আপনি মুক্তপুরুষ। দিল্লিতে একটা বিশেষ দপ্তরের ভার গ্রহণ করবেন?
মাপ করবেন। আমি মুক্ত-ই থাকতে চাই।
* কোলফিল্ড টাইমস পত্রিকায় প্রকাশিত। (শারদীয় সংখ্যা, ১৯৯৪)
ভা রহস্য
কাঞ্জনজঙ্ঘাকে এভাবে সবসময়ে দার্জিলিং থেকে দেখা যায় না। ইন্দ্রনাথ এই প্রথম দার্জিলিং আসেনি। শীতকালটা বরাবর এড়িয়ে যায় অবশ্য–ঠান্ডার ভয়ে। দু-এক বছর অন্তর শৈলনগরীতে যায় পাহাড় আর ঝাউবন দেখতে। ক্লান্ত স্নায়ুকে চাঙ্গা করতে।
প্রতিবার আসে এপ্রিল মাস নাগাদ। প্রিয় হোটেল একটাই আছে। জলাপাহাড়ের দিকে যে রাস্তাটা, যে রাস্তা দিয়ে সকালে আর বিকেলে টুরিস্টরা হই-হই করতে করতে ঘোড়া টগবগিয়ে যাতায়াত করে, সেই রাস্তার পাশেই পড়ে হোটেলটা। ঘোড়ার যাতায়াতের সময়টুকু ছাড়া জায়গাটা খুব নিস্তব্ধ। যে ঘরটায় বরাবর ওঠে, তার তিন দিকে কাঁচের জানলা। খাটে বসেই একদিকে দেখা যায় টাইগার হিলের ওপরে মাইক্রোওয়েভ টাওয়ার, আর একদিকে এভারেস্ট আর অন্যান্য পাহাড়চুড়ো। সামনে পাহাড় আর পাহাড়।
ইন্দ্রনাথ এখানে এলেই অন্যরকম হয়ে যায়। যে ইন্দ্রনাথ রুদ্রকে গোয়েন্দা কাহিনির পাঠকপাঠিকারা চেনে, জানে এবং ভালোবাসে, এ যেন সে ইন্দ্রনাথ নয়। বজ্রকঠিন ইন্দ্রনাথ এখানে এলে যেন ঋষিপ্রতিম হয়ে যায়। যতক্ষণ ঘরে থাকে, ততক্ষণ পাহাড় আর আকাশের দিকে তাকিয়ে কি যে ভাবে আপন মনে, সে ছাড়া কেউ জানে না। যখন বেড়াতে বেরোয়, পাহাড়ের গা বেয়ে নীচে নেমে যায়, কখনো দার্জিলিং ছাড়িয়ে অনেক দূর চলে যায় ঝাউবনের পত্র মর্মর শুনতে শুনতে–তখন যেন আরও বেশি আত্মস্থ, আরও বেশি ধ্যানস্থ, আরও বেশি করে অন্য জগতের মানুষ হয়ে যায়। তার ভেতরকার যে সত্তাটার সন্ধান কেউ পায়নি, দার্জিলিংয়ের মন উদাস করা পরিবেশে এলেই তা ব্যাকুল হয়ে বেরিয়ে আসে বাইরে। রহস্যপ্রেমিক ইন্দ্রনাথ তখন প্রকৃতই উন্মনা হয়ে খোঁজে এমন এক রহস্য-সূত্র যা বিশ্বচরাচরে ব্যাপ্ত অথচ অনাদি অনন্ত সে রহস্যকে অনেকেই আজও বুঝে ওঠেনি।
ভার্গব বসুর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল এই রকমই একটা মুহূর্তে।
জায়গাটা দার্জিলিং থেকে বেশ দুরে। একটা গোল পাথরের ওপর চুপ করে বসে রয়েছে একটা মনুষ্যমূর্তি। মাথার লম্বা চুল পিঠ পর্যন্ত লুটিয়ে পড়েছে। গায়ে তিব্বতী পোশাক। পায়ে পশমের জুতো। হঠাৎ দেখলে তিব্বতী লামা বলেই মনে হয়।
সুদূরের পানে মেলে ধরা ইন্দ্রনাথের চাহনি সহসা আটকে গেছল নিথর নিষ্কম্প মানুষটার ওপর। মাথার ওপর ঝাউগাছটা খুব বেশি হেলে পড়েছে ছাতার মতো–দুলে দুলে যেন সম্মান জানাচ্ছে মানুষটাকে।
সরু পায়ে-চলা পথটা পাথরটার হাত দশেক দূর দিয়ে গেছে। ইন্দ্রনাথই যাচ্ছিল সেখান দিয়ে। হঠাৎ চোখ আটকে গেল অদ্ভুত জায়গায় অদ্ভুতভাবে মানুষটাকে চুপচাপ বসে থাকতে দেখে। অন্যমনস্কভাবে চেয়ে রইল কিছুক্ষণ। পরক্ষণেই উজ্জ্বল হল দুই চোখ। ঝলসে উঠল হীরকদ্যুতি–এই সেই দ্যুতি যার ঝিলিক দেখলেই প্রমাদ গোনে অপরাধী, স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে অপরাধসন্ধানী।
ধারালো ঠোঁটের কোণে ভেসে ওঠে মৃদু হাসি। একটু ব্যঙ্গের, একটু বিস্ময়ের।
কেশে গলা সাফ করে নিয়ে ডাকল ধীর-গম্ভীর গলায়, ভার্গববাবু!…ভার্গব বসু!
