কিন্তু আজ আর সে ইচ্ছে করছে না। হিমালয়ের হাতছানি তার প্রাণে আর সাড়া জাগাচ্ছে না। কেননা, খবর এসেছে দুদিন আগে–ভার্গব বসু আর নেই।
হিমালয় গ্রাস করেছে মহাভয়ঙ্কর ভার্গকে। বর্ডার পুলিশের গুলি এড়িয়ে আর পালাতে পারেনি। মাদক দ্রব্যের বোঝা সমেত লাশ গড়িয়ে গেছে খাদের মধ্যে।
ভার্গব আর আসবে না। টাকাও আর আসবে না। সংসার চলবে কেমন করে?
ভারতী তাই আজ এত উন্মনা। স্বয়ং হিমালয়ও যেন হাহাকার করে উঠছে মাঝে মাঝে তার বুকের হাহাকারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বহমান বায়ু আকারে।
ভার্গব–যে ভার্গব ভারতীকে দিয়েছে নিরাপত্তা, মাতৃত্বের স্বাদ, নারীত্বের সম্মান, সে ভার্গব বিদায় নিয়েছে চিরকালের জন্যে।
ঝাপসা হয়ে আসে ভারতীর দু-চোখ।
গলা খাঁকারিটা শুনল ঠিক সেই সময়ে। পেছনে।
চমকে উঠেছিল ভারতী। পেছন ফিরে দেখেছিল অতি বৃদ্ধ এক তিব্বতী লামাকে? অষ্টাবক্র মুর্তি বললেই চলে। হাতের যষ্টিও তথৈবচ। লোলচর্মের আড়ালে তির্যক চক্ষু প্রায় অদৃশ্য। চোখ পিটপিট করে নির্নিমেষে দেখছে ভারতীকে।
নিঃশব্দে কখন এসে দাঁড়িয়েছে পেছনে–ভারতী টেরও পায়নি।
বিস্মিত চোখ মেলে কিছুক্ষণ তাকিয়েছিল ভারতীয়। পরক্ষণেই উবে গেছিল বিস্ময়। কৌতুক-তরল হাসিতে সমুজ্জ্বল হয়েছিল মুখচ্ছবি।
বলেছিল বীণাঝঙ্কৃত স্বরে, রাসবিহারী বসুও এমন ছদ্মবেশে ধরতে পারতেন কিনা সন্দেহ। অগ্নিযুগে যদি জন্মাতে, ব্রিটিশরাজ নাজেহাল হয়ে যেত তোমাকে নিয়ে। খাদের মধ্যে থেকে উঠে এলে কী করে? ক-টা গুলি লেগেছিল গায়ে?
ভানুমতী–ভণিতা না করে বললে ছদ্মবেশী ভার্গব বসু, এই জন্যেই তোমাকে বলি মায়াবিদ্যায় নিপুণা। কী করে বুঝলে আমি অশরীরী প্রেত নয়?
ঢং দেখে আর বাঁচি না! উঠে পড়ে ভারতী। রোপওয়েতে এলে নিশ্চয়? চিনতে পারেননি?
পাহাড়ের গায়ে গায়ে অট্টহাসি ছুঁড়ে দিয়ে বললে ভার্গব বসু, ক্ষিদে পেয়েছে।
.
বাইরে থেকে কটেজটাকে মনে হয় ছোট। দোতলা। কিন্তু ভেতরে ঢুকলে বোঝা যায় ছোটখাটো একটা প্যালেস।
দোতলার বিরাট হলঘরটা আজ গমগম করছে আবির্ভাবে। ভারদ্বাজ ভায়োলেট অনেকদিন পর ড্যাডিকে দেখে খুশিতে কলকল করছে। ভারতী এঁটো বাসনকোসন সরাচ্ছে টেবিল থেকে। উজ্জ্বল চোখে বারবার তাকাচ্ছে যার পানে, এই কটেজে সে এসেছে এই প্রথম।
ভাস্কর। তার বিয়ে করা স্বামী।
ভাস্করের সামনেই বসে ভার্গব। স্মিতমুখে শুনছে ভাস্করের বক্তৃতা।
আগের চাইতে আরও কদাকার হয়েছে ভাস্কর। কুঁজো পিঠ যেন আরও নুয়ে পড়েছে বয়েসের ভারে। মুখ আর সারা দেহের আঁচিলগুলো লোমশ হয়ে ওঠায় এখন তাকে মূর্তিমান ইয়েতি বললেও চলে।
এক বিঘত লম্বা একটা পাথরের নারীমূর্তি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখাতে দেখাতে বলছিল ভাস্কর, প্রস্তর যুগের ভেনাস। ফ্রান্স থেকে আনিয়েছি। আহা, মুণ্ডুর যা ছিরি! বুকে পিঠে নিতম্বে এত চর্বিও থাকত সেকালের মেয়েদের? হাউ আগলি!
