ইন্দ্রনাথ তখন গম্ভীর হয়ে গিয়েছিল। ঠোঁটের কোণে ঝুলছিল আধপোড়া কচি। ধোঁয়ার সুতো কাঁপতে কাঁপতে স্পর্শ করছিল কড়িকাঠ। ওর কবি কবি মুখটিও উথিত সেইদিকে–স্বপ্ন-ছাওয়া চাহনি নিবদ্ধ কড়িকাঠের টিকটিকিটার ওপর। বলল উদাস গলায়–জয়ন্ত, টিকটিকিটা দেখেছিস?
টিকটিকি! জয়ন্ত খাবি খেল যেন।
স্কাইলাইট থেকে বেরিয়ে কড়িকাঠ বরাবর হাঁটছে টিকটিকিটা। আমি যদি ওকে মনে করি হত্যাকারীর হাত, তাহলেই তো হত্যার সমাধান হয়ে যায়।
টিকটিকি! হত্যাকারীর হাত। ইন্দ্রনাথ আমার মাথার অবস্থা ভালো নয়। বেশি ইয়ার্কি মারলে তোকেই খুন করে বসতে পারি।
চোখ নামিয়ে প্রশান্ত হাসল ইন্দ্রনাথ। টানাটানা চোখে কৌতুক উপচে পড়ল। বলল বুদ্ধিদীপ্ত ধীর কণ্ঠে–জাম্বুবান কি সাধে বলেছি!
ফের।
ছোটকর্তা ঠিকই বলেছেন, এটা হত্যা, আত্মহত্যা নয়।
কীভাবে? কীভাবে? কীভাবে? তড়াক করে লাফিয়ে চিলের মতো চেঁচিয়ে উঠল জয়ন্ত। এমন জোরে চেঁচালো যে টিকটিকিটা সুড়ুৎ করে উধাও হল স্কাইলাইটের ফোকরে! সেইদিকে আঙুল তুলে বলল ইন্দ্রনাথ–ওই ভাবে!
হেঁয়ালির আগের ঘটনাটা এবার বলা যাক।
ফিরোজা থিয়েটার এই রহস্যকাহিনির অকুস্থল। থিয়েটারটি ব্রিটিশ আমলের। অনেক ইতিহাস, অনেক স্মৃতিবিজড়িত এই প্রমোদ নিকেতন দীর্ঘ একশো বছর ধরে আমোদ বিতরণ করে এসেছে রসিকদের মধ্যে। ফিরোজা থিয়েটারের চাইতে বড় থিয়েটার হালে তৈরি হয়েছে শহরে। কিন্তু এমন জমকালো কোনওটাই নয়। এ থিয়েটারে প্রবেশ করলেই মনের মধ্যে যেন সাতটা কোকিল গান গেয়ে ওঠে। মান্ধাতা আমলের লিফটে চড়ে তিনতলায় ওঠবার পর বিশাল নাট্যশালার বিশালতা মাথা ঘুরিয়ে দেয়। সাহেবদের কাণ্ডই আলাদা। এ-হেন ফিরোজা থিয়েটারে নতুন নাটক মঞ্চস্থ হতে চলেছে। মহড়া শেষ হতে হতেই রাত আটটা বেজে যায়। রোজই বাড়ি ফিরতে রাত হয় তপন আর সুলতার।
তপন ফিরোজা থিয়েটারের বাঁধা বাজিয়ে আর গাইয়ে। ওর দরাজ গলায় গান আর সুরেলা পিয়ানো সঙ্গীত না থাকলে কোনও নাটকই জমে না। চেহারাটিও ভালো। তাই স্টেজেও নামতে হয়। নাটক লেখা হয় সেইভাবেই। সুলতা ওর নতুন বিয়ে করা বউ। রূপসী। ফিরোজা থিয়েটারের যা কিছু নাটক রচনার দায়িত্ব ওর কাঁধে। সুলতার সংলাপ এত মিষ্টি, এত তেজালো, এত নাটকীয়, যে দর্শকরা ওর নামে পাগল।
ফিরোজা থিয়েটারেই দুজনের পরিচয়। প্ৰণয় এবং পরিণয়।
সেদিনও রাত করে ফ্ল্যাটে ফিরল তপন আর সুলতা। সুলতা শাড়ি পালটে টান টান হল শয্যায়, উদরাগ্নি হোটেলেই নিভিয়ে আসা হয়েছিল। সুতরাং জামা খুলতে গিয়ে তপন চমকে উঠল। মানিব্যাগটা ফেলে এসেছে স্টাফরুমে।
