কি নিয়ে থাকবে ভারতী? সন্তান? ভাস্কর তা দিতে পারেনি। ভালোবাসা? ভাস্কর তাও তাকে দেয়নি।
রঙ্গমঞ্চে আবির্ভূত হয়েছিল ভার্গব বসু ঠিক এই সময়ে।
বেথুয়াডহরির জঙ্গলে দাঁড়িয়ে কথা হয়েছিল দুজনের মধ্যে।
মাথায় ছফুট লম্বা যেন সাদা মার্বেল কুঁদে গড়া ভার্গব। দুই চোখে কঠিন হিরে। কণ্ঠস্বরে অশনি সঙ্কেত।
বলেছিল নীরস স্বরে, ভারতী, শুনেছ সব?
মুখ নীচু করে বলেছিল পরমাসুন্দরী ভারতী, হ্যাঁ।
বিষ খেয়ে মরেছে–বেশ করেছে। আগেই মরা উচিত ছিল। কিন্তু ছেলেমানুষ দুটো তো কোনও দোষ করেনি।
কিন্তু তুমি নিজেই তো পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে চর্কিপাক দিয়ে বেড়াচ্ছ সারা ভারতে–ছেলেমেয়ে মানুষ করবে কীভাবে?
আমি তো করব না।
তবে কে করবে?
তুমি।
আমি!
হ্যাঁ, ভারতী, তুমি। তুমি যা চাও, তা কি পেয়েছ ভাস্করের কাছে?
মুখ নীচু করেছিল ভারতী।
পাষাণকণ্ঠে বলে গেছিল ভার্গব, অথচ তোমার ভালোবাসার ভেল্কি থেকেই সৃষ্টির প্রেরণা পেয়েছে ভাস্কর। কি ছিল সে বিয়ের আগে? কপর্দকহীন কারিগর। তুমিই তাকে আইডিয়া দিয়েছ, প্রেরণা দিয়েছ, শক্তি জুগিয়েছ, মূর্তি গড়ার উপাদান কেনা থেকে শুরু করে স্টুডিও জোগাড় করার টাকা পর্যন্ত সব জুটিয়ে দিয়েছে।
তুমিই দিয়েছ–নইলে পেতাম কোথায়?
ভারতী, তার বিনিময়ে আমি তোমাকে চাইছি না। ছেলেমেয়ে তোমার দরকার–নয় কী? বেশ, মুখে না বলো–তোমার মন তা চাইছে, আমি জানি। মাঝে মাঝে আমি আসব–দেখে যাব তাদের–কিন্তু এক-আধ রাতের বেশি থাকতে পারব না। রাজি?
রাজি হয়েছিল ভারতী। সেই মুহূর্তে চলে এসেছিল ভার্গবের সঙ্গে বাড়ি আর ফেরেনি। ভাস্কর তার ঠিকানাও আর খুঁজে পায়নি। মাসে মাসে আসত শুধু মোটা টাকার ডিমান্ড ড্রাফট।
সেই সঙ্গে ভার্গব বসুর নিজের হাতে লেখা একটা চিরকুট।
প্রিয় ভার্যাট,
তোমার নেশার টাকা পাঠালাম। বউকে নিয়ে ভেবো না। আগের জন্মে সে ছিল ভোজরাজার কন্যা, বিক্রমাদিত্যের পত্নী। মায়াবিদ্যায় নিপুণা। তারই ভেল্কিতে তুমি আজ প্রসিদ্ধ ভাস্কর। একই মায়াবিদ্যা দেখিয়ে আমেরিকানের ঔরসে জাত দুই ছেলেমেয়েকে সে নিজের ছেলেমেয়ে করে নিয়েছে। আমি তার নাম দিয়েছি ভানুমতী। আপত্তি নেই তো?
ভার্গব বসু
ডিমান্ড ড্রাফট পেয়ে বড় খুশি হত ভাস্কর প্রতিবার। একই বয়ানের চিঠি পেয়েও অখুশি হত না। কিন্তু তেলেবেগুনে জ্বলে উঠত ভার্যাট সম্বোধনটা পড়ে।
প্রথমটা মানে বুঝতে পারেনি। অভিধান দেখেছিল। মানেটা জানতে পেরে অবধি বিছুটির জ্বালা ধরে যায় হাতে চিঠিখানা পেলেই।
কারণ, ভার্যাট মানে সেই পুরুষ যে স্ত্রীকে বেশ্যাবৃত্তি করায় জীবিকার জন্য।
.