নড়ে উঠল নিথর মূর্তি। পাথরের ওপর পাথরের স্ট্যাচুর মধ্যে বুঝি প্রাণের স্পন্দন দেখা গেল। আস্তে আস্তে ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল ইন্দ্রনাথের পানে।
ধবধবে সাদা মুখের চামড়া কুঁচকে গেছে। জোড়া ভুরুর নীচে চোখ দুটো এতক্ষণ স্তিমিত ছিল। ইন্দ্রনাথের পানে কিছুক্ষণ চেয়ে থাকার পরেই তা নক্ষত্ৰকুচির মতো চিকমিকে হয়ে উঠল। বললে শান্ত গলায়, ইন্দ্রনাথ রুদ্র।…অনেক দিন পরে দেখা। কেমন আছেন?
ভালো। আপনি এখানে?
সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিলে না ভার্গব বসু। মৃদু হাওয়ায় মাথার লম্বা চুল উড়ে এসে পড়ল কপালে, চোখে-মুখে। হাত দিয়ে সরানোর চেষ্টাও করল না।
তারপর বললে আসুন। পাশে বসুন। বলছি।
নড়ল না ইন্দ্রনাথ। বলল বাঁকা সুরে, সঙ্গে ছুরি নেই তো? অথবা রিভলভার? সেই রিভলভারটা–যার একটা গুলিতে নাম লিখে দিয়েছেন আমার হার্ট ফুটো করবেন বলে?
আশ্চর্য হাসি হাসল ভার্গব বসু। ঝকঝকে সাদা দাঁতে রোদ্দুর ঝিলিক তুলে গেল নিমেষের জন্যে। ঝিলিক দেখা গেল তারকা উজ্জ্বল দুই চোখেও।
বলল ভরাট গলায়, ইন্দ্রনাথ রুদ্র, আমার বয়স ষাট পেরিয়েছে। রক্তের নেশাও বিদায় নিয়েছে।
টাকার নেশা? মদের নেশা? পরস্ত্রীর নেশা?
প্রত্যেকটা প্রশ্ন যেন ব্লোপাইপ থেকে নির্ভুল লক্ষ্যে ছোট ছোট তীরের মতো ছুঁড়ে ছুঁড়ে মারল ইন্দ্রনাথ। প্রত্যেকটা তীর গিয়ে বিধল যথাস্থানে। মানুষটার মনের মধ্যে। তাই বুঝি ঝকঝকে হাসিটা ম্লান হল সামান্য। ঈষৎ নিষ্প্রভ হল ঝিকিমিকি চাহনি। ধবধবে সাদা সুন্দর মুখটার ওপর দিয়ে যেন চাপা বেদনার ঢেউ ভেসে গেল চকিতের জন্যে।
বলল একই রকম ভরাট মাদল-বাজনের সুরে, ইন্দ্রনাথ রুদ্র, আর কেউ না জানলেও আপনি তো জানেন, সব মানুষের মনের মধ্যেই সু আর কু দুটো প্রবৃত্তি আছে। কু প্রবৃত্তি মাথা চাড়া দিলে সে সমাজের চোখে অপরাধী। আর সু প্রবৃত্তি যখন ঠেলে ওঠে, তখন সে
আপনার ভেতরে তাহলে এখন–
সু ছাড়া কু আর নেই। পাশে এসে বসুন, ইন্দ্রনাথবাবু। অনেক কথা আছে।
