ইন্দ্র বলে, চিঠিতে ব্ল্যাকমেল করছে?
হ্যাঁ। এক্সিকিউটিভ বন্ড পেপারের মোটা সাদা খাম দেখলেই আজকাল আমার গা ঘিনঘিন করতে থাকে। বিশেষ করে সেই খামে যখন সবুজ কালি দিয়ে লেখা থাকে আমার নাম–অতিশয় চেনা হাতের লেখা–একটা সময় যখন এই হাতের লেখা দেখবার জন্যে পাগল হয়ে থাকতাম আর এখন? বুক গুড়গুড় করে।
আপনার?
হাসলেন ভদ্রলোক। সীমিত হাস্য। যান্ত্রিক হাসিও বলা যায়। মনের হালকা রসকে প্রকাশ করবার এই ক্ষমতা ঈশ্বর দিয়েছেন শুধু মানুষকে। কিন্তু এই মানুষটার সেন্টিমিটার দিয়ে মাপা ক্ষীণ হাসিতে হালকা রস প্রকাশ পেল না–নিঃসীম তিক্ততা ছাড়া সেখানে কিছুই নেই।
বললেন, আমি অকুতোভয় সব্বাই তা জানে। কিন্তু আমার মনেও ভয়ের সঞ্চার করতে পেরেছে কন্যাকুমারিকা।
তার নাম?
হ্যাঁ। ইন্দ্রনাথবাবু, আমার অতীত পাঁচজনকে বলবার মতোন নয়। কামারপুকুরের পাশে বিশ বিঘে জমির মালিক ছিলেন আমার দাদু। ভট্টচাজ্যি বামুন। যজমান ছিল, গরু-লাঙ্গলও ছিল। আমার ছয় পিসি, বাবারা চার ভাই। আমার বাবা সবচেয়ে বড়। তিনি কলকাতার একটা জুটমিলে ক্যান্টিন সুপারভাইজার ছিলেন। দুই ছেলে থাকত তার কাছে কলকাতায়। আমি আর আমার মেজোভাই থাকতাম দাদু-দিদিমার কাছে। বাবা মাসে-মাসে টাকা পাঠিয়ে দিতেন। দাদু-দিদিমা তখন খুব ভালোবাসতেন আমাকে। জুটমিল বন্ধ হয়ে যেতেই বাবা আর মা দুই ভাইকে নিয়ে চলে গেলেন দেশে। অত্যাচার শুরু হল আমার ওপর। দশটা গরু দেখতে হবে, যজমানদের দেখতে হবে, বাড়ির ঠাকুরঘরগুলোর দেখাশুনো করতে হবে–তারপর যদি সময় থাকে স্কুলের পড়াশুনো করতে পারব। তাই করেছিলাম রাত তিনটেয় উঠে সব কাজ সেরে পড়তে যেতাম। অঙ্ক পরীক্ষার আগে তিনদিন একটু বেশি তৈরি হতে চেয়েছিলাম। ছোটকাকা কোনও কাজ করত না। তাকে বলেছিলাম–এই তিনটে দিন তুমি সামলাও। সে আমাকে যাচ্ছেতাই বলে বেরিয়ে গেল বাজারে আড্ডা মারতে। দাদু আর দিদিমাকে বলতে গেলাম–তেনারা রেগে গেলেন। সব শেষের কথা, কাজ না করলে বাড়ি থেকে বিদেয় হও–পড়াশুনো গোল্লায় যাক।
ইন্দ্রনাথবাবু, পরের দিন ভোর ছটা পাঁচের ট্রেনে কলকাতা রওনা হলাম। শিয়াখালায় টিকিট চাইতেই স্টেশনে নেমে পড়লাম। তখন মনে পড়ল, এখানে একজন কালীসাধক জ্যোতিষী থাকেন। তিনি শুধু মুখ দেখে ভবিষ্যৎ বলে যান। চলে গেলাম তার ডেরায়। তিনি মন্দির থেকে পুজো শেষ করে বেরচ্ছিলেন। চৌকাঠে পা রেখেই আমাকে দেখলেন। দেখেই বললেন, যা, যা, তুই অনেক বড় হবি। শিগগিরই একটা মেয়ের পাল্লায় পড়বি–সে তোকে অনেকদূর নিয়ে যাবে।
