অথচ রাত দশটায় প্রাণবায়ু বিলীন হল আরুণির। ক্যাসানোভা বিদায় নিয়েছে সাড়ে নটায়। সুতরাং সে নিরপরাধি। তপন লিফটে থেকে নামেনি। ইস্পাহানির সামনে আসেনি–সুতরাং সে-ও নিরপরাধ।
আরুণির অপঘাত মৃত্যুর হেতু তাহলে একটাই–সুইসাইড।
জয়ন্ত এই পর্যন্ত এসে তদন্তে যবনিকা টানতে চেয়েছিল।
কিন্তু প্রশ্ন উঠল কশেরুকার ভাঙা হাড়টা নিয়ে। ডাক্তার বললেন–নিশ্চয় কেউ নীচ থেকে দু-পা ধরে হ্যাঁচকা টান দিয়েছিল। ফলে কশেরুকার হাড় ভেঙেছে। অথচ মৃত্যুকালীন কষ্ট লাঘবের জন্যে গলা ঘিরে তুলোর প্যাড রেখেছিল আরুণি–তারপর ছিল দড়ি। মৃত্যুপথযাত্রীর পক্ষে এটুকু আরামের আয়োজন হাস্যকর সন্দেহ নেই, কিন্তু বিরল ঘটনাও নয়।
কেসটা তাহলে আত্মহত্যার।
কিন্তু পা ধরে টেনে কশেরুকার হাড় ভাঙল কে?
জানা গেল আরো একটা তথ্য। আরুণির ট্রাউজার্সের তলার দিকে গোড়ালির ঠিক ওপরে ভাঁজ নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিয়ে সেখানে দেখা গেল পাটের ফেঁসো। অর্থাৎ দুটো পা শক্ত করে বেঁধে ছিল কেউ। হয়তো হ্যাঁচকা টান দিয়ে কশেরুকার হাড় ভেঙে চম্পট দেওয়ার সময় খুলে নিয়ে গিয়েছে পায়ের দড়ি।
অদ্ভুত! অদ্ভুত! ঘাটে এসেও তরী ডুববে নাকি? আত্মহত্যার ফতোয়া দিয়ে ইনভেসটিগেশন শিকেয় তুলতে চেয়েছিল জয়ন্ত, কিন্তু…!
জেরার মুখে অবশ্য প্রকাশ পেয়েছিল কতগুলো চাঞ্চল্যকর সংবাদ।
আরুণি মদ ভালোবাসত। আর ভালোবাসত সুন্দরী মেয়ে। চরিত্রে সে ক্যাসানোভা। মদের চাট হিসেবে রূপসী নাহলে তার দিবস রজনী অন্ধকার। এহেন আরুণি প্রথমে ঝুঁকেছিল সুলতার দিকে। কিন্তু সুলতা ঝুঁকেছিল তপনের দিকে। তপনও চেয়েছিল সুলতাকে সুতরাং যথাসময়ে বিয়ে হয়ে গেল ওদের। বিয়ের পরেই একদিন স্টেজের মহড়ায় নাটকের পাট সংলাপের পরিবর্তে নিজস্ব সংলাপ ব্যবহার করল আরুণি। কদর্য ভাষার সংলাপ নিক্ষিপ্ত হল তপনের উদ্দেশ্যে।
কেলেঙ্কারি বেশিদূর এগোবার আগেই সুলতা স্বামীকে নিয়ে বেরিয়ে এল স্টেজ থেকে। পরের দিন সুলতার ফ্ল্যাটে গিয়ে তপনের কাছে ক্ষমা চেয়ে এল আরুণি। অকপটে বললে, ঈর্ষায় অন্ধ হয়ে ব্যর্থতার জ্বালায় আর মদের নেশায় মাথা ঠিক রাখতে পারেনি সে।
তপন ভুলে গেল বিষয়টা। ভুলল না কেবল সুলতা। বললে–ওগো, আমরা মেয়েরা পুরুষদের হাড় পর্যন্ত দেখে ফেলি। আরুণি মোটেই অনুতপ্ত হয়নি। তুমি কিন্তু সাবধানে থেকো বাপু!
তপন ঘাবড়ে গিয়ে বলেছে–কী করে থাকব বলো?
রিভলভারটা কোথায়?
স্টিল আলমারিতে। কেন?
