রাত দশটায় স্টাফরুম থেকে নিজের মানিব্যাগ উদ্ধার করে লিফটে উঠল তপন। কিন্তু নির্জন নিশ্চুপ থিয়েটার ভবনে একা-একা লিট চালানোর ছেলেমানুষি হঠাৎ পেয়ে বসল ওকে। দোতলা থেকে নীচে না নেমে সটান উঠে গেল তিনতলায়। কোলাপসিবল গেট-এ ফাঁক দিয়ে দেখল ইস্পাহানির দরজা খোলা। আলো জ্বলছে। তামাকের গন্ধও পাওয়া যাচ্ছে। যথারীতি তাম্রকুটের নেশায় আবিল হয়েছে বৃদ্ধ।
আরো দেখল, আরুণির ঘরের দরজাও দুহাট করে খোলা। সে ঘরেও জ্বলছে আলো।
লিফট চালিয়ে একতলায় নামল তপন।
রাস্তায় বেরিয়ে কিছুদূর যেতে না যেতেই একটা গাড়ি উল্কাবেগে এসে ব্রেক কষল ফটকের সামনে। দরজা খুলে হন্তদন্ত হয়ে নামলেন ডক্টর লুঙ্খা। ফিরোজা থিয়েটারের স্টাফ ডক্টর।
একটু বিস্মিত হল তপন। এত রাতে জনহীন থিয়েটারে কার চিকিৎসার দরকার পড়ল? পরক্ষণেই চিন্তা মুছে গেল মন থেকে ঘুমের দৌরাত্ম্যে।
ঘুম একেবারেই ছুটে যেত চোখ থেকে যদি আরুণির ঘরে উঁকি দিত তপন। দেখত, কড়িকাঠ থেকে গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলছে একটা সদ্য-ঝুলন্ত দেহ।
আরুণির দেহ!
পরের দিন সকালে হইচই পড়ে গেল ফিরোজা থিয়েটারে। ডক্টর লুথরা বললেন টেলিফোনে তলব করেছে আরুণি স্বয়ং। টেলিফোন অবশ্য তিনি নিজে ধরেননি। ধরেছিল ওঁর দাসী মন্থরা। মন্থরাকে জেরা করল জয়ন্ত চৌধুরী। আমতা-আমতা করে মন্থরা বললে–এজ্ঞে, তিনিই আরুণিবাবু কিনা জানব কেনে? বললেন তো আরুণিবাবু বলছি, ডাক্তারবাবুকে এক্ষুনি থিয়েটারে পাঠিয়ে দাও। ভীষণ বিপদ।
জয়ন্ত মুখ ভেংচে চমকে উঠেছিল–কেমনে আবার জানবে? আরুণিবাবু? কখনো ফোন করেননি ডাক্তারবাবুকে? করেছিলেন তবুও গলা চিনতে পারলে না?
ভয়ে কাঁটা হয়ে বললে মন্থরা–এজ্ঞে, তার গলা তো ভারি। মনে তো হয় উনি নন।
অর্থাৎ কেসটা ঘোরালো হল। অন্য কেউ যদি ফোন করে থাকে, তাহলে সে কে? সেই কি নাটের গুরু হত্যাকারী না, আত্মহত্যার চাক্ষুষ সাক্ষী?
উভয়ক্ষেত্রেই তপন ফেঁসে যাচ্ছে। পুলিশের ছোটকর্তার তীব্র ধারণা মেনি মুখো ওই গাইয়ে বাজিয়ে লোকটা হয় হত্যাকারী, নয় হত্যাকারীর শাগরেদ। আরে বাবা, তুমি যদি অতই সাচ্চা পার্টি হবে তো খামোকা লিফট চালিয়ে তিনতলায় উঠতে গিয়েছিলে কেন? তোমার ঘর তো দোতলায়? তাছাড়া, কোনওদিন তোমার মানিব্যাগ নিতে ভুল হয় না, ভুল হল সেইদিনই যেদিন চিত্রগুপ্ত তাঁর জাবদাখাতায় তেঁড়া মারলেন আরুণির নামের পাশে?
কিন্তু এর পাল্টা যুক্তিও আছে। তপনকে কেউ দেখেনি ফিরোজা থিয়েটারে রাত দশটায়। তা সত্ত্বেও সে কবুল করেছে। না করলেও পারত। সে যদি নাটের গুরুই হবে তো যে–খবর কেউ জানে না, সে-খবর পুলিশকে বলে খাল কেটে কুমির ডাকবে কেন?
