জানলা দিয়ে হিমালয়ের পাহাড় চুড়োগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল দুই ভাইবোন। দুজনেই দুটো বিউটি।
চোখ নামিয়ে রয়েছে ভারতী। সেদিকে একবার তাকিয়েই রুক্ষ কণ্ঠে বললে ভাস্কর, সাফাই গাওয়ার দরকার নেই। আমার জন্যে কী ব্যবস্থা করেছ বলো।
ভার্গব বসুর ভয়ঙ্কর চোখদুটো একটু শুধু ছোট হল। কণ্ঠস্বর রইল অবিকৃত। বললে, কৃষ্ণনগরে তোমার স্টুডিওর আশেপাশে অনেক গাছ আছে। একটা গাছের তলায় রূপোর বাক্সে সোনার বাট রাখা আছে–বর্তমান বাজার দাম প্রায় তিন লাখ টাকা।
তি-ন-লা-খ! যেন দম আটকে আসে ভাস্করের।
ওই সোনা তোমার।
কি-কিন্তু কোথায় আছে?
সেটা তোমাকে খুঁজে বার করে নিতে হবে।
কিন্তু গাছ তো অনেক–লোকজন তো দেখে ফেলবে সব গাছের তলা খুঁড়তে গেলে—
সমাধানটা তোমাকেই করতে হবে। যেমন এখানকার সমাধান করবে ভানুমতী।
আমি! চমকে ওঠে ভারতী। সমস্যাটাই বা কী?
আমার পেছনে এই যে সিন্দুকটা দেখছ, দেওয়াল ঘেঁষা ইস্পাত-সিন্দুক দেখিয়ে বলে ভার্গব বসু, এর মধ্যে আছে ত্রিশ লাখ টাকার সোনা। তোমার, ভারদ্বাজের আর ভায়োলেটের জীবন তাতে চলে যাবে।
ও। সংক্ষিপ্ত মন্তব্য ভারতীর। কিন্তু সমস্যাটা কী?
সিন্দুকটা ডবল দাম দিয়ে করিয়ে এনেছিলাম বোম্বাই থেকে। কপাটের ওপর শিবমূর্তিটার চারপাশে গোল সার্কেলের মধ্যে স্বরবর্ণ আর ব্যঞ্জনবর্ণের সবকটা হরফই লেখা রয়েছে দেখতে পাচ্ছ। আমি ছাড়া সিন্দুক খোলার কায়দা কেউ জানে না। তোমাকে সেই কৌশল আবিষ্কার করতে হবে–যদি হঠাৎ আমি মারা যাই।
হঠাৎ মারা যাবে কেন? উদ্বিগ্ন স্বর ভারতীর।
কারণ আমরা হার্টের অবস্থা ভালো নয়। বর্ডার পুলিশের গুলিতে অক্ষত ছিলাম না, ভারতী। যাক সেকথা, সোনা ছাড়াও সিন্দুকে আছে একটি থলি বোঝাই হিরে। তার বাজার দাম এখন কত–বলতে পারব না। তোমার বড় আদরের ভাস্বতী আর ভাস্করাচার্যের জন্য রইল এই থলি। কিন্তু সিন্দুকের মধ্যে থেকে আবিষ্কার করতে হবে তোমাকেই।
বিচ্ছিরি হাসি সোনা গেল এই সময়ে। চমকে উঠল প্রত্যেকেই।
হাসছে ভাস্কর।
বললে, সিন্দুকটা আগুনে পুড়িয়ে ভেঙে ফেললেই ল্যাটা চুকে যাবে–সিক্রেট জানবার দরকার কী?
বিচিত্র হাসি ভেসে ওঠে ভার্গবের ঠোঁটের কোণে, সেই সঙ্গে উড়ে যাবে এই কটেজ। হাতুড়ির ঠোকা পড়লেও তা হবে। কারণ, ওর মধ্যে বসানো আছে পাওয়ারফুল এক্সপ্লোসিভ।
আতকে ওঠে ভাস্কর।
নির্দয় চাহনিটা এতক্ষণে ফুটে উঠতে দেখা যায় ভার্গব বসুর পাথর কঠিন চক্ষুতারকায়।
বলে নির্মম স্বরে, ভাস্কর, ভার্গব বসু কোনও কাজেই ফাঁক রাখে না। এতদিন তোমাকে এ-বাড়িতে আনিনি তোমার এই লোভী মনটার জন্যেই কুবেরের সম্পত্তি এখানে আছে তুমি জানতে পারলে কী-কী করবে, তাও আমি জানি। কিন্তু পার পাবে না–পরলোক বলে যদি কিছু থাকে, প্রেতাত্মা বলে যদি কিছুর অস্তিত্ব থাকে–আমি সেই প্রেতাত্মা হয়ে অভিশপ্ত করে তুলব তোমার জীবনকে।
.
