সহসা শূন্যে উত্থিত হাতটা নামিয়ে আনল মিস ডায়না–সঙ্গে-সঙ্গে হোঁচট খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে গেলেন স্যার রিচার্ড। আর নড়লেন না।
দৌড়ে গেল তার খুড়তুতো ভাই ইলিয়ট হডন। হাঁটু গেড়ে বসে চিৎ করে শোয়াল দাদাকে।
পরক্ষণেই দাঁড়িয়ে উঠে বললে–ডাক্তার ডাকুন। দাদা মারা গেছেন।
স্যার রিচার্ডের বুকে ছুরি মারার চিহ্ন।…রক্ত…কিন্তু ছুরি নেই কোথাও।
পুলিশ এল। মাথা নেড়ে বললে অসম্ভব! অশুভ প্রেতাত্মা এসে ছুরি মেরে গেল।
তাই কি হয়?
সমস্ত রাত কারও ঘুম হয় না। স্যার রিচার্ডকে সত্যি সত্যিই মরতে দেখে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল ডায়না। ডাক্তার তাকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছে পুলিশ তাকে জেরা না করা পর্যন্ত কোনও কথা বলতে রাজি নয়।
সবচেয়ে আশ্চর্য! ছুরিটা কোথায়? অভ্যাগতদের মধ্যে কেউ বললে, ডায়নার হাতে সত্যিই যেন কী চকচক করে উঠেছিল। কেউ বললে, চোখের ভুল। সত্যিই ডায়নার হাতে কিছু দেখা যায়নি। ক্ষতস্থানেও নয়।
ছুরিটা খুঁজে বের করার জন্যেই ইলিয়ট হেডন ফের গিয়েছিল মন্দিরচত্বরে। ভোররাতেও তাকে ফিরতে না দেখে টনক নড়ল প্রত্যেকের। পাদ্রী সাহেবের ওপর ভার পড়ল তাকে খুঁজে আনার।
একজন সঙ্গী নিয়ে পাদ্রী গেলেন অকুস্থলে। স্যার রিচার্ডের লাশ আগেই সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ঠিক সেই জায়গায় মুখ থুবড়ে পড়ে আরও একটা দেহ।
ইলিয়ট হেডন। তখনও নিসে পড়ছে। কাঁধে বিঁধে আছে একটা ছুরি।
জ্ঞান ফেরার পর ইলিয়ট যা বলল তা সত্যিই রোমাঞ্চকর। মন্দিরের সামনে পৌঁছনোর পর থেকেই কেন জানি তার মনে হচ্ছিল কে যেন তাকে প্যাট-প্যাট করে দেখছে গাছের আড়াল থেকে।
আচমকা কীসের আঘাত লাগল রগের ওপর। মাথা টলে পড়ে যাওয়ার সময়ে একটা ছুরি উড়ে এসে গেঁথে গেল কাঁধে। তারপর আর কিছু মনে নেই।
গল্প শেষ হল। ক্লাবের কেউ বললে ডায়নাই খুনি। অপরজন বললে–দূর! ডায়না স্যার রিচার্ডের কাছেই আসেনি। দূর থেকে ছুঁড়ে মেরেছে? বেশ বেশ ছুরিটা কি হাওয়ায় গলে মিলিয়ে গেল? অন্য এক সদস্য বললে–গাছের আড়ালেই কেউ লুকিয়ে ছিল। ইলিয়ট নিজেও তা টের পেয়েছে। বুকে ছুরি নিয়ে পড়ে যাওয়ার সময়ে হাতের টানে ছুরি টেনে নিয়ে নিশ্চয় দূরে ফেলে দিয়েছিলেন স্যার রিচার্ড। সেই ছুরি দিয়েই হত্যাকারী খতম করতে চেয়েছে তার খুড়তুতো ভাইকে।
মিস মার্পল বললেন–তোমাদের মাথা আর মুণ্ডু।
আর কী বললেন বলুন তো?
.
