঃশব্দে। ঠিক সেই সময়ে সুলতা এসে পড়ে সেখানে। আঁচল দিয়ে বুক ঢেকে হাঁপাতে হাঁপাতে ক্যামেলিয়া তখন বেরিয়ে আসছে অন্ধকারের মধ্যে থেকে। পেছনে টলমলায়মান আরুণি–দুই হাত তখনো সামনে প্রসারিত–মুখে মদের গন্ধ। সুলতাকে দেখেই যেন জোঁকের মুখে নুন পড়েছিল। সুট করে উধাও হয়েছিল আরুণি।
উনিশ বছরের সদ্যফোঁটা ক্যামেলিয়া তখন কেঁদে ফেলেছিল সুলতার কাঁধে মাথা রেখে। সুলত চেয়েছিল ব্যাপারটা থিয়েটার কর্তৃপক্ষের কানে তোলা হোক। পাঁচ কান হোক এবং আরুণিকে বিদেয় করা হোক। সে থাকতে এ-থিয়েটারে নারীর ইজ্জৎ অক্ষুণ্ণ রাখা অসম্ভব।
ক্যামেলিয়া কিন্তু রাজি হয়নি। বলেছে–না সুলতাদি, কেলেঙ্কারি বাড়িয়ে লাভ নেই। কেলেঙ্কারিতে মেয়েরা পুড়ে মরে, পুরুষদের গায়ে আঁচ লাগে না। কথাটা সত্যি।
জয়ন্ত প্রশ্ন তুলেছিল–বেশ তো, ধরা যাক, আরুণি সুইসাইড করেনি, মার্ডাড হয়েছে। কিন্তু কেন? বিনা লাভে কেউ মানুষ খুন করে না। আরুণিকে খুন করে কার কী স্বার্থসিদ্ধি হচ্ছে, তা দেখা যাক।
কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে সাপ বেরোলো তখনি।
আরুণির ব্যাঙ্ক ব্যালান্স নেহাত কম ছিল না। অকৃতদার নায়কের তহবিল কখনো শূন্য থাকে না। মা কমলা যেন কাঁপ ভরে টাকা দিয়েছিলেন তাকে। আরুণির মৃত্যুতে এ-টাকা পাচ্ছে তার একমাত্র ভাই অরণ্যকুমার।
অরণ্যকুমার থাকে দার্জিলিংয়ে। বহুবার বিদেশ সফর করেছে সে। সারা পৃথিবী নাম জানে তার। সেতারের জাদুকর অরণ্যকুমার যে-ছবিতে মিউজিকের ভার নেয়, তা সুপারহিট করে।
আরুণির মতো সে মদ বা মেয়েমানুষের ভক্ত নয়। কিন্তু তবুও তার ভঁড়ার শূন্য। অর্থ সঞ্চয় করা তার কোষ্ঠিতে লেখেনি। কারণ আর কিছুই নয়–মানুষটা অসম্ভব খামখেয়ালী। নিত্য নতুন উদ্ভট খেয়ালের পেছনে টাকা উড়িয়ে সে ফতুর। তার ওপর অতিরিক্ত মাত্রায় দুমুখ। ফলে মিউজিক ডিরেকশনের অফার নিয়ে কেউ চৌকাঠ মাড়াচ্ছে না ইদানীং। দায়িত্বজ্ঞানহীনও বটে। দু-দুটো ছবির মিউজিক অর্ধেক শেষ করে সে-নাকি গা ঢাকা দিয়েছিল হিমালয়ের অন্য অঞ্চলে। আরুণি ইহলোক ত্যাগ করেছে, এ-খবর তাকে জানানো হয়েছিল টেলিগ্রাম মারফৎ। জবাব এল ফিরতি টেলিগ্রাম। অদ্ভুত সেই টেলিগ্রামের বাংলা মানে এই,
উল্লসিত হলাম। অনেক মাসের প্রতীক্ষা সফল হল। সত্যিই কি আত্মহত্যা? খবরদার আমাকে যেন বিরক্ত করা না হয়।
অরণ্যকুমার
জয়ন্ত যথাসময়ে জেরা করেছিল তাকে। জিগ্যেস করেছিল সৃষ্টিছাড়া এই টেলিগ্রামের প্রকৃত অর্থ কী? কেন সে ভায়ের মৃত্যুতে এত উল্লসিত? অরণ্যকুমার জানিয়েছিল, শুধু সেতার দিয়ে একটা অভিনয় প্রোগ্রাম মঞ্চস্থ করতে চেয়েছিল সে। টাকা চেয়েছিল আরুণির কাছে, পায়নি। জয়ন্ত তখন বলেছিল, এর পরিণাম কিন্তু খুব খারাপ। পুলিশ তাকেই সন্দেহ করছে ভাই-ঘাতক হিসেবে। শুনে বিষম কৌতুক অনুভব করেছিল অরণ্যকুমার। শুধু জিগ্যেস করেছিল–আরুণির টাকাগুলো কবে নাগাদ পাওয়া যাবে?