সন্ধ্যা নামছে পাহাড়ের গায়ে। সূর্য আর দেখা যাচ্ছে না।
কথা শেষ করে হাঁফাচ্ছে ভার্গব বসু। হঠাৎ এক ঝলক রক্ত উঠে এল মুখ দিয়ে।
ভার্গব! চকিত কণ্ঠ ইন্দ্রনাথের।
হাত তুলে তাকে নিরস্ত করে ভার্গব, আমার আয়ু শেষ হয়ে এসেছে ইন্দ্রনাথ রুদ্র। ভেবেছিলাম ভানুমতীকে বলে যাব সিন্দুক খোলার গুপ্তরহস্য–কিন্তু আর সময় নেই। ডাক এসেছে, চললাম।
মাথাটা বুকের ওপর ঝুঁকে পড়ে ভার্গবের।
ধরে ফেলে ইন্দ্রনাথ। কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে বলে জোর গলায়, কিন্তু আমাকে শোনালেন কেন এই কাহিনী?
ক্ষীণ কণ্ঠে জবাব দেয় ভার্গব, সিন্দুক আপনি খুলে দেবেন বলে।
প্রাণবায়ু মিলিয়ে গেল শূন্যে শেষ শব্দটা উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে।
রহস্য সিন্দুকের সামনে বসে আছে ইন্দ্রনাথ রুদ্র। কমল হিরের মতো চোখদুটি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে সিন্দুকের প্রতিটি অংশ।
ওর পেছনে দাঁড়িয়ে আছে ভারতী আর ভাস্কর, ভারদ্বাজ আর ভায়োলেট।
ইন্দ্রনাথ দেখছে, সিন্দুকটা দামি ইস্পাত দিয়ে তৈরি। চওড়ায় ছ-ফুট, লম্বায় তিন ফুট। কপাটটার প্রায় সবটুকু জুড়ে গোলাকার হাতল। হাতলের ওপর একটা শিবের মূর্তি। মূর্তির মাথায় অর্ধচন্দ্র। বাঁকা চাঁদের খোঁচাদুটো ফেরানো রয়েছে হাতল ঘিরে খোদাই করা স্বরবর্ণ আর ব্যঞ্জনবর্ণের হরফগুলোর দিকে। গোল হাতলের ওপরের কিনারায় একটা তির চিহ্ন। লাল রঙের। অর্থাৎ এই তির চিহ্ন ঘুরিয়ে সঠিক হরফগুলোর দিকে ফেরালেই খুলে যাবে সিন্দুক।
বুঝলাম। যেন নিজের মনেই বলল ইন্দ্রনাথ।
কি বুঝলেন? পেছন থেকে জিগ্যেস করল ভারতী।
গোল হাতলের ওই তিরটা ফেরাতে হবে এমন কয়েকটা হরফের দিকে যা জানা ছিল কেবল ভার্গব বসুর।
বিরক্ত স্বরে বলল ভাস্কর, ওটা আমরাও বুঝেছি। কিন্তু হরফগুলো কি, তা কি বলে গেছে আপনাকে?
না। শান্ত স্বরেই বলল ইন্দ্রনাথ, সময় পেলেও বলত না। কেননা, ভার্গব আমাকে চিনত হাড়ে হাড়ে।
আমাদের যদি সেইভাবে চেনবার সুযোগ দিতেন–
ভাস্করের মুখের কথা আটকে গেল ইন্দ্রনাথ ফিরে তাকানোর সঙ্গে সঙ্গে। হিমেল চোখ। গা পর্যন্ত হিম হয়ে গেল ভাস্করের। সুপুরুষ, অমায়িক মানুষটার চোখ যে পলকের মধ্যে বরফ কঠিন হয়ে উঠতে পারে, আগে তা ভাবেনি।
ওই একবারই চাইল তার পানে ইন্দ্রনাথ। আবার মুখ ফিরিয়ে নিল সিন্দুকের দিকে। বলল, ভার্গব বসু শুধু তস্কর সম্রাট ছিল না, রসিক সম্রাটও ছিল। রহস্য ওর জীবনের পাতায় পাতায়। কোনওটা ভয়ঙ্কর রহস্য, কোনওটা মজার রহস্য। এই সিন্দুক ওর মজার রহস্যপ্রবণতার শ্রেষ্ঠ কীর্তি। সারা জীবন ধরে ওর অনেক রহস্যের সমাধান করেছি, মৃত্যুর আগে তাই চ্যালেঞ্জ জানিয়ে গেল শেষ রহস্যটা উপহার দিয়ে। জানি না, পরলোক আছে কিনা, প্রেতাত্মার অস্তিত্ব আছে কিনা–যদি থাকে, তাহলে এই রাতের অন্ধকারেই বাইরে থেকে ঘরের আলোয় চেয়ারে এসে বসুক! দেখুক, তার বুদ্ধি বড়, না আমার বুদ্ধি বড়!