কোমরে গুঁজে রেখো।
ধ্যাৎ! বিচ্ছিরি রকমের উঁচু হয়ে থাকে। নাটক লিখে লিখে তোমার কল্পনাশক্তি বিপজ্জনকভাবে বেড়ে গেছে দেখছি।
মাসখানেক পরেই কিন্তু ঘটল ছোট্ট একটা ব্যাপার।
যে সময়ে নিজের ঘরে ঢোকার কথা নয়, সেই সময়ে হঠাৎ ঘরে এসে পড়েছিল তপন। ঢুকেই দেখল, কী আশ্চর্য। ওর ক্রিমের জার থেকে চুরি করছে আরুণি। আঙুলে তুলে তুলে রাখছে নিজের জারে।
অভাবনীয় দৃশ্য। প্রথমে থতমত খেয়েছিল আরুণি।
পরক্ষণেই বলেছে সপ্রতিভভাবে–কিছুতেই মেক আপ উঠছে না আমার ক্রিমে। তাই তোমার ক্রিম নিয়ে একটু ট্রাই করছিলাম, বলে, তপনের মন্তব্য শোনার আগেই ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল আরুণি।
ফ্ল্যাটে ফিরে সুলতাকে ক্রিম বৃত্তান্ত জানাল তপন। বলল–আরুণির মাথায় ছিট আছে।
তাই কি? ভুরু কুঁচকে ভারি মিষ্টি করে বললে সুলতা। অতই যদি ওর ক্রিমের ওপর লোভ তো জারটা ওকে দিয়ে দিও। আমি তোমার জন্যে ক্রিমের শিশি কিনে এনেছি। এই দ্যাখো।
নতুন ক্রিমটা বাস্তবিকই উঁচুদরের। সুতরাং বিনা দ্বিধায় সেইদিন থেকেই বাতিল হয়ে গেল পুরোনো ক্রিমের শিশি। দিন কয়েক পরে হঠাৎ ক্যাসনোভা বললে–ধুত্তোর, আমার ক্রিমটা গেল ফুরিয়ে, তপনদা, একটু ক্রিম ধার দেবেন?
তপন উদার গলায় বললে–ধার কেন, একেবারেই দান করছি। এই নাও! তোমার সুলতাদি আমাকে একটু নতুন শিশি এনে দিয়েছে বলে, পুরোনো ক্রিমের জারটা চালান করে দিল ক্যাসানোভাকে।
ক্রিম পেয়ে ক্যাসানোভা তো মহা খুশি। দামি দামি ক্রিম ছাড়া আজেবাজে ক্রিম ব্যবহারের বিরোধী সে। কারণ, তার একজিমা। থুতনির ঠিক তলায় বেশ খানিকটা জায়গা জুড়ে বিশেষ এই চর্মরোগটিতে অনামী ক্রিম লাগাতে চায় না বলেই এত খুঁতখুঁতে সে!
ক্রিমের ব্যাপার মিটল এখানেই। ইতিমধ্যে আবার একটা কেলেঙ্কারি ঘটল স্টেজের পেছনে–পর্দার অন্তরালে।
মেয়েঘটিত কেলেঙ্কারি। মূলে সেই একজনই–লম্পট আরুণি!
ক্যাসানোভা রোমান্টিক অভিনয়ে বিখ্যাত। চেহারাটিও তার লেডি কিলার টাইপের। রীতিমতো রোমিও রোমিও একহারা ছিপছিপে চেহারা। মাথাভরা ঢেউ খেলানো চুল। নাক-মুখ চোখা চোখা, বুদ্ধিদীপ্ত। রং সাহেবদের মতো টকটকে লাল। ক্যাসানোভা চরিত্রকে সে জীবন্ত করেছিল শুধু চেহারার রোমান্স দিয়ে।
চেহারা যার রোমান্টিক তার অন্তরেও রোমান্স থাকা স্বাভাবিক। রোমান্স-সরোবরে হিল্লোল জাগিয়েছিল থিয়েটারেরই একটি মেয়ে। ক্যামেলিয়া। ক্যামেলিয়া যিশুর উপাসক। কিন্তু আচারে আচরণে তা বোঝা মুশকিল। ক্যামেলিয়া ফর্সা নয়–কালো। কিন্তু কালোবরণ মেয়ে যে চোখ জুড়োতে পারে, ক্যামেলিয়া তার প্রমাণ। তার পদ্মদীঘির মতো টলটল চোখ, ঢলঢলে মুখশ্রী আর কলকলে কণ্ঠস্বর শুনে প্রেক্ষাগৃহ মুহুর্মুহু করতালিতে ফেটে পড়ে, পুরুষরা মোহিত হয়, নারীরা ঈর্ষান্বিত।
