ব্ল্যাকমেল
বলুন, আমি ইন্দ্রনাথ রুদ্র বলছি।
নমস্কার। আমার নামটা টেলিফোনে বলতে চাই না। কিন্তু দেখলেই চিনবেন।
দেখা করতে চান?
হ্যাঁ। আজ রাত দশটায়। যখন আপনি একা থাকবেন। বিষয়টা অত্যন্ত গোপনীয়। আমার কেস যদি টেক-আপ না-ও করেন, আপনি ছাড়া কেউ আর তা জানবে না–এই শর্তে যদি রাজি থাকেন, তাহলে আসব।
আসুন।
আমি নিজে গাড়ি ড্রাইভ করে যাব। সাদা অ্যামবাসাডর। সব কাঁচ তোলা থাকবে। আপনি কাইন্ডলি গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকবেন। আশপাশে যখন কেউ থাকবে না, আমি গাড়ি থেকে নেমে আপনার বাড়ি ঢুকব।
তাই হবে।
লাস্ট রিকোয়েস্ট। অফেন্ডেড হবেন না। আপনার প্রফেশনাল ইথি-এর ওপর আমার বিশ্বাস আছে বলেই আপনার শরণাপন্ন হচ্ছি।
বুঝেছি। ঘরে টেপ রেকর্ডার জাতীয় কোনও বাগিং ডিভাইস যেন না থাকে–এই তো?
অস্ফুট হাসি ভেসে এল তারের মধ্যে দিয়ে। তারপরেই রিসিভার নামিয়ে রাখার আওয়াজ।
রাত ঠিক দশটায় সাদা অ্যামবাসাডর ব্রেক কষল সুভাষ সরোবরের পাশে একতলা বাড়ির সামনে। গাড়ির সব কাঁচ তোলা। ধোঁয়াটে ফিল্ম লাগানো বলে স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে না চালককে।
ইন্দ্রনাথ ডাইনে-বাঁয়ে দেখে নিল। কেউ নেই। এ সময়ে সুভাষ সরোবর বলতে গেলে ফাঁকাই থাকে। এগিয়ে গেল গাড়ির দরজার সামনে।
খুলে গেল দরজা। সাদা ধুতি পাঞ্জাবি পরা মধ্যবয়স্ক নাতিদীর্ঘ ভদ্রলোক নেমে এসেই ইন্দ্রনাথের পাশ দিয়ে গেট পেরিয়ে দাওয়ায় উঠে, ঢুকে গেলেন ঘরের মধ্যে।
গেট বন্ধ করে দিয়ে ইন্দ্রনাথ ঢুকল তারপর। দরজা বন্ধ করে দিয়ে ঘুরে দাঁড়াল রাতের অতিথির দিকে।
মাথার ওপর ইলেকট্রিক বাল্ব জ্বলছে। ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে আছেন ঠিক তার নিচে। মাথায় বড় জোর পাঁচ ফুট। না-রোগা না-মোটা। বয়স পঞ্চাশ থেকে পঞ্চান্নর মধ্যে। সে অনুপাতে মাথার চুল বেশ পেকেছে। কপালের ওপর থেকে চুল উঠে গেছে। উঁচু চওড়া কপাল আরও চওড়া হয়েছে। বাঁদিকে সিঁথি। বেশি পেকেছে জুলপির চুল এবং অস্বাভাবিকভাবে চোয়ালের হাড় চাপা দিয়ে ঝুলছে ঘাড় পর্যন্ত। দাড়িগোঁফ নিখুঁতভাবে কামানো। ভুরুর লম্বা-লম্বা চুল কখনও উঁচিয়ে রয়েছে, কখনও ঝুলে পড়েছে। নাক সিধে আর শক্ত। ঠোঁট চাপা আর কঠিন। লম্বা জুলপির আড়ালে চোয়ালের হাড়ও যে বিলক্ষণ কঠোর, তা আন্দাজ করে নেওয়া যায় গ্রানাইট মুখাবয়ব আর প্রদীপ্ত চোখ দেখলে। এঁর এই চোখ আর এই জুলপি কার্টুনিস্টদের কাজ অনেক সহজ করে দিয়েছে। ছোটখাট মানুষটার শক্ত ধাতকে ফুটিয়ে তুলতে বেগ পেতে হয় না। পার্লামেন্টে অথবা জনসভায় ইনি যখন উঠে দাঁড়ান থমথমে নৈঃশব্দ্য নেমে আসে চারপাশে। এমনই এঁর ব্যক্তিত্ব আর বাগ্মিতা। প্রজ্ঞা আর পাণ্ডিত্য।