ভার্গব বললে, শুনেছি, হিমযুগের ঠান্ডা থেকে বাঁচবার জন্যে তখনকার মানুষদের গায়ে চর্বির আস্তরণ থাকত একটু বেশি। ভাস্কর, স্টোনএজের ভেনাস নিয়ে আলোচনা করার জন্যে তোমাকে ডাকিনি। ভারদ্বাজ, ভায়োলেট, ভারতী–তোমরাও শোনো।
ঘর এখন নিস্তব্ধ!
চেয়ারে হেলান দিয়ে বসল ভার্গব বসু, তোমরা জানো পুলিশের চোখে আমি এখন মৃত। মৃতই থাকব বাকি জীবনটা। এখানেই থাকব–আর কোথাও যাব না।
খুশিতে ফেটে পড়ে ভারদ্বাজ আর ভায়োলেট। প্রথমজনের বয়স চোদ্দো। দ্বিতীয়জনের বারো।
সঙ্কুচিত হয় কেবল ভাস্করের একটা চোখ–পাথরের চোখটা নির্ভাষ, নিষ্কম্প।
ভার্গব বলে চলে, আমার রোজগারের উৎস ছিল অনেক। কোটি কোটি টাকা নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছি, বিরাট দলের সর্দারি করেছি। কিন্তু আর নয়। এবার আমার ছুটি। শান্তিতে জীবনযাপনের পালা।
সুবুদ্ধি হল এতদিনে। ভারতীর মন্তব্য।
সামান্য হাসল ভার্গব। বলল, কিন্তু মিতব্যয়ী হতে হবে এখন থেকে। কারণ…
বলে একটু থামল ভার্গব। তারপর বলল, এই কটেজে জমানো টাকা ছাড়া আর কোথাও একটা পয়সাও আমার নেই।
যেন শ্বাস ফেলতেও ভুলে গেছে ঘরের প্রত্যেকে।
বড় নিশ্বাস ফেলে বলল ভার্গব, আমার দেহ নিপাত্তা হয়েছে, এ খবরটা ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমার যে-যে ডেরায় যত নগদ টাকা ছিল, সব লুঠ করে নিয়ে গেছে আমারই স্যাঙাত্রা।
বেশ করেছে। ঈষৎ কঠিন শোনাল ভারতীর গলা।
কিন্তু যেন হাহাকার করে ওঠে ভাস্কর, কিন্তু আমার তাহলে চলবে কী করে?
ঘৃণার আগুন জ্বলে ওঠে ভারতীর কালো চোখে। এত বছর পরে স্বামীর সঙ্গে দেখা, একটা কথাও সে বলেনি। ভার্গব কেন তাকে এই লুকোনো আস্তানায় কৌশলে এনে ফেলেছে–তাও জানতে চায়নি। কিন্তু এই মুহূর্তে লোভী মানুষটার কদর্য মন যেন বিবমিষার বিষ ঢেলে দিল তার সারা অঙ্গে।
প্রশান্ত হাসি হাসল ভার্গব বসু, সে ব্যবস্থা করব বলেই এসেছি এখানে, ডেকে এনেছি তোমাকে। ভাস্কর, ভারদ্বাজ আর ভায়োলেট এখন বড় হয়েছে। সব জানে। তোমার স্ত্রী এখন তাদের মা। কিন্তু তোমার ঘর খালি করেছি আমি। তার গুণগার দিয়ে এসেছি মাসে মাসে–
সেই সঙ্গে একটা জঘন্য চিঠি–।
ভায়রার সঙ্গে ঠাট্টা বলেই ওটাকে ধরে নিও। ভারতী নিষ্কলঙ্ক আজও। সন্ন্যাসিনী বলতে পারো। ছেলেমেয়ে ছাড়া কেউ ওর গা ছোঁয়নি এত বছরেও।
