রাষ্ট্রের বহু সিক্রেট কন্যাকুমারিকার কাছে বলেছিলাম। আমেরিকা, রাশিয়া, ইংল্যান্ড, জাপান, জার্মানি কার সঙ্গে কখন কী কথা বলেছি রঙ্গচ্ছলে গল্প করে যেতাম। আমার জীবনে একমাত্র সঙ্গিনী সে, আমার জীবনকে গড়ে দিয়েছে–তাকে ছাড়া বলব কাকে? যদিও সেসব গুহ্য কথা কারও জানবার কথা নয়। সে কিন্তু অনেকদিন ধরেই লিখতে শুরু করেছিল তার আত্মজীবনী। কলকাতায় এসে তাকে সঙ্গ দিতে গিয়ে দেখেছিলাম তাকে লেখার নেশায় ধরেছে। সবুজ কালির দোয়াতে কলম ডুবিয়ে লিখত, আর গালে হাত দিয়ে জানলা দিয়ে বাগানের গাছপালার দিকে চেয়ে থাকত–যে বাগানে কেটেছে আমাদের দুজনের কৈশোর। চিঠির পর চিঠি লিখত–ডাকটিকিটে জিভ বুলিয়ে খামে সাঁটত বরাবরের অভ্যেস। আমি ঠাট্টা করে ইদানীং বলতাম, তুমি কি তসলিমা নাসরিন হওয়ার স্বপ্ন দেখছ?–ও হেসে বলত, তুমি যদি দেশের জন্যে জীবন দিতে পারো, আমি কেন পারব না?
স্মৃতিচারণ লেখা যে তখন থেকেই শুরু করেছিল, আমার জানা ছিল না। পরপর কয়েকটা কাজে ইন্ডিয়ার বাইরে কাটিয়ে দিল্লি ফিরেই ওর তিনটে চিঠি পেলাম। মাথা ঘুরে গেল। কন্যাকুমারিকা আমার কাছে একশো কোটি টাকা চেয়েছে।
কলকাতায় এলাম। শুনলাম ওর সর্বস্বান্ত হওয়ার কথা। ভেড়ি লুঠ হওয়ার পর থেকেই কপাল পুড়তে থাকে। বিষয়জ্ঞান না থাকার ফলে প্রতারকদের খপ্পড়ে পড়ে অস্থাবর সম্পত্তি সবই বাঁধা পড়েছে। চিট ফান্ড করে টাকা তুলতে গিয়ে পুলিশকে দোরগোড়ায় এনে ফেলেছে। একশো কোটি পেলে সবদিক বাঁচবে।
একশো কোটি কেন, একশো টাকারও এদিক-ওদিকে করেনি রাম ভট্টাচার্য–সেটাই সেদিন তাকে জানিয়েছিলাম। অন্য কীভাবে তার সমস্যা মিটোনো যায়, তাই নিয়ে ভাবতে বলেছিলাম। ও গোঁ ছাড়েনি। সব শেষে জানিয়েছে, যে স্মৃতিচারণটা লিখে রেখে দিয়েছে সেটা কিনে নিতে চেয়েছে। এক পাবলিশার বাংলা থেকে হিন্দি আর ইংরেজি তর্জমাও তারা করে নেবে। তারা হয়তো লাখ কয়েক টাকার মুনাফা লুটবে কিন্তু রাম ভট্টাচার্যর হাজার-হাজার কোটি টাকার মসনদ ধুলোয় গড়িয়ে যাবেরাম ভট্টাচার্য যে নিখাদ সোনা নয়–এই বই হবে তার ডকুমেন্ট।
লেখবার টেবিলে বসেই কন্যাকুমারিকা হেসে-হেসে বলে গেল সব কথা। একটা চিঠি সাদা খামের মধ্যে ভরা ছিল। জিভ বুলিয়ে তার মুখ জুড়ে এক টাকার ডাকটিকিটও লাগাল জিভে ঠেকিয়ে। বললে–পাবলিশারকে জানিয়ে দিলাম, আর এক মাসের মধ্যে রেডি হবে পাণ্ডুলিপি। পাবলিশারের নামটা দেখে রাখো।
গোটা পৃথিবী জুড়ে ব্যবসা রয়েছে বিশেষ সেই প্রকাশকের।
বুঝলাম, ঠিক এক মাস সময় পেলাম। একশো কোটি টাকা বের করে দিতে হবে আমাকে। অসৎ পথে নামতেই হবে।
