কই দিলেন? আর্তনাদ করে ওঠে ভাস্কর, আ-আমার তিন লাখ টাকার সোনা কোন গাছের তলায় আছে।
নিষ্ঠুর গলায় বললে ইন্দ্রনাথ দরজার দিকে যেতে যেতে, ওটা আপনিই বার করুন আপনার কুটিল ব্রেন খাঁটিয়ে।
সে তো করবই। কিন্তু সময় তো লাগবে–ভার্গবে, ইয়ে, মানে প্রেতাত্মাটি কষ্ট পাবে—
হঠাৎ এক কাণ্ড করে বসল ভারতী। ইন্দ্রনাথের দু-হাত জড়িয়ে ধরল।
বলল চোখে চোখ রেখে গাঢ় কণ্ঠে, দাদা!
দাদা?
হ্যাঁ, আমি আপনার বোন। আমার একটা কথা রাখুন।
বিরাট নিশ্বাস ফেলে ইন্দ্রনাথ বললে, হায়রে বাংলার বধু..গাছের সন্ধানটা বলে দিতে হবে, কেমন?
হ্যাঁ, দাদা।
এই হিমালয়ে বসে?
আপনি পারবেন। ফিফথ স্টেপ নিশ্চয় ভেবে রেখেছেন।
হেসে ফেলল ইন্দ্রনাথ, দুষ্টু মেয়ে। তোমার মহাপণ্ডিত ভার্যাট স্বামীকে জিগ্যেস করো তো ভান্ডির মানে কী?
ভান্ডির।
সবই তো ভায়ের খেলা। কৃষ্ণনগরের চুর্ণিতে এতদিন ছিলে, বটগাছ দেখোনি অজস্র?
বটগাছ? হা, হা ওর স্টুডিওর দক্ষিণ দিকেই তো একটা বুড়ো বট—
ভান্ডির মানে বট গাছ। ডবল নাম তো এখানেও। ভাস্কর, ভার্যাট, ভান্ডির–বটগাছের তলা খুঁড়লেই–
তিন লাখ টাকার সোনা–! সোল্লাসে কুঁজটাকে প্রায় সিধে করে ফেলল ভাস্কর।
ইন্দ্রনাথ ততক্ষণে চৌকাঠ পেরিয়ে গেছে। কিন্তু বাড়ির বাইরে যাওয়ার আগেই দৌড়ে নেমে এল ভারদ্বাজ আর ভায়োলেট।
দু-জোড়া নীল চোখ মেলে বললে, আঙ্কল, পুলিশে খবর দেবেন নাকি?
দু-হাতে দুজনের থুতনী ধরে বললে ইন্দ্রনাথ, নির্ভয়ে থেকো। আমি পুলিশের লোক নই। সবচেয়ে বড় কথা, তোমাদের ড্যাডি তো এখন বড় পুলিশের কাছে। এখানকার পুলিশ সব খবর নাই বা জানল?
বৃষ্টির আভাস দেখা দিয়েছিল চার টুকরো নীল আকাশে।
ইন্দ্রনাথ আর দাঁড়ায়নি।
আগাথা ক্রিস্টির গল্প নিয়ে গোয়েন্দা ধাঁধা
ভাঙা দেউলের খুনি প্রতিমা। মিস্ মাপল
ক্লাবের নাম টুইসডে নাইট ক্লাব। উদ্দেশ্য–রহস্য গল্প বলা এবং তার সমাধান করা। সেদিন গল্প বলেছেন পাদ্রী পেনডার।
ডার্টমুর জায়গাটা রহস্যময়, ভয়ঙ্কর অথচ সত্যিই দর্শনীয়। ডার্টমুরের প্রান্তে বেশ খানিকটা জায়গা জমি কিনলেন স্যার রিচার্ড হেডন। প্রাসাদের পাশেই প্রস্তর যুগের সারি-সারি গুহা, দিগন্তবিস্তৃত জলাভূমি এবং জঙ্গলাকীর্ণ পর্বতশ্রেণি।
এই বাড়িতেই একদিন একটা পার্টি দিলেন স্যার রিচার্ড। অনেকেই এলেন সেখানে– অভ্যাগতদের মধ্যে রইল মিস ডায়না–ডাকসাইটে সুন্দরী।
সবাইকে নিয়ে স্যার রিচার্ড গেলেন প্রস্তরযুগের গুহা অঞ্চলে। নিওলিথিক কুঁড়ে দেখিয়ে বললেন–এ জায়গার নাম সাইলেন্ট গ্রোভ।
