তা আর বলতে, দাঁত বার করে হাসল গজানন। এতক্ষণে বেশ ফ্রি মনে হচ্ছে নিজেকে। কতদিন যে খুনজখম, দাঙ্গাহাঙ্গামা হয়নি।–লাশটা পেলেন কোথায়?
দুর্গাপুরের জঙ্গলে।
.
নক্ষত্ৰবেগে হাইওয়ে ধরে ছুটে চলেছে গজাননের গাড়ি। লেটেস্ট মডেলের মারুতি। মেরুন কালার। ড্রাইভ করছে নিজেই। হাতে কাজ নিয়ে বেপারীটোলা লেনের অফিস ঘরে বসে থাকবার পাত্র সে নয়। পুঁতিবালাকে রেখে এসেছে অফিস ম্যানেজ করতে। ছুটকো পার্টি এলে ভাগিয়ে দেবেখন। গা-গতরের ব্যাপার থাকলে নিজেই ভিড়ে যাবে। ভাবতে ভাবতেই মুচকি হাসল গজানন। পুঁতিবালার এই দেহসর্বস্ব তদন্তধারা খুবই বাজে ব্যাপার সন্দেহ নেই, কিন্তু ওই তো বয়স..বয়সের ধর্ম তো থাকবেই, তাছাড়া কাজও হয় বটে…
আচমকা ব্রেক কষল গজানন। সরু রাস্তার ওপর দমাস করে একটা শালগাছ ফেলা হল। এই হল, এইমাত্র। আর একটু আগে ফেললে নির্ঘাত উলটে যেত মারুতি।
হালকা গাড়ি নিমেষে এক পাক ঘুরে গিয়ে দাঁড়িয়ে গেল বটে, কিন্তু বগলের তলা থেকে রিভলভারটা টেনে বের করার আগেই ঝনঝন করে জানলার কাঁচ ভেঙে ঠিকরে এল ভেতর দিকে, সেই সঙ্গে ভীমের গদার মতো একটা শাল কাঠের খুঁটি।
খুঁটির টিপ ঠিক করাই ছিল। রগে ধাঁই করে মারতেই যে-কোনও ভদ্র সন্তানের মতো চোখে সরষের ফুল দেখল গজানন।
সিটে এলিয়ে পড়া দেহটার ঠ্যাং চেপে ধরে এক হ্যাঁচকায় রাস্তার ওপর টেনে নামাল যে দৈত্যটা, আকারে আয়তনে সে দানবসমান হলেও মানুষ। ঘাড় পর্যন্ত লুটোচ্ছে বাবরি চুল। কপালের ওপর দিয়ে একটা বড় চিত্রবিচিত্র রুমাল মাথার পেছন দিকে গিঁট দিয়ে বাঁধা। পরনে ঢিলে পায়জামা আর পাঞ্জাবি–দুটোই রঙিন ছিটের! মুখখানা রোদেপোড়া। গোঁফ আর দাড়ি প্রায় জঙ্গলের মতো বললেই চলেকুচকুচে কালো।
যে শালকাঠের খুঁটি দিয়ে গজাননের জ্ঞানলোপ করা হয়েছে, সেটা এক হাতেই ছিল। চটি পরা পা দিয়ে জিরো জিরোর মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা দেহটাকে ঠোক্কর মেরে চিৎ করে শোয়াল মানুষ-দানব। তারপর হাতের খুঁটি দু-হাতে বাগিয়ে ধরে আর একটা মোক্ষম ঘা মারল গজাননের মাথায়।
জিরো জিরোর মাথা বলেই রক্ষে, সাধারণ মানুষের মাথা ওই চোটেই দু-ফাঁক হয়ে যেত। কিন্তু শৈশব থেকেই গজাননের মাথার খুলির হাড় খুব মোটা–বোধহয় মোটা বুদ্ধির সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই স্রষ্টা মাথার ডিজাইনটা করেছিলেন।
খটাং করে করোটিতে চোট পড়তেই গজাননের ব্রেনের ভেতরে রাশি-রাশি নিউরোণের মধ্যে নিমেষে অজস্র সঙ্কেত বিনিময় ঘটে গেল। মগজের রহস্য বিশ্বের শ্রেষ্ঠ মগজ বিশারদরাও আজও জানতে পারেননি–গজাননের মতো সৃষ্টিছাড়া মগজের খবর কে রাখে?