কিংবদন্তিসম সেই সম্মোহনী চাহনি ইন্দ্রনাথের ওপর নিবদ্ধ, রেশমমসৃণ কণ্ঠস্বরে তিনি বললেন, ইন্দ্ৰনাথবাবু, আমি যে বিপদে পড়েছি, তার সমাধান আমার ব্ল্যাককোট কমান্ডোরা করতে পারবে না। কারণ আমাকে ব্ল্যাকমেল করছে একটি মেয়ে যাকে নিয়ে এক সময়ে আমি মাতামাতি করেছিলাম–একটু বেশিমাত্রায় করেছিলাম–বুঝতেই পারছেন কী বলতে চাইছি–এর বেশি বলা সমীচীন নয়–আজ আমি নিষ্কলঙ্ক চরিত্র বলেই ইন্ডিয়ার হাল ধরতে পেরেছি–আমার ইন্টারন্যাশনাল ইমেজ অতিশয় উজ্জ্বল–গোটা ইন্ডিয়ার ফিউচার নির্ভর করছে আমার নীতি নির্ধারণের ওপর। কিন্তু এই মেয়েটি যদি তার স্মৃতিচারণ ছেপে বের করে দেয়, তাহলে সবাই জানবে, আমার ভেতরেও দুর্নীতি আছে, আমি চরিত্রহীন, দেশের ভার আমার হাতে রেখে দেওয়া নিরাপদ নয়। আমি তো ডুববই, নেক্সট ইলেকশনে আমার পার্টিও মুছে যেতে পারে।
ইন্দ্রনাথ বললে, বসুন। পা
শাপাশি বসল দুজনে। একই সোফায়।
ভদ্রলোক বললেন, আমি ডিকেটটিভ গল্প পড়তে ভালোবাসি ছেলেবেলা থেকেই। আপনার কাহিনি অনেক পড়েছি। অনেক উঁচুতে উঠে গেছি বলে, আর দরকার হয়নি বলে, আপনার সঙ্গে আলাপ হয়নি। আজ আমি হাতে অনেক সময় নিয়ে এসেছি কাল ভোরের ফ্লাইটে দিল্লি ফিরে যাব। দরকার হলে সারারাত আপনার সঙ্গে গল্প করব। তাতে আমার টেনশন কাটবে। টেনশনের শিখরে যাঁরা বসে থাকেন, টেনশন তাঁদের চোখেমুখে প্রকাশ পায় না। কণ্ঠস্বরে তো নয়ই। কণ্ঠস্বরে তো নয়ই। ইন্দ্ৰনাথ শুধু চেয়ে রইল।
তিনি বললেন, কোনান ডয়ালের চার্লস অগাস্টাস মিলভারটন আপনি পড়েছেন, আমিও পড়েছি। ব্ল্যাকমেলার মিলভারটন-এর গল্পটা প্রথম ছেপে বেরয় কোলিয়ার্স ম্যাগাজিনে–১৯০৪ সালে। জানেন? তারিখটা ইন্টারেস্টিং। কেননা, ব্ল্যাকমেলাররা তাদের ক্রাইম অবাধে চালিয়ে গেছে। সমাজে–সবই ধামাচাপা পড়েছে। শার্লক হোমস ওয়াটসনকে বলেছিলেন, চিড়িয়াখানার মাপের খাঁচার সামনে দাঁড়িয়ে কিলবিলে, হড়হড়ে, পিচ্ছিল, ক্লেদাক্ত প্রাণীগুলোর কালো মৃত্যুর মতো চকচকে চোখ আর কুটিল, চ্যাপ্টা মুখের দিকে তাকালে তোমার গা শিরশির করে না? আপাদমস্তক রি রি করে ওঠে না অপরিসীম ঘৃণায়? সারাজীবনে পঞ্চাশজন খুনির সঙ্গে বুদ্ধির পাঞ্জা লড়েছি আমি, কিন্তু ওদের মধ্যে সবচেয়ে বদ লোকটার নাম শুনলেও আমার এতটা ঘৃণা আর বিদ্বেষ জাগে না, যতটা হয়, এই লোকটার নাম শুনলে। ওর ছায়া মাড়াবার প্রবৃত্তিও আমার নেই। ইন্দ্রনাথবাবু, শার্লক হোমসের কথার প্রতিধ্বনি করে বলতে ইচ্ছে করছে, এই মেয়েটার হাতে লেখা চিঠি দেখলেও আমার গা শিরশির করে ওঠে।