সাইলেন্টই বটে। থমথম করছে চারিদিক। নির্জন, নিস্তব্ধ। এবড়োখেবড়ো পাহাড় ন্যাড়া ন্যাংটা। আর কিছু নেই।
অদূরে অনেকগুলো গাছ মাথা ঠোকাঠুকি করে দাঁড়িয়ে আছে। অনেকদিনের মরা গাছ– নতুন করে পুঁতে রাখা হয়েছে শুধু মাঝের দেউলটাকে ঘিরে রাখার জন্যে।
ভাঙা দেউল। ফোনিসিয়ানদের ডাকিনী মন্দির। মন্দিরে পাথরের প্রতিমা। মনে হয় যেন জীবন্ত। মাথায় জোড়া শিং।
গা শিরশির করে উঠল অভ্যাগতদের। মেয়েরা ভয় পেল। পুরুষরাও স্বীকার করলে– জায়গাটা অভিশপ্ত। যেন একটা অশুভ শক্তি প্রচ্ছন্ন রয়েছে এখানকার বাতাসে। পরিবেশ মোটেই সুবিধের নয়।
মিস ডায়না কিন্তু লাফিয়ে উঠে বললে–তাই কি হয়? আসুন আজ চঁদনী রাতে সবাই মিলে নাচগান করি–দেবীপ্রতিমার সামনে।
রোমাঞ্চিত হল সবাই। রাজিও হল।
প্রাসাদের হলঘরে খাওয়ার টেবিলে সব শেষে হাজির হল মিস ডায়না। এসে দেখলে তার মন জোগাতে প্রত্যেকেই অদ্ভুত সাজে সেজে এসেছে। স্যার রিচার্ড প্রস্তরযুগের গুহাবাসী সেজেছেন– তার খুড়তুতো ভাই জংলি সর্দারের ছদ্মবেশ নিয়েছেন। লেডি ম্যানারিং সেজেছেন হাসপাতালের নার্স তার মেয়ে হয়েছেন হারেমের বাঁদি ইত্যাদি ইত্যাদি।
ফুর্তিতে নেচে উঠে মিস ডায়না বললে–চলুন বেড়িয়ে আসা যাক।
বাইরে চাঁদের আলো। মায়াময় পরিবেশ। অভ্যাগতরা সকলেই ফুর্তি উচ্ছল। হঠাৎ দেখা গেল মিস ডায়না নেই।
শুতে গেল নাকি? বললেন স্যার রিচার্ড।
না-না। মন্দিরের দিকে যেতে দেখেছি, বললেন ভায়োলট ম্যানারিং।
এত রাতে মন্দিরের দিকে? ভুরু কুঁচকোলেন স্যার রিচার্ড। মতলবটা বোঝা যাচ্ছে না তো। ডাইনি সাজবে নাকি?
মন্দিরের দিকে রওনা হলেন সবাই। দূর থেকেই দেখা গেল ভয়াবহ সেই দৃশ্য।
মন্দিরের দাওয়ায় দাঁড়িয়ে অপার্থিব একটি মূর্তি। সারা দেহ চকচকে বস্তুতে আচ্ছাদিত। মাথায় একজোড়া সিং।
প্রতিমা কি জাগ্রত হয়েছে?
ডায়না! ডায়না! তীক্ষ্ণস্বরে বললেন ভায়োলেট।
মেয়েদের চোখকে ফাঁকি দেওয়া যায় না। ভায়োলেট ঠিকই চিনেছেন। ডায়নাই বটে।
ভীষণা দেবীর মতোই চন্দ্রকিরণে দাঁড়িয়ে অকম্পিত দেহে—
ডায়না! চমকে উঠলেন স্যার রিচার্ড! অন্যরকম মনে হচ্ছে না?
দাওয়ায় দাঁড়িয়ে এক হাত শূন্যে তুলল ভয়ংকরী!
বলল–আমি এ মন্দিরের অধিষ্ঠাত্রী দেবী। কাছে এসো না। আমার হাতে মৃত্যু।
সর্বনাশ! হেসে উঠে বললেন স্যার রিচার্ড। কী ছেলেখেলা জুড়েছ, ডায়না। বলেই পা বাড়ালেন সামনে।
এগিয়ো না, এগোলেই মরবে।
হাঃহাঃহাঃ। খুব ভয় দেখাচ্ছ দেখছি।
বারণ করছি আর এগিয়ো না। আমার হাতে মৃত্যু।
ছুটে গেলেন স্যার রিচার্ড।
