ইন্দ্রনাথ আর কথা বাড়াল না। সে জানে, তার প্রাণটাকে পিঞ্জরশূন্য করার জন্যে ধরাতলে বহু ব্যক্তি এখনও তৎপর, সে জানে অগণিত মানুষ যেমন তাকে ভালোবাসে, বহু পুরুষ এবং নারী তেমন তার চিতাভস্মের সন্ধান পেলে বড় খুশি হবে। সঙ্গে তাই সবসময়ে রাখে ছোট আগ্নেয়াস্ত্র। প্রতিটি পেশীর বজ্রশক্তিকেও প্রকট করে তুলতে থাকে সব সময়ে। পেশায় এবং নেশায় সে যে গোয়েন্দা–তার বিশ্রাম নেই, তার জীবনের নিশ্চয়তা নেই, মুহূর্তের নিরাপত্তাবোধও নেই।
বোধ হয় এইগুলোর সন্ধানেই এই পর্বতাঞ্চলে আসে বারবার। একা।
কিন্তু ভার্গব বসুকে নির্জন এই অঞ্চলে এভাবে বসে থাকতে দেখে অণুপরমাণুর ওয়ার্নিং বেল বেজে ওঠে নিঃশব্দে। ভার্গব বসু। একদা যে ছিল পুলিশের আতঙ্ক, সাধারণ মানুষের কাছে বিভীষিকা, সমাজের চোখে এক জীবন্ত প্রহেলিকা–আজ সে এই শান্তির অঞ্চলে মূর্তিমান অশান্তির করাল চেহারা নিয়ে উপস্থিত কেন?
দূর থেকেই তাই ছুঁড়ে দেয় বিদ্রূপ-তীক্ষ প্রশ্নবাণ, গাঁজা চরসের স্মাগলিং ধরেছেন নাকি? মিথাকুয়ানল ট্যাবলেটের সঙ্গে পাল্টাপাল্টি ব্যবসাটা অবশ্য ইদানীং ভালোই চলছে এ অঞ্চলে।
ইন্দ্রনাথ রুদ্র, আপনি কি সেই মতলবেই ঘুরঘুর করছেন এখানে? খরখরে হয়ে ওঠে ভার্গব বসুর ঈগল চক্ষু। বিষাণ বেজে ওঠে যেন কণ্ঠে।
গ্রিক স্ট্যাচুর মতো দাঁড়িয়ে রইল ইন্দ্রনাথ। হাওয়ায় উড়তে লাগল গায়ের শাল। চুনোট করা কোঁচার অগ্রভাগ। হিরো সে চিরকাল। সুদর্শন। ব্যক্তিত্বময়। স্থিতধী। অসমসাহসিক।
বলল নিশ্চল দেহে নিষ্কম্প স্বরে, না।
তবে কেন এসেছেন এখানে?
আপনি কেন এসেছেন?
আমি? থমকে গেল ভার্গব বসু। চোখে চোখে চেয়ে রইল অনেকক্ষণ। তারপর গলার স্বর নামিয়ে এনে বললে ভল্যুম কমিয়ে দেওয়া স্টিরিও আওয়াজে, জীবনে বীতশ্রদ্ধ হয়ে। বিশ্বাস হল না? আসুন, বলছি।
.
পাশাপাশি বসে দুজনে এখন। দশ বছর আগেও দুজনে দুজনের অন্বেষণে হন্যে হয়ে ঘুরেছে। আজ বসে দুজনে পাশাপাশি। একটা মাত্র গোল পাথরের ওপর। মাথার ওপর দুলন্ত ত্রিভঙ্গমুরারি ঝাউ। সামনে গভীর খাদ। দূরে তুষারমৌলী হিমালয়। সূর্য যতই দিগন্ত ছাড়িয়ে মাথার ওপর উঠছে, কুয়াশা ততই কেটে যাচ্ছে। পাখির কাকলি আর পাতার সরসরানি ছাড়া কোনও শব্দ নেই।
ইন্দ্রনাথ রুদ্র, দূরের বরফ-ছাওয়া পাহাড়-চুড়োগুলোর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে বলল ভার্গব বসু, আপনি জানেন, অনেক কলঙ্কে ভরা আমার অতীত। আপনি জানেন, একমাত্র শ্যালকের স্ত্রীকে নিয়ে ঘর করতেও আমি দ্বিধা করিনি। লক্ষ লক্ষ টাকা নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছি, কাশ্মীর থেকে মেঘালয় পর্যন্ত পুরো হিমালয় বেল্টে চোরাকারবার করেছি, রাজামহারাজার সঙ্গে বসে মদ খেয়েছি, ধনীর টাকা লুঠ করেছি, গরিবের মেয়ের বিয়ে দিয়েছি। কেন ইন্দ্রনাথবাবু, কেন?