রাগে ফুলতে ফুলতে ফিরোজা থিয়েটারে ফিরে এসেছিল জয়ন্ত। তখনি জানতে পেরেছিল, ক্যামেলিয়ার ওপর বলাৎকারের গোপন সংবাদ।
খটকা লেগেছিল জয়ন্তর মনে। তবে কি প্রিয়তমার ওপর বলাৎকারের প্রতিশোধ নিয়েছে ক্যাসানোভা? কিন্তু কী করে?
এর দুদিন পরেই সুলতার পীড়াপিড়িতে আর্যমতে ক্যাসানোভার সঙ্গে বিয়ে হয়ে গেল ক্যামেলিয়ার।
বিয়ের চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে খুন হতে হতে বেঁচে গেল সুলতা।
.
ক্যামেলিয়া বলেছিল–সুলতাদি, বিয়ের ইচ্ছে তো দুজনেরই। কিন্তু দুজনেই পিছিয়ে যাচ্ছি দুটো কারণে।
যথা? জিগ্যেস করেছিল সুলতা।
ক্যামেলিয়া যদি ফর্সা হত, তাহলে কথাটা বলতে গিয়ে আরক্ত হত। কালো বলে হল বেগুনি। আঁচলের খুঁট আঙুলে জড়াতে জড়াতে বলল–কি-ই বা বয়স আমার। এই সময়ে বাচ্চাকাচ্ছা হওয়া মানেই কেরিয়ার নষ্ট হওয়া। হেসে ফেলল সুলতা–এই ব্যাপার! একেবারেই ছেলেমানুষ তুমি। ওটা কোনও ওজোর নয়। বাচ্ছা না চাইলে হবে কেন?
কিন্তু–
আবার কিন্তু কি?
ক্যাসানোভার শরীর মোটেই ভালো যাচ্ছে না।
একজিমা বেড়েছে বলে?
না না। দিনকে দিন দুর্বল হয়ে পড়ছে, চোখে অন্ধকার দেখছে একটু পরিশ্রম করলেই, পেটের অসুখ তো লেগেই রয়েছে।
ও সব হল ব্যাচেলারের রোগ। বিয়ের জল পড়লেই সেরে যায়, বলে সস্নেহে ক্যামেলিয়ার চিবুক ধরে নেড়ে দিয়েছিল সুলতা।
বিয়ের পর পার্কস্ট্রিটের অভিজাত রেস্তোরাঁয় ম্যারেজ-ডিনার দিল ক্যাসানোভা। খানাপিনার টেবিলে বসে এই কথারই জের টেনে নিয়ে বললে সুলতা–ক্যামেলিয়া বিয়ে করে এক ঢিলে দু-পাখি মারল।
পাখি দুটোর নাম? শুধোলো তপন।
ক্যাসানোভার কাহিল শরীর এবার ক্যামেলিয়া-টনিকে চাঙ্গা হয়ে উঠবে।
আর?
বর্বর দুপেয়ে নারী শিকারিদের লোলুপ নজর ক্যামেলিয়ার ওপর আর পড়বে না।
চামচ নামিয়ে রেখে মৃদুকণ্ঠে বললে ক্যাসানোভা–আপনি আরুণির কথা বলছেন তো? সে তো আগেই মরেছে।