বাড়ি ঠিক করেই রেখেছিল ভার্গব। অজ্ঞাতবাসের জন্যে হিমালয়ের কোলে ছিমছাম সুন্দর কটেজ। দার্জিলিংয়ের উপকণ্ঠে।
ছেলেমেয়েদের ধমনীতে বইছে আমেরিকান রক্ত। মানুষ হোক তারা শীতের দেশে সাহেবী কায়দায়।
ছেলের নাম ভারদ্বাজ। মেয়ের নাম ভায়োলেট।
দুজনেরই চোখে রং নীল। গায়ের লং লালচে। ভারতীয় বলেই মনে হয় না। চুলগুলো পর্যন্ত সোনালি।
ভার্গব ধূমকেতুর মতো মাঝে মাঝে আসত নিরালা এই ডেরায়। কালিংম্পঙের ডক্টর গ্রাহাম হোম থেকে আনিয়ে নিত ছেলেমেয়েদের। দিন দুই হইচই করে আবার উধাও হয়ে যেত মাস কয়েকের জন্যে।
ভানুমতীকে মা আর ভার্গর্বকে বাবা বলত ভারদ্বাজ আর ভায়োলেট। ভানুমতী ভারদ্বাজকে বলত, ভাস্করাচার্য–ভাস্কর হওয়ার প্রতিভা আছে নাকি তার মধ্যে। ভায়োলেটকে বলত ভাস্বতী বড় দীপ্তিশালী, বড় তেজস্বিনী বলে।
ভারতীকে শুধু ভানুমতী নামেই ডাকত না ভার্গব। বলত, অভিনব বিদ্যাটা ভালোই শিখেছ। এক এক সময়ে ইচ্ছে যায় তোমাকে আমার পার্টনার করে নিই।
তাই তো নিয়েছ, সুন্দর চোখে, সুন্দর হেসে বলত ভারতী। সে চোখে হিমালয়ের অপার শান্তি।
অট্টহেসে বলত ভার্গব, দূর! এত হাফ পার্টনারশিপ।
ফুল পার্টনারশিপ দিলেই হয়।
না। তাহলে যে ভার্যাট কথাটা সত্যি হয়ে যাবে। পেয়ে বসবে ভাস্কর।
ও তো আমার জীবনে আর নেই।
না থাকুক। এই পৃথিবীতে তো আছে। কিন্তু ভার্যাট শব্দটার যা মানে, তা হতে দেব না। আমি বলছি অন্য পার্টনারশিপের কথা।
যেমন?
আমার এই কারবারে তোমার অভিনয় বিদ্যেটাকে কাজে লাগাতে পারলে—
ছেলেমেয়েদের তাহলে দেখবে কে?
ভারতীয় সঙ্গে রহস্যময়ী নেফারতিতির তুলনাটা এই কারণেই বারবার মাথায় আসে ইন্দ্রনাথের। আশ্চর্য মেয়ে বটে। প্রহেলিকায় প্রাণবন্ত।
.
বাগানে বসে অনেক দূরের রোপওয়ের ঝুলন্ত কামরার যাতায়াত দেখছিল ভারতী। এমনিতেই দুধে আলতা গোলা তার গায়ের রং। দীর্ঘদিন পাহাড়ী জায়গায় থাকার ফলে গালদুটো এখন টুকটুকে আপেলের মতো রাঙা। দুই চোখ কিন্তু মিশমিশে কালোজামের মতো কালো। একটু ঠাহর করলে কালো চুলের মধ্যে দু-একটা রুপোলি রেখাও আবিষ্কার করা যাবে। কিন্তু যৌবন যেন এখনো তার দেহের তটে তটে ফুঁসে ফুঁসে উঠছে। লাস্যময়ী ললনা সে কোনওকালেই নয়। তার রূপে আগুনের দাহিকাশক্তি নেই, আছে অমৃতবারির স্নিগ্ধতা। হিমালয়ের হাওয়া তাকে আরও অপরূপা এবং বুঝি অনন্তযৌবনা করে তুলেছে।
আশেপাশে কেউ নেই। এই তল্লাটেই কেউ নেই। কটেজ শূন্য। ছেলেমেয়েরা কালিম্পঙের ডক্টর গ্রাহাম হোমে। ভারতী আজ একা। বড় একা। মনের মধ্যে মহাকাশের শূন্যতা। এরকম শূন্যতা তার মনে আগেও এসেছে বহুবার। কিন্তু প্রতিবারই যেন আশ্চর্যভাবে হিমালয় জীবন্ত হয়ে উঠে হাতছানি দিয়ে ডেকেছে তাকে–একা একা বেরিয়ে পড়েছে ভারতী। হিমাচলের হিম হাওয়ার স্নিগ্ধ প্রলেপ বুকের মধ্যে নিয়ে ফিরে এসেছে।
