মাই গড! গা শিরশির করে ওঠে বোধ হয় ভাস্করের। ভারতীর দু-হাত ধরে গা ঘেঁষে দাঁড়ায় ভারদ্বাজ আর ভায়োলেট।
এসব ঘটল ইন্দ্রনাথের পেছনে। সে চেয়ে আছে সামনে সিন্দুকের দিকে। দুচোখ জ্বলছে নক্ষত্রের মতো। একটু একটু করে কণ্ঠে জাগ্রত হচ্ছে দুন্দুভি নিনাদ। যেন বিদেহীদের আবাহন করার সুরে কথাগুলো বলে একদৃষ্টে চেয়ে রইল সিন্দুকের দিকেই। তারপর সেই দিকে চেয়ে থেকেই বলল, ভারতী দেবী!
বলুন।
ভার্গব বসুর রসিক মনের পরিচিতি রয়েছে এই ফ্যামিলির প্রত্যেকের নামকরণের মধ্যে। ভা দিয়ে নাম শুরু হয়েছে প্রত্যেকের। আপনার, ভাস্করবাবুর আর ভার্গবাবুদের নামের আদ্যক্ষরে মিল কাকতালীয়। ওই মিল দেখেই ছেলেমেয়ের নামের গোড়ায় ভা লাগিয়েছিলেন উনি। তাই না?
হ্যাঁ। আমিও ওদের যে দুটো নাম দিয়েছি, তাও ভা দিয়ে শুরু। ওঁর পছন্দ হবে জেনেই করেছিলাম। আমাকেও তো ভানুমতী নামে ডাকতেন।
তাহলে দেখা যাচ্ছে, আমি বাদে এখানে যারা রয়েছে, তাদের প্রত্যেকের নামের আগে রয়েছে ভা। এই সিন্দুকে যা কিছু আছে, তা ভাস্করবাবু বাদে বাকি তিনজনের জন্যে। তিনটে ভাওলা নামের জন্যে। তাহলে তিনবার হাতলের তির ভায়ের দিকে ঘোরানো যাক।
বলেই, উঠে গিয়ে দু-হাতে গোল হাতল চেপে ধরে লাল তিরটাকে প্রথমে ভয়ের দিকে ঘোরালো ইন্দ্রনাথ, তারপরে আয়ের দিকে।
একবার ভা হল। আরও দুবার হোক। বলে পরপর একই ভাবে হাতল ঘুরিয়ে দুবার ভা রচনা করল ইন্দ্রনাথ। মোট হল তিনবার। তিনজনের ভা সিন্দুক, এবার হও তো চিচিং ফাঁক।
হাতল ধরে টান দিল বটে ইন্দ্রনাথ। কপাট রইল অনড়। ব্যঙ্গের হাসি শোনা গেল পেছনে। হাসছে ভাস্কর।
মাই ডিয়ার ডিটেকটিভ, আমাকে বাদ দিতে গিয়ে ভুলটা করলেন। এই ফ্যামিলির আমিও একজন। চারজনের ফ্যামিলি। চারবার ভা হবে। আবার করুন–গোড়া থেকে।
কথার জবাব না দিয়ে যেন আপন মনেই বলে গেল ইন্দ্রনাথ, ভার্গব বসুর প্রেতাত্মা যদি হাজির থাকেন, তাহলে যেন এইরকম বিচ্ছিরি ভাবে হেসে উঠবেন না–ছেলেমেয়েরা ভয় পাবে। আপনার অতিরিক্ত হুঁশিয়ারি আগেই আঁচ করেছিলাম। তবুও পেরিয়ে এলাম ফাস্ট স্টেপ। এবার সেকেন্ড স্টেপ। আপনাদের প্রত্যেকের নাম দুটো। ভারতী আর ভানুমতী, ভারদ্বাজ আর ভাস্করাচার্য, ভায়োলেট আর ভাস্বতী। মোট ছটা ভা।
আজ্ঞে না, মোট আটটা ভা। ভাস্কর আর…আর…
ভার্যাট। কঠিন স্বরে পেছন না ফিরেই বলল ইন্দ্রনাথ। মানেটা ছেলেমেয়েদের সামনে আর বললাম না।–যাক, মোট ছবার ভায়ের দিকে তির ঘোরানো যাক।
ঘুরল হাতল। খুলল কপাট। ভেতরে ঠাসা সোনার বাটও দেখা গেল।
কিন্তু হিরের থলি কই?