সেই মেয়েই এই কন্যাকুমারিকা। জ্যোতিষীর ওখান থেকে শিয়াখালা স্টেশনে চলে এসেছিলাম। আমার দূর-সম্পর্কের এক দাদু দাঁড়িয়েছিলেন কলকাতায় যাবেন বলে। তিনিই আমাকে নিয়ে এসে ফেললেন এই বেলেঘাটায়। তখন এই অঞ্চলের এত রমরমা ছিল না। সুভাষ সরোবর ছিল না। বাইপাস ছিল না। শুধু ভেড়ি আর জঙ্গল। জোড়ামন্দিরের উলটোদিকে মসজিদের সামনেও এত দোকান ছিল না। ওইখানে একটা রঙের কারখানায় দারোয়ানের কাজ পেলাম। একটা বিরাট বাগানঘেরা পাথরের মূর্তি দিয়ে সাজানো চারতলা বাড়িতে রঙের কাজ চলছিল। তখনকার আমলে চারতলা বাড়ি যাদের থাকত, তারা কত বড়লোক হত বুঝতেই পারছেন। এদের ছিল ভেড়ির কারবার। এই বাড়িতে রং নিয়ে যেতাম। মিস্ত্রিদের কাজের তদারকি করতাম। আলাপ হল কন্যাকুমারিকার সঙ্গে। বাড়ির একমাত্র মেয়ে। একমাত্র সন্তানও বটে। বড় আদুরে। খামখেয়ালি। দাদুর চোখের মণি। তার ইচ্ছেতেই চলে এলাম বড় বাড়িতে। তার ইচ্ছেতেই মাস্টারের কাছে নতুন করে পড়াশুনা শুরু করলাম। এক অদৃশ্য শক্তি যেন আমাকে ধাপে-ধাপে তুলে নিয়ে গেল শিক্ষাদীক্ষার শিখরে। আজকের রাম ভট্টাচার্য তাই চিরকাল ঋণী থাকবে কন্যাকুমারিকার কাছে।
বাড়ির পেছনে তিন বিঘে বাগানে পুকুর ছিল, বড়-বড় গাছ ছিল। আমরা সেখানে খেলা করেছি। তখনি অনেক বাড়াবাড়ি করেছিলাম। বড় বাড়িতে যা হয়। কিন্তু সবই গোপনে।
কন্যাকুমারিকার চাপেই বিলেত গেছিলাম। ফিরে এলাম ব্যারিস্টার হয়ে, শুরু করলাম রাজনীতি। কলকাতার পাট চুকে গেছিল–দিল্লিতেই ঘাঁটি গাড়তে হয়েছিল। বিবেকানন্দই আমার জীবনে প্রথম আদর্শ। তাই সারা ভারতকে নিজের দেশ বলে ভেবেছিলাম। তাই ভারতের সবাই আমাকে নিজের লোক মনে করেন। আপনি তা জানেন।
কন্যাকুমারিকা সেই কারণেই বলেছিল, কলকাতায় এলে তুমি আর এ-বাড়িতে উঠবে না। বালিগঞ্জে তোমাদের ডেরায় থাকবে। মাঝে-মাঝে সঙ্গ দিয়ে যাবে আমাকে।
কন্যাকুমারিকা বিয়ে করেনি। আমারই মতোন। বিয়ে-থার কথাও কোনওদিন আমাকে বলেনি। বললেও রাজি হতাম না। কারণ, ওই বন্ধন আমাকে মানায় না। সময় কম, কাজ বেশি। সবই দেশের কাজ। স্ত্রী-র জন্যে সময় আমার নেই।
কন্যাকুমারিকার মা-বাবা ছেলেবেলাতেই মারা গেছিলেন। দাদু মারা যান আমি বিলেতে থাকবার সময়ে। বিষয়সম্পত্তির চাপে কন্যাকুমারিকা সংসারী হওয়ার স্বপ্ন ছেড়ে দেয়। সবই আমাকে চিঠি লিখে জানাত। যা জানায়নি, তা জেনেছি অনেক পরে।
কৈশোরেই যে শরীর নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে পারে, যৌবনে সে সন্ন্যাসিনী হয়ে যাবে না– এটা আমার ভাবা উচিত ছিল। যার হাতে টাকা, তার পারিষদবর্গের অভাব হয় না। কন্যাকুমারিকা একাধারে হয়েছিল চরিত্রহীনা আর উড়নচণ্ড। কলকাতায় এসে মাঝে-মাঝে যখন তাকে সঙ্গ দিয়ে যেতাম, স্বাভাবিকভাবেই সে মেয়েলি কৌতূহলে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে আমার গোপনতম কথাও জেনেছে। কৈশোরের সেই চাপল্য আর দেখায়নি। আমি তার এই পরিবর্তন দেখে একটু অবাক হয়েছিলাম। ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করতে পারিনি সে দেউলে হতে বসেছে। দেনা যত বেড়েছে, রূপ আর যৌবনকে ততই উজাড় করে দিয়েছে কলকাতার ধনীদের পায়ে। সংক্ষেপে, সে ভদ্র-বারবনিতা হয়ে গেছে।
