মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই দু-হাট হয়ে গেল দরজা।
ঘর অন্ধকার। করিডরের আলো পৌঁছচ্ছে না ঘরের ভেতরে।
ইন্দ্রনাথ ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল দারোয়ানকে, টর্চ বা হ্যারিকেন–যা হয় কিছু নিয়ে এসো।
সুইচ টিপব? ঘরেই তো আলো আছে। বললে দারোয়ান।
যা বলছি তাই করো।
সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেল দারোয়ান।
ইন্দ্র বললে, ওকে সরিয়ে দিলাম। ঘরে ঢোকবার আগে, আলো জ্বলবার আগে একটা জিনিস জেনে নিই। আপনি এখানে এসেছিলেন আমার কাছে যাওয়ার আগে?
দুপুরে এসেছিলাম। ফিরে যাই বালিগঞ্জে। সেখান থেকে গেছি আপনার কাছে।
ঠিক। দুপুর থেকেই দরজা বন্ধ করে বসে আছেন কন্যাকুমারিকা। দিনের আলোয় আলো জ্বালানোর দরকার হয়নি। এখনও আমাদের ডাকে আলো জ্বালাননি-দরজা ভেঙে কথা বলে যাচ্ছি, উঠেও এলেন না। মানে বুঝছেন?
রাম ভট্টাচার্যর গ্রানাইট মুখাবয়বে ভাবান্তর নেই কিন্তু বুঝি ঈষৎ নিষ্প্রদীপ হল সদাপ্রদীপ্ত দুই চক্ষু।
আর কথা না বলে অন্ধকার ঘরে দেওয়াল হাতড়ে সুইচ টিপে দিল ইন্দ্রনাথ।
ঘরে এখন আলো ঝলমল করছে। টেবিলে মাথা রেখে বসে রয়েছে কন্যাকুমারিকা। অস্বাভাবিকভাবে একটা হাত ঝুলছে চেয়ারের পাশে। লাল টেলিফোন রয়েছে ভাঁজ করা বাঁহাতের কাছে।
ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল ইন্দ্রনাথ। ছিটকিনি ভেঙেছে, কিন্তু খিল অটুট রয়েছে। তুলে দিল খিল।
টেবিলের ওপর কন্যাকুমারিকার মাথার কাছে একটা সাদা খাম। ওপরে সবুজ কালিতে লেখা বিখ্যাত এক প্রকাশকের নাম আর ঠিকানা।
খামের কোণ ধরে তুলে ঘুরিয়ে পেছন দিক দেখল ইন্দ্রনাথ। নামিয়ে রেখে টেবিলের ওপর থেকে তুলে নিল এক টাকার বেশ কয়েকটা ডাকটিকিট। গান্ধীজির ছবি ছাপা ডাকটিকিট।
বললে, ছিল কুড়িটা ডাকটিকিট–এখন রয়েছে উনিশটা। একটা নিশ্চয় ছিঁড়েছিলেন কন্যাকুমারিকা। কিন্তু খামে লাগাননি! হেঁট হয়ে দেখল মেঝে, কুড়িয়ে নিল একটা ডাকটিকিট। এইটা ছিঁড়েছিলেন, খামে লাগাবেন বলেই। তার আগেই মন ঘুরে গেল সুইসাইড করলেন।
সুইসাইড! মৃদুস্বরে বললেন রাম ভট্টাচার্য, আমার সঙ্গে ঝগড়া হওয়ার পরেই?
হ্যাঁ, আপনার সঙ্গে ঝগড়া হওয়ার পরেই। ছিটকিনি তুলে দিয়ে চিঠি লিখলেন। খামের মুখ বন্ধ করলেন। ডাকটিকিট ছিড়লেন। তার পরেই সুইসাইড করলেন–ডাকটিকিট খসে পড়ল মেঝেতে। স্ট্রেঞ্জ!
স্ট্রেঞ্জ কেন বলছেন?
ওঁর অভ্যেস তো জিভ বুলিয়ে ডাকটিকিট ভিজোনো। তাই না?
হ্যাঁ।
ডাকটিকিটে নিশ্চয় জিভ বুলিয়েছিলেন?