চক্ষের পলকে চনমন করে উঠল গজাননের সমস্ত সত্তা। ঠিক যেন প্রলয় ঘটে গেল কোষে কোষে, সেন্টারে-সেন্টারে। মুহূর্তের মধ্যে সটান উঠে বসল গজানন। এ আর এক গজানন। বেলেঘাট্টাই গজানন। চোখ জ্বলছে। দাঁত কিড়মিড় করছে।
মাথার খুলি দুফাঁক হওয়া দূরে থাক, এ যে উঠে বসেছে! তাকাচ্ছে অমানুষিক চোখে। দানোয় পেল নাকি? মারাদাঙ্গা দানবটা ক্ষণেকের জন্যে ঘাবড়ে গেছিল।
ওইটুকু সময়েরই দরকার ছিল গজাননের। পুরো শরীরটা বসা অবস্থাতেই শূন্যে ছিটকে গেল বিশাল আততায়ীর দিকে। (এই পাঁচটা জনৈক ব্ল্যাকবেল্ট ক্যারাটে মাস্টারের কাছে শিখেছে গজানন) এবং ছফুট শূন্যে উঠেই জোড়া পায়ের সজোর লাথি কষিয়ে দিল খুঁটিধারীর চোয়াল লক্ষ্য করে।
চোয়াল ভেঙে গেল আততায়ীর। কয়েকটা দাঁত ছিটকে পড়ল এদিকে-সেদিকে এবং সেইসঙ্গে নিজেও উলটে পড়ল পেছন দিকে।
গজানন শূন্য থেকে অবতীর্ণ হল তার বিশাল বপুর ওপর এবং পলকের মধ্যে দমাদম ক্যারাটে মার মেরে গেল চোখ, নাক টুটি লক্ষ্য করে। ফলে লোকটা চোখে অন্ধকার দেখল, ভাঙা নাক দিয়ে রক্ত গড়াচ্ছে টের পেল এবং কণ্ঠনালীর বারোটা বাজায় বিষম শব্দে কাশতে লাগল।
কিন্তু নাম তার খান বুদোশ। জিপসীদের পাণ্ডা খান বুদোশ। পূর্বপুরুষদের ইরানি রক্ত বইছে ধমনী-শিরায়। দু-হাজার জিপসী তার কথায় ওঠে-বসে। পয়সার বিনিময়ে হেন কাজ নেই যা তার পক্ষে সম্ভব নয়।
খান বুদোশের মুখে লাথি? গায়ে হাত? চোখে এমনিতেই অন্ধকার দেখছিল খান বুদোশ, এবার যন্ত্রণায় বুদ্ধির আলোও গেল নিভে। বিকট জিপসী হুঙ্কার ছেড়ে পাঞ্জাবির তলা থেকে টেনে বের করল রিভলভার এবং ট্রিগার টিপে গেল আন্দাজে জিরো জিরোকে তাগ করে।
নিস্তব্ধ বনভূমি শিউরে ওঠে হুঙ্কার এবং গুলিবর্ষণের শব্দে। বনের মধ্যে থেকে শোনা গেল আরও কয়েকজনের চিৎকার। হইহই করে ছুটে আসছে। চেঁচাচ্ছে অনেকগুলো কুকুর।
আসছে খান বুদোশের সাঙ্গপাঙ্গরা। ইরান যাদের নাগরিক অধিকার দেয়নি–তারা। ইরানে ফিরতে না পেরে বনের নেকড়ের মতো রয়েছে যারা তারা।
তারা এসে পড়লে গজাননের মুন্ডু নিয়ে গেণ্ডুয়া খেলা হত নিঃসন্দেহে, হাত-পা-ধড় চিবিয়ে খেত উপোসী কুকুরগুলো।
কিন্তু তার আগেই ঘটে গেল একটা আশ্চর্য ব্যাপার।
খান বুদোশ রিভলভার ধরতেই বিদ্যুৎগতিতে গজানন সরে গেছিল নিরাপদ দূরত্বে। দমাদম শব্দে গুলিগুলো এদিক-ওদিক ধেয়ে যাচ্ছে দেখে নিঃশব্দে শিস দেওয়ার ভঙ্গি করেছিল আপনমনে। মাথার মধ্যে সেই চিড়বিড়ে ভাবটাও অনেক কমে এসেছে।
এমন সময়ে জঙ্গলের গহনে শোনা গেল আগুয়ান কোলাহল।