বিদ্রুপের ছুরি ঝলসে ওঠে ভাস্করের কণ্ঠে, ব্লাফার!
বিদ্যুৎবেগে ঘুরে দাঁড়ায় ইন্দ্রনাথ, কে? ভার্গব বসু? তার নখের যোগ্যও আপনি নন। কথাটা রিপিট করবেন না–প্রেতাত্মা হাজির থাকতে পারে।
মুখ সাদা হয়ে গেল ভাস্করের। থরথর করে কাঁপতে লাগল মুখের আঁচিলগুলো।
নিরক্ত মুখে ভারতী শুধু বললে, কিন্তু হীরের থলি—
সিন্দুকেই আছে। চকিতে কণ্ঠস্বর সহজ করে বলল ইন্দ্রনাথ। এবারে আসা যাক থার্ড স্টেপে।
থার্ড স্টেপ? ভারতী বিস্মিত, সিন্দুকে তে থলি নেই।
সিন্দুকেই আছে, ভারতী দেবী! স্নিগ্ধকণ্ঠ ইন্দ্রনাথের, ভার্গব বসু, অন্তত আপনার সামনে মিথ্যে বলেননি। কারণ আপনাকে তিনি মনে মনে পুজো করতেন, মনের সিংহাসনে আপনাকে দেবীর আসনে বসিয়েছিলেন। ভারতীর চেয়ে ভানুমতী নামটা তিনি অকারণে দেননি–ভানুমতীর ভেল্কি শুধু আপনিই দেখাতে পারবেন, এই বিশ্বাস এই আস্থা নিয়ে আপনার জিম্মাতেই রেখে গেছেন ছেলেমেয়ের হিরে।
আমি। আমার..কাছে… হঠাৎ চিকচিক করে ওঠে ভারতীর চোখে। বুঝেছি।
নীরবে ঘাড় হেলায় ইন্দ্রনাথ, হা, ভানুমতী নামটাতেই এবার হাতল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে তির ছোঁয়াতে হবে।
সিন্দুকের কপাট আস্তে আস্তে বন্ধ করে দিল ইন্দ্রনাথ। হাতলের তির ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ছুঁয়ে গেল ভানুমতী শব্দটাকে।
কিন্তু কপাট আর খুলল না।
অসহিষ্ণু কণ্ঠে বলল ভাস্কর, দুর মশায়? শুধু অর্ধাঙ্গিনীর নামে কোনও শুভ কাজ হিন্দু শাস্ত্রের বিধানে আছে। যত্ত সব। আমার নামটাও যোগ করুন…
নির্বিকার ভাবে বললে ইন্দ্রনাথ, এবার ফোর্থ স্টেপ। ভারতী দেবী, ভালে চন্দ্র যার, তার নাম কী?
শিব। বললে ভারতী ঈষৎ বিমূঢ় কণ্ঠে।
হাতলে রয়েছে শিব, মাথায় রয়েছে চন্দ্র–নিশ্চয় অকারণে নয়। কাছে আসুন। কী দেখছেন? চাঁদের একটা খোঁচার ওপর ছোট্ট বিন্দু। ওই বিন্দুটাই হোক এবার আমাদের চিচিং ফাঁক সঙ্কেত।
বলেই দুহাতে অর্ধচন্দ্র চেপে ধরল ইন্দ্রনাথ। চাপ দিতেই আস্তে আস্তে ঘুরে গেল শুধু বাঁকা চঁদটা। কালো বিন্দুটাকে দিয়ে ভানুমতী শব্দটা ছুঁয়ে ছুঁয়ে গেল ইন্দ্রনাথ।
খুলে এল শিবমূর্তি সমেত পুরো হাতলটা। ভেতরে একটা খুপরি। খুপরির মধ্যে একটা মখমলের থলি।
আলতো হাতে থলে বার করে এনে টেবিলে উপুড় করে দিল ইন্দ্রনাথ।
হাজারটা সূর্য যেন ঠিকরে গেল অজস্র ছোট-বড় হিরে থেকে।
স্থলিত স্বরে বললে ভানুমতী, বুঝলেন কী করে বলবেন?
সিন্দুকের ডবল দাম শুনে। ডবল দাম দেওয়া মানেই ডবল কাজ করা হয়েছে সিন্দুকে। মানে, ডবল সিন্দুক। সিন্দুকের ভেতরে সিন্দুক। ভার্গব বসুর প্রেতাত্মা এবার ঊর্ধ্বলোকে যেতে পারেন–যাকে যা দেবার, তা দিয়ে গেলাম।