মনে তো হয়।
হা বুলিয়েছিলেন। এই দেখুন পেছনটা। আঠা-ভাবটা তেমন নেই–যেন জল লেগেছিল। ফোরেনসিক রিপোর্টেই জানা যাবে, জিভের লালা কন্যাকুমারিকার।জানা যাবে আর একটা জিনিস, বলতে-বলতে উনিশটা ডাকটিকিটের পাত তুলে নিল ইন্দ্রনাথ।–চোখ কুঁচকে দেখল পেছনের আঠার দিক।
বললে, বাদামি রঙের কী যেন লেগে রয়েছে, তাই না?
তাই তো দেখছি।
এই উনিশটা ডাকটিকিট আর এই খসে-পড়া ডাকটিকিট কি আমি নিয়ে যাব?
কোথায়?
ফোরেনসিক টেস্ট করার জন্যে।
কেন?
আমার অনুমান, এতে লাগানো রয়েছে পটাসিয়াম সায়ানাইড।
কন্যাকুমারিকা–
না, তিনি লাগাননি। ডাকটিকিটে জিভ বুলোনার অভ্যেস আছে কন্যাকুমারিকার, একথা যিনি জানতেন, তিনি লাগিয়ে রেখে গেছিলেন আজ দুপুরবেলা। তার অপূর্ব বাগ্মিতা দিয়ে খেপিয়ে দিয়ে গেছিলেন যাতে তিনি চলে যাওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে প্রকাশককে চিঠি লিখতে বসেন কন্যাকুমারিকা। কিন্তু বিরাট এই প্রতিভা আমার মতোন ক্ষুদ্র ব্রেনের শরণ নিলেন কেন, সেটা বুঝলাম না।
ইন্দ্রনাথবাবু, আপনি যে এত লাইটনিং স্পিডে অ্যাকশন নেন, আমার তা জানা ছিল না। মন্দ্রমন্থর কণ্ঠস্বরে বলে গেলেন রাম ভট্টাচার্যরাত দশটায় আপনার কাছে যাওয়ার কারণ একটা– যাতে আপনার অ্যাকশন শুরু হয় পরের দিন সকালে আমি তখন দিল্লির পথে–আকাশে। আজ আপনার বাড়ি থেকে বেরিয়ে কন্যাকুমারিকার এই ঘরে আসতাম কারণ আমি জানতাম, সে আর বেঁচে নেই আপনার বাড়ি যাওয়ার আগে ফোন করেছি কন্যাকুমারিকা বেঁচে থাকলে টেলিফোন ধরত–তাই নিশ্চিন্ত হয়ে আপনার কাছে এসেছিলাম। এ ঘরে এসে দরজা ভেঙে আগে ডাকটিকিটগুলো সরাতাম–তারপর দারোয়ানকে দিয়ে পুলিশে খবর দেওয়াতাম–তাকে শিখিয়ে যেতাম–আমি যে এত রাতে এসেছি কাউকে যেন না বলে। কাল সকালে শুরু হত তদন্ত। সরকারি তদন্ত একটু এগিয়েই ধামাচাপা পড়ে যেত। নিছক আত্মহত্যা–পটাসিয়াম সায়ানাইডের জন্যে। তখন আপনার টনক নড়লেও আত্মহত্যা ছাড়া আর কিছুই ভাবতে পারতেন না–ষড়যন্ত্রের চাপে এরকম আত্মহত্যা অনেকেই করে।–যাক সে কথা, আগেই কথা দিয়েছেন, এ-কেস যদি টেক-আপ নাও করেন–মুখ খুলবেন না।
আপনার শরণ নিয়েছিলাম কেন? পাপ চেপে রাখবার ক্ষমতা নেই বলে। হালকা হয়েছিলাম আপনার কাছে গিয়ে। আপনি সব জেনেও অপরাধী কে, তা জানতে পারতেন না। কিন্তু জেনেই যখন ফেলেছেন, তখন ডাকটিকিটগুলো ফিরিয়ে দিন। ওদের কাজ ফুরিয়েছে। দেশ রক্ষে পেয়েছে।
নিন। কিন্তু স্মৃতিচারণের পাণ্ডুলিপি?
যে ব্যাঙ্কলকারে আছে, তা সীজ করা হবে। তারপর…।
বুঝেছি। দারোয়ানকে বলে দিন, পুলিশে খবর দিতে কিন্তু পুলিশকে যেন না বলে যে আমরা দুজন এসেছিলাম আজ রাতে।
বলে দিচ্ছি। ইন্দ্রনাথবাবু, একটা অনুরোধ করব? স্ব
চ্ছন্দে।
