চকিতে পেছন ফিরে হতচকিত গজাননের হাত থেকে পেনসিল টর্চ ছিনিয়ে নিয়েছিল রামভেটকি সুরকিওয়ালা, স্পিকারে ততক্ষণে কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গেছে।
থ্রি..টু…ওয়ান… ।
জিরো বলার আগেই ত্রিশূল বলে চেঁচিয়ে উঠেছিল রামভেটকি, সেইসঙ্গে একটা সংস্কৃত মন্ত্র উচ্চারণ করেছিল। খুবই জটিল এবং খটমট মন্ত্র। কিন্তু কীভাবে জানা নেই, গজাননের গজ মস্তিষ্কে তা অক্ষরে অক্ষরে গেঁথে গেছিল।
ঐন্দ্রীকুলিশপাতেন শততো দৈত্যদানবাঃ।
পেতুর্বিদারিতাঃ পৃথাং রুধিরৌঘ প্রবার্ষিণঃ।
ব্যস, অমনি লাল আলো গেল মিলিয়ে, তার আগেই রোমাঞ্চিত কলেবরে গজানন প্রত্যক্ষ করে নিয়েছিল, সারি-সারি নলগুলোও অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে ফোকরগুলোর মধ্যে।
ভয়ের চোটে যে গা ঘামে, তা সেদিন হাড়ে-হাড়ে উপলব্ধি করেছিল গজানন। কপালের ঘাম মুছতে-মুছতে কাষ্ঠ হেসে জিগ্যেস করেছিল রামভেটকিকে, ওটা কীসের মন্ত্র, বস্?
চণ্ডীপাঠ করলাম। প্রতিবার শ্লোক পালটায়। মুখস্থ করেও লাভ নেই। ইডিয়ট। আর আলো জ্বালাবেন না।
না, আর আলো জ্বালায়নি গজানন। শুধু তখনই মাথার চুল খামচে ধরে ঘিলু নাড়ানোর চেষ্টা করে ধাতস্থ হয়েছিল এবং তারপরেই দেখেছিল, পরের পর অদৃশ্য আলো জ্বলছে আপনা থেকেই করিডর বেয়ে এগোনোর সঙ্গে-সঙ্গে। সুবোধ অনুচরের মতো রামভেটকির পেছনে-পেছনে যেতে-যেতে দেখেছিল দু-পাশে সারি-সারি দরজায় সংস্কৃত অক্ষরে একটা করে লাইন লেখা রয়েছে। গজানন আবার সংস্কৃত পড়েনি। কোনও ল্যাঙ্গুয়েজই ভালোভাবে পড়েনি, সংস্কৃত বয়কট করেছিল বাল্যকালেই। তাই মানে বুঝতে পারেনি। কিন্তু রামভেটকি টোলের পণ্ডিতের মতো প্রতিটি নামের ওপর চোখ বুলিয়ে বিড়বিড় করে পড়তে-পড়তে সহসা থমকে দাঁড়াল একটা দরজার সামনে। পাল্লায় হাত বুলিয়ে অদৃশ্য কোনও বোতামে চাপ দিল বোধহয়–নিঃশব্দে পাল্লা সরে গেল পাশে।
আলো ঝলমল ঘরের মধ্যে দেখা গেল…
.