সুলতার তখন ঘুম এসে গেছে। মানিব্যাগ স্টাফরুমে পড়ে আছে শুনে জড়িত কণ্ঠে বলল–কালকে গেলেই পাবেখন। এসে শুয়ে পড়ো।
তপন বললে–তা হয় না। মানিব্যাগ ভর্তি টাকা রয়েছে। ড্রেসিং রুমেও চাবি দেওয়া থাকে না। সকালে ঝাড়ুদার আসে। তার চাইতে আমি এখুনি গিয়ে নিয়ে আসি। এই তো তিন মিনিটের রাস্তা। যাব আর আসব।
এসো, বলে পাশ ফিরে পাশবালিশে পা তুলে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল সুলতা। রাত তখন দশটা। ফিরোজা থিয়েটার খাঁ-খাঁ করছে। সামনের ফটক দিয়ে প্রবেশ করল তপন। সিঁড়ি বেয়ে উঠল দোতলায়। দেখল, সামনেই লিফট। লিফটম্যান নেই। অসময়ে কোনওদিনই থাকে না। বলতে গেলে সারা ফিরোজা থিয়েটারে একটি মাত্র প্রাণী ছাড়া দ্বিতীয় ব্যক্তি থাকে না। নাম তার ইস্পাহানি।
ইস্পাহানি সম্বন্ধে দু-চার কথা এই সুযোগে বলে নেওয়া যাক। কেন না, দুর্ভেদ্য এই অপঘাত-রহস্যে বড় রকমের স্থান জুড়ে রয়েছে এই মানুষটা।
ইস্পাহানির বয়স সত্তরের ওপরে। লোকে বলে তার চোখে ছানি পড়েছে। কিন্তু সে তা মানতে রাজি নয়। ইস্পাহানির চুল সাদা, দাড়ি লাল, ভুরু কালো। সব চাইতে আশ্চর্য তার দৈর্ঘ্য। এ রকম বেঁটে গুড়গুড়ে বামন মূর্তি পিগমিদের দেশে পাওয়া যায়। কলকাতার পথে ঘাটে পাওয়া যায় না। মাত্র আড়াই ফুট লম্বা বাঁটকুল মূর্তি–তার ওপর চুল-দাড়ি-ভুরুর রং তিন রঙের।
ইস্পাহানিকে সংগ্রহ করেছিলেন ফিরোজা থিয়েটারের মুসলমান মালিক পারস্যের পথ থেকে। থিয়েটারের অন্যতম আকর্ষণ হিসেবে তার চাকরি হয় পঞ্চান্ন বছর আগে। ক্রমে ক্রমে প্রকাশ পায় তার অসাধারণ প্রভুভক্তি যা নাকি সারমেয়দের সমতুল্য। এরকম বিশ্বাসভাজন ভক্তি এ যুগে বিরল। তাই রাত্রি নিশীথে গোটা ফিরোজা থিয়েটারের রক্ষণাবেক্ষণের ভার তার একার–আর কারো নয়।
তিনতলায় ইস্পাহানির ঘর। রাত গম্ভীর হলেই দরজা খুলে চারপাইয়ের ওপর ঠ্যাং ছড়িয়ে বসে থাকে সে। আর আলবোলা সাজিয়ে ভুরুক ভুরুক করে তামাক খায়। এইটাই একমাত্র নেশা ইস্পাহানির। বিয়ে-থা সে করেনি।
একটা কথা আবার পুনরাবৃত্তি করা যাক। দরজা খুলে তাম্রকুট সেবন করে ইস্পাহানি। কারণ নাকি ধোঁয়ায় তার দম আটকে আসে। এটা তার বহু বছরের অভ্যেস।
খোলা দরজার বিপরীত দিকে আর একটা ঘর। এ-ঘর জাঁদরেল নায়ক আরুণির। ফিরোজা থিয়েটারে এমনি ঘর আরো আছে। করিডরের দু-পাশে সারি সারি স্টাফ রুম। থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত বিশিষ্ট ব্যক্তিদের প্রতিজনের বরাদ্দ একটি বিশ্রাম ঘর। কমন গ্রীনরুমে অনেকেই যেতে চায় না–নিজের নিজের ঘরই তাদের পছন্দ। ড্রেসিংরুম বলতে এই স্টাফরুমকেই বোঝায়। তিনতলার ওপরে ছাদ।