জানি কেন, মৃদু স্বরে বলল ইন্দ্রনাথ, যখন আপনি কপর্দকহীন, যখন আপনি সদ্যবিবাহিত, তখন আপনার সুন্দরী স্ত্রী ঘরছাড়া হয়েছিল এক আমেরিকান টুরিস্টের সঙ্গে। বিয়েও করেছিল অকে। তারপর–
লম্পট আমেরিকান দেহের ক্ষুধা মিটিয়ে চম্পট দেয় আমেরিকায়। তারই একটি ছেলে আর একটি মেয়েকে মানুষ করতে হচ্ছে আমাকে আজও। কারণ, ওদের মা ছিল একটা কাওয়ার্ড। আমার সামনে আর আসতে পারেনি। ছেলেমেয়েদের পাঠিয়ে দিয়ে–
বিষ খেয়েছিল সেই রাতেই।
ভারতীকে কাছে এনে রাখতে হয়েছিল সেই কারণেই।
.
ভারতীর কথা ভাবতেই ইন্দ্রনাথের মনে পড়ে যায় মিশরের আশ্চর্য সুন্দরী নেফারতিতিকে। রিমার্কেল বিউটি ছিল যাঁর, যিনি বিস্ময়ের পর বিস্ময় সৃষ্টি করে সহসা একদা যেন বাতাসে মিলিয়ে গেছিলেন, তার জায়গায় আবির্ভূত হয়েছিল এক পুরুষমুর্তি–মিশর শাসন করেছিল কঠোর হস্তে।
কে এই নবাগত? কেউ জানে না। আজও তা রহস্যাবৃত।
অনুমান, শক্তিময়ী নেফারতিতি নিজেই পুরুষবেশে মিশর শাসন করে গেছিলেন।
কেন? না, ফারাও চতুর্থ আমেনহোটেপ মিশরীয় প্রাচীন দেবদেবীদের ফেলে রেখে সূর্যদেবতা অ্যাটন উপাসনায় মেতে উঠেছিলেন। নীল নদের পাড়ে থিবস নগরীর মন্দির পরিত্যাগ করে রাজধানী সরিয়ে নিয়ে গেছিলেন তিনশো মাইল উত্তরে জনহীন ভূখণ্ড আমারনাতে। সতেরো বছর ছিলেন সেখানে–সূর্যই ছিল তাঁর একমাত্র উপাস্য দেবতা।
সবচেয়ে বিস্ময়কর স্বামী-স্ত্রীর চেহারা। ফারাও ছিলেন কদাকার। নেফারতিতি ছিলেন অসামান্য রূপসী।
এ যুগের নেফারতিতি বলা যায় ভারতীকে। অসাধারণ রূপবতী। কিন্তু স্বামী নির্বাচন করেছিল যাকে, তার মতো কুৎসিত মানুষ বোধ হয় ভূভারতে আর নেই। কুঁজো, কালো, সারা মুখে আর গায়ে বড় বড় আঁচিল। একটা চোখ পাথরের। ভাস্কর তার নাম। পেশাতেও তাই। নেশাও বটে। কৃষ্ণনগরের চুৰ্ণি অঞ্চলে ছোট্ট একটা স্টুডিওতে দিন নেই রাত নেই পাথর খুদে মূর্তির পর মূর্তি গড়ে যেত।
প্রতিটি মূর্তিই অনবদ্য। আশ্চর্য সুন্দর। তারিফ না করে পারা যায় না।
ভারতী ভালোবাসত শিল্পী ভাস্করকে–কদাকার ভাস্করের বাইরের সত্তাটাকে দেখেও দেখেনি সেই কারণেই। কিন্তু আস্তে আস্তে অসহ্য হয়ে উঠেছিল ভাস্করের সান্নিধ্য। শিল্পী ভাস্কর দরিদ্র ছিল না–কিন্তু ছিল অসংযমী! মদ, মেয়েমানুষ এবং জুয়ো–এই তিনটে সর্বনাশা নেশায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল একটু একটু করে।