দিল্লি ফিরে যাওয়ার পথে প্লেনে বসে খটকা লাগল–এ ধরনের অসৎ পরিকল্পনা কন্যাকুমারিকার মাথায় এল কী করে? এ তো সাংঘাতিক সফিসটিকেটেড ব্ল্যাকমেল। কাকপক্ষীও জানবে না এত বড় একটা ক্রাইমের খবর। অথচ রাষ্ট্রশক্তি দুর্বল হবে, দেশের লোক প্রতারিত হবে। হর্ষৎ মেটার সঙ্গে আমার কোনও প্রভেদ থাকবে না।
ইনটেলিজেন্স খবর এনে দিল লাইটনিং স্পিডে। কন্যাকুমারিকা যে কুপথগামিনী হয়েছে, রাতের অভিসারিকা হয়েছে, রাষ্ট্রের শত্রুদের অঙ্কশায়িনী হয়েছে তা জানলাম এই সার্ভিসের মারফৎ।
তাই এসেছি আপনার কাছে। ব্ল্যাকমেলারকে আমি ভালোবাসিতার ক্ষতি করতে চাই না–অথচ নিজে বাঁচতে চাই, দেশকে বাঁচাতে চাই। ইন্দ্রনাথবাবু, কী করব?
ইন্দ্রনাথ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললে, রাত ঠিক বারোটা। চরিত্রহীনা কন্যাকুমারিকা নিশ্চয়ই এখন জেগে আছেন। ফোন করুন।
রাম ভট্টাচার্যর মুখ শক্ত হয়ে গেল–না।
নাম্বারটা বলুন। আমি করছি।
কেন?
পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ইন্দ্রনাথ বললে, কথায় সব হয়। আমি তার সঙ্গে কথা বলব। দরকার হলে আজ রাতেই দেখা করব। কূটনীতিতে আপনার কাছে আমি শিশু। কিন্তু একটা সহজ কৌশল বারেবারে কাজ দিয়েছে–সেই কৌশলটা প্রয়োগ করব।
কী কৌশল?
টু ক্রিয়েট এ বিগার প্রবলেম। আপনার সামনে যে প্রবলেম তুলে ধরেছেন কন্যাকুমারিকা– তার চাইতেও বড় প্রবলেম তৈরি করব কন্যাকুমারিকার জীবনে।
সেটা কী প্রবলেম?
এই প্রথম আপনার চোখের পাতা কাঁপতে দেখলাম। কারণ, আপনি তাকে ভালোবাসেন, ঘৃণাও করেন। আর শুনতে চাইবেন না। আমার ওপর ছেড়ে দিন। নাম্বারটা কী?
থ্রি ফাইভ জিরো…।
ডায়াল করল ইন্দ্রনাথ। রিং হয়ে গেল। বার বার তিনবার। উঠে দাঁড়াল সোফা ছেড়ে। বললে, চলুন।
কোথায়?
কন্যাকুমারিকার বাড়ি।
আমি যাব? এত রাতে?
আপনার মুখ দেখিয়ে দরজা খোলাব–আমি গেলে সেটা হবে না। চলুন।
লোহার ফটক ধরে নাড়া দিতেই গুমটি ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিল দারোয়ান। রাম ভট্টাচার্যকে দেখে ভীষণ অবাক হয়ে বলেছিল, কী হল দাদাবাবু?
দিদিমণি ঘুমোচ্ছে নাকি?
নাতো। সেই যে দুপুরে আপনি চলে গেলেন–ঘর বন্ধ করে বসে রয়েছে। কত ডাকলাম– সাড়া দিল না। খাবার ঢাকা দিয়ে রেখেছি।
ইন্দ্রনাথ বললে, নিয়ে চলো সেই ঘরে।
.
চারতলা। বাগানের দিকের ঘরটার দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। দারোয়ানের ডাকে সাড়া মিলল না। রাম ভট্টাচার্যের অনুরোধও বিফলে গেল।
ইন্দ্র বললে, সাবেকি বাড়ি। ভেতরে নিশ্চয়ই খিল অথবা ছিটকিনি তোলা রয়েছে। চাড় মারলেই ভেঙে যাবে।