গোয়েন্দা ধাঁধার সমাধান
মিস মার্পল বললেন–তোমাদের মাথা আর মুণ্ডু। মেয়েছেলে দেখলেই সব ব্যাটাছেলেই কাণ্ডজ্ঞানহীন হয়ে ছোটে। স্যার রিচার্ডও রূপে পাগল হয়ে ছুটে গিয়েছিলেন সামনে নিশ্চয় হোঁচট খেয়েছিলেন গাছের শেকড়ে। মাথা ঠুকে বেহুঁশ হয়ে যেতেই সবার আগে একজনই গিয়েছিল তার কাছে খুড়তুতো ভাই ইলিয়ট। তার পরনে জংলি সর্দারের পোশাক। তার মানে কোমরে গোটা চার পাঁচ ছুরি থাকা আশ্চর্য নয়। বেঁকের মাথায় চট করে খুন করে ফেলে দাদাকে সম্পত্তির লোভে, উপাধির লোভে, ডায়নার লোভে। বুকে ছুরি বিধিয়েই লুকিয়ে ফেলে বেল্টের মধ্যে। পরে নিজের কাঁধেই ছুরি মেরে সাধু সাজতে চেয়েছিল। প্রেমের আগুনে পুরুষ-পোকারা পুড়ে মরে এইভাবেই।
* সাপ্তাহিক অমৃত পত্রিকায় প্রকাশিত। ১৪ চৈত্র, ১৩৮১।
ভানুমতীর খেল
ভানুমতীর খেল ছাড়া আর কি, বিরক্তকণ্ঠে বললে ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টর জয়ন্ত চৌধুরী।
অশরীরী ছাড়া কারো পক্ষে আরুণিকে খুন করা সম্ভব নয়। সুতরাং এটা খুন নয়, আত্মহত্যা।..বলে, কফির কাপে প্রচণ্ড শব্দে চুমুক দিল সে।
কথা হচ্ছিল আমার বৈঠকখানায়। আড্ডার আসর জমিয়েছিল বন্ধুবর ইন্দ্রনাথ রুদ্র। প্রাইভেট ডিটেকটিভ হিসাবে ওকে আমার কলমে ঠাই দিয়েছিলাম। এখন দেখা যাচ্ছে, আমার চাইতে ওর নামই বেশি। যাক সে কথা।
নির্ভেজাল সেই আড্ডার আসরে ধূমকেতুর মতো আবির্ভূত হল আমার আর একটি গোয়েন্দা বন্ধু–জয়ন্ত চৌধুরী। সরকারের নুন খেয়ে গোয়েন্দাগিরি করে বলে ইন্দ্রনাথ তাকে যখন তখন ঠাট্টা বিদ্রূপ করে বিধিয়ে বিঁধিয়ে উপহাস করে। বলে–রামভক্ত হনুমান, সরকারভক্ত জাম্বুবান।
সেদিনও এই জয়ন্ত এসে আমাদের খোশগল্পের আসরটি পণ্ড করে দিল। এমন একটা অবিশ্বাস্য অপঘাত কাহিনি বর্ণনা করল যা আত্মহত্যা ছাড়া কিছুই নয়। অথচ লোকান্তরিত লোকটার পরিচিতবর্গের জবানবন্দী থেকে মনে হয় হত্যা। বেশ ঠান্ডা মাথায় ভেবেচিন্তে আটঘাট বেঁধে হত্যা।
তাই জয়ন্ত চৌধুরীর মেজাজ সপ্তমে চড়েছে। গরুখোঁজা খুঁজে বার করেছে ইন্দ্রনাথকে। এক নিঃশ্বাসে বিবৃত করেছে আদ্যপান্ত ঘটনাটা। সবশেষে মন্তব্য করেছে–একে যদি হত্যাকাণ্ড বলতে হয় তো বলব ভানুমতীর খেল। অথচ ছোটকর্তা টিটকিরি দিয়ে বললেন কিনা জয়ন্ত, তুমি এবার রিটায়ার করো। এটা সাজানো আত্মহত্যা। আসলে খুবই ইনটেলিজেন্ট মার্ডার। আমার ইনটেলিজেন্স নিয়ে এ হেন কটাক্ষ, বলুন দিকি বৌদি, সহ্য করা যায় কি?
গৃহিণী কবিতা মুখ টিপে হেসে বলেছে–সত্যিই তো।
ইন্দ্রনাথ, তোর কী মনে হয়, গলার শির তুলে চেঁচিয়ে বলেছে জয়ন্ত। |||||||||| তোর কী মনে হয়, সেটা বল। ইজ ইট এ মার্ডার? তাই যদি হয়। প্ল্যানচেট করে পি সি সরকারের প্রেতকে নামালেই হয়–আমাকে কেন? কুহক বিদ্যেটা আমি শিখিনি। ইন্দ্রজাল আর রহস্যের জাল কি এক জিনিস হল?