পুরো ঘরটাই খুব সম্ভব অ্যালুমিনিয়াম জাতীয় ধাতুর প্লেট দিয়ে মোড়া। এমন কিছু পেল্লাই ঘর নয়। লম্বায় চওড়ায় বড় জোর দশ ফুট। ঠান্ডা কনকনে ঘর। মনে হল যেন এইমাত্র ফ্রিজের পাল্লা খোলা হল। ভেতরে পা দিতেই গজাননের হাড় পর্যন্ত কেঁপে উঠল শুধু ঠান্ডায় নয়, টেবিলের ওপর রাখা বস্তুটি দেখে।
একটাই মাত্র টেবিল ঘরের ঠিক মাঝখানে। চকচকে স্টেনলেশ স্টিলের। তার ওপর শায়িত বস্তুটাকে এখন বস্তুই বলা উচিত, কেননা, যার মধ্যে প্রাণের নাচানাচি নেই, তাকে বস্তু বলাই সঙ্গ
এই যে বস্তুটা জিরো জিরো গজাননের হাড় পর্যন্ত কালিয়ে দিল, এর হাত-পা-বুক-পেট অবিকল মানুষের মতোই। কিন্তু মানুষ নামক প্রাণীটার মুণ্ডু বলেও একটা জিনিস থাকে ধড়ের আগায়–এর তা নেই।
শুধু নেই বললে কম বলা হবে, মুন্ডু যেখানে থাকবার কথা, সেখানে রয়েছে কাটা নখের মতো একফালি চোয়াল আর চিবুক। মুখের ওপর দিকটা অবিশ্বাস্যভাবে গোল করে কেটে নেওয়া হয়েছে। চোয়ালের আর চিবুকের হাড় মাখনের মতো যেন কেটে গেছে শল্যচিকিৎসকের ছুরিতে। কিন্তু এক ফোঁটা রক্ত নেই। চুঁইয়েও পড়েনি। ক্ষত মুখ বেমালুম জুড়ে গেছে।
পেটের মধ্যে গুলতানি শুরু হয়েছে টের পেল গজানন। এরকম তো কখনও হয় না। বেলেঘাট্টাই গজানন মুন্ডুহীন ধড় অনেক দেখেছে, নীলরতন সরকার মেডিক্যাল হাসপাতালের মর্গে উঁকি মেরে দেখেছে কবন্ধ দেহ (ফুটবল পেটানোর ফাঁকে-ফাঁকে), কিন্তু মানুষের মুন্ডু নিয়ে এরকম বিচ্ছিরি কারবার কখনও দেখেনি।
চিত্রার্পিত, মানে, ছবির মতোন দাঁড়িয়ে থাকা গজাননের পাশে এসে দাঁড়িয়ে রামভেটকি বললে, এই হচ্ছে অবতার সিং।
ঢোক গিলে গজানন বললে, কালী কালী… (গজানন সার্বজনীন কালী পুজোর বিরাট পাণ্ডা ছিল এককালে)–অবতার সিং বলে চিনব কী করে?
আপনি জীবনে দেখে থাকলে তো চিনবেন। আমরা দেখেছিলাম। এখন চিনেছি ফিঙ্গারপ্রিন্ট মিলিয়ে দেখে।
অবতার সিং!
আধ কলসি জল কঁকুনি দিলে যেরকম আওয়াজ হয়, প্রায় সেই ধরনের একটা আওয়াজ বেরোল রামভেটকির গলা দিয়ে। হাসি না হাহাকার ঠিক বোঝা গেল না।
বললে, না, অবতার সিং নন।
চমকে উঠল গজানন। এত জোরে পাশের দিকে মুন্ডু ঘোরাল যে কঁকড়া চুল চোখে মুখে এসে পড়ল।
বললে স্থলিত স্বরে, একবার বলছেন অবতার সিং, আবার বলছেন অবতার সিং নন। মানে…মানেটা কী?
মাই ডিয়ার ডিয়ার গজানন, হুঁশিয়ার হতে হয় এ লাইনে গোড়া থেকেই। অবতার সিং অদৃশ্য হয়ে যেতে পারেন, এই আশঙ্কায় আমরা নকল অবতার সিংকে বাজারে ছেড়ে রেখেছিলাম– আসল অবতার সিং এখন বহাল তবিয়তে আছেন আমাদের গোপন আস্তানায়।
আসল নকল। গজানন ঈষৎ বিমূঢ়।
ইয়েস, ইয়েস, মাই—
নিককে পেলেন কোত্থেকে?
যমজ ভাই অবতার সিং-এর।
কালী! কালী!
জিরো জিরো গজানন,–অকস্মাৎ কঠিন হয়ে ওঠে রামভেটকির স্বর, এ কাজ নিতে পারবেন?
মুন্ডুকাটাদের ঠিকানা বার করতে হবে?
হ্যাঁ। এভাবে মুন্ডু উড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা কারা ঘটাতে পারে, তারা কোন দেশের মানুষ। কীভাবে ঘটায়–সব জানতে হবে। দেশের স্বার্থে।
দেশের স্বার্থে; প্রতিধ্বনি করল গজানন। কানের মধ্যে অনুরণিত হল ডাঃ বক্সীর উপদেশ, দেশের স্বার্থে প্রতিভাকে কাজে লাগাবে গজানন, মস্তানিতে নয়।
জীবন যায় যাক, নৃশংস হত্যাকারীকে দরকার হলে হত্যাও করতে হতে পারে।