তাছাড়া, ডক্টর লুথা বলছেন, আরুণির হৃদপিণ্ড পরীক্ষা করে তিনি তাজ্জব হয়ে গিয়েছিলেন। ধুকধুক করে তখনও হার্ট কাজ করে চলেছিল–নিঃশ্বাস যদিও পড়ছিল না। এরকম অবস্থা নাকি গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলে পড়ার মিনিট দু-তিন পর পর্যন্ত থাকে। উনি কোরামিন ছুঁড়েও অবশ্য হার্ট আর চালু করতে পারেননি। তাছাড়া, ঘাড়ের কাছে মেরুদণ্ডর হাড় ভেঙে গিয়ে যার মৃত্যু ঘটেছে, তার হার্টে কোরামিন দিয়েও কোনও লাভ ছিল না। তবে একটা জিনিস স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।
ডাক্তার যখন ফোন পান, তখনো জীবিত ছিল আরুণি। সে কড়িকাঠে ঝুলেছিল, ডাক্তার তার কাছে পৌঁছোনোর মিনিট দু-তিন আগে।
কিন্তু সে সময়ে তপন ছাড়া আর কেউ তো আসেনি থিয়েটারে?
সুতরাং হয় তপন হত্যাকারী, না হয় আরুণি নিজেই আত্মঘাতী হয়েছে। ঠিক তার আগেই গলা পালটে ফোন করেছে ডাক্তারকে অভিনেতার পক্ষে যা অসম্ভব নয় মোটেই।
আরও তথ্য প্রকাশ পেল।
মদ্যপান করেছিল আরুণি। জিনের বোতল আর গেলাস ছিল ঘরের মধ্যেই। জিনের মধ্যে মেশানো ছিল পেমবুটাল। ঘুমের ওষুধ। এত বেশি মাত্রায় ছিল যে মরবার আগে বেহুঁশ হয়ে গিয়েছিল আরুণি।
বেহুশ হয়ে গিয়েছিল। হুঁশ ছিল না। তবে ফোন করেছিল কে? নিশ্চয় সে নয়। তাহলে?
হত্যাকারী।
কিন্তু হত্যাকারী ঘরে ঢুকল কী করে? ডাক্তার পৌঁছোনোর দু-তিন মিনিট আগে দড়ি থেকে ঝোলানো হয়েছে বেহুঁশ দেহটাকে। সে সময় দরজার দিকেই তাকিয়েছিল ইস্পাহানি। আরুণি বাবুর ঘরে কাউকে সে ঢুকতে দেখেনি। বেরোতেও দেখেনি। মোটে দু-তিন মিনিটের তো মামলা।
অথচ ডাক্তার এসে দেখল তখনো হার্ট চলছে আরুণির।
ইস্পাহানি আরও বলল। নটা নাগাদ ক্যাসানোভা এসেছিল আরুণির ঘরে। আরুণি তখন সবে পাবলিক বার থেকে সুরার নেশা নিয়ে ফিরেছে। রোজ রাতের মতোই আর এক প্রস্থ মাল টানা শুরু করেছে স্টাফরুমে। এমনি সময়ে এল ক্যাসানোভা।
ক্যাসানোভা! ঐতিহাসিক নাম! চরিত্রহীনতায়, লাম্পট্যে, নারী বিলাসে অপ্রতিদ্বন্দ্বী নায়ক ক্যাসানোভা। এ নাম তার পিতৃদত্ত নাম নয়। ধর্মেও সে খ্রিস্টান নয়। কিন্তু তবুও তার নাম ক্যাসানোভা হয়ে গিয়েছে ক্যাসানোভা নাটকে নায়কের সফল অভিনয়ের পর। একাদিক্রমে পাঁচশো রজনী অভিনয়ের পর স্তাবকদের দৌলতে আসল নামটি বিস্মৃত হল মুগ্ধ দর্শকরা…লোকে মুখে চালু হয়ে গেল ক্যাসনোভা নামটা।
সেই ক্যাসানোভা এসেছিল আরুণির ঘরে। বিদায় নিয়েছিল আধঘণ্টা পর। তারপর ইস্পাহানি আর কাউকে দেখেনি সে ঘরে ঢুকতে।
