অস্ট্রিয়ানদের দর্শনবাদ হল নিজে বাঁচো এবং অপরকে বাঁচতে দাও। এই ধরনের জীবনদর্শনের ওপরে ওদের শ্রদ্ধা ছিল যথেষ্ট। তাই পোডারজের ব্যাপারে নাক গলাতে চাইল না ওরা। বিশেষ করে সে যখন প্রতিশ্রুতি দিলে সে ইটালি চলে যাবে, তখন এ নিয়ে তারা আর মাথা ঘামাতে চাইল না।
এই পরিস্থিতিতে আমি ভেবে দেখলাম মাত্র একটি পন্থায় মুঠোর মধ্যে আনা যায় পোডারজেকে। আমেরিকান গভর্নমেন্টকে চাপ দিতে হবে, তারাই যেন পোডারজেকে বিদেশ থেকে স্বদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করে। আমার লোকের হাতে রিপোর্ট পাঠালাম ওয়াশিংটনে। অ্যাগনেস টাফভারসন আমেরিকান মহিলা। তাকে ঘিরে যে রহস্য গড়ে উঠেছে, তা তো আর উপেক্ষা করা যায় না। পোডারজেকে জোর করে নিউইয়র্কে ফিরিয়ে আনতে গেলে যে কলাকৌশলের প্রয়োজন, তা পাওয়া গেল নিউইয়র্কের এফ বি আই (ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন) এবং ইমিগ্রেশন ডিপার্টমেন্ট থেকে। ১৯৩৩ সালে আমেরিকান মাটিতে পা দিয়ে একটা ফর্মের ওপর, ক্যাপ্টেন লিখেছিল, সে নাকি অবিবাহিত। আমেরিকায় পা দেওয়ার অনুমতি লাভ করতে গেলে এ ফর্মে সবাইকেই সই করতে হয়। কিন্তু মার্গারিটের সঙ্গে তার আগেই বিয়ে হয়েছিল। দরখাস্তে লেখা প্রতিটি কথাই যে সত্য সে বিষয়ে শপথ করার পরেই আমেরিকায় প্রবেশাধিকার পেয়ে ছিল সে। কাজেই, মিথ্যা শপথের দায়ে আইনের রক্তচক্ষু এবার এসে পড়ল তার ওপরে।
১৯৩৪ সালের দোসরা আগস্ট–মিথ্যা শপথের অভিযোগে পোডারজেকে অভিযুক্ত করল নিউইয়র্ক গ্র্যান্ড জুরি এবং রায় দিল তাকে স্বদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হোক। ফলে, পোডারজেকে আনা হল ভিয়েনার এক আদালতে। কিন্তু বাচ্চাতুরিতে ওস্তাদ পোডারজে সেখানে কোমল হৃদয় জুরিদের মন ভিজিয়ে দিলে এই বলে যে, স্রেফ ষড়যন্ত্র করে তাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে আমেরিকায়। আমেরিকা থেকে তাকে পাঠানো হবে যুগোশ্লাভিয়ায় এবং দেশদ্রোহীতার অপরাধে গুলি চালিয়ে খতম করে দেওয়া হবে তাকে। শুনে সমবেদনায় ভরে উঠল জুরিদের অন্তর। ওকে আমেরিকা পাঠাতে রাজি হল না তারা।
আরও কতকগুলো টেলিগ্রাম আসা-যাওয়া করল বেলগ্রেড আর নিউইয়র্কের মধ্যে। শেষ পর্যন্ত দুটো বিবাহের অভিযোগ আনল নিউইয়র্ক পুলিশ পোডারজের বিরুদ্ধে। এবার আর বেঁকে বসল না অস্ট্রিয়ান কোর্ট। হুকুম বেরিয়ে গেল পোডারজেকে স্বদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার।
এ কাহিনি প্রথমেই বলেছি আমি, পোডারজে-তদন্ত আমার কর্মজীবনের প্রথম কে। যদিও এর চাইতে কঠোর পরিশ্রম আর কোনও তরুণ গোয়েন্দা ইতিপূর্বে কখনও করেনি, তবুও সেদিন আমার শিকারকে সামান্যের ওপর দিয়ে বেরিয়ে যেতে দেখে শুকনো হাসি ছাড়া আর কোনও ভাবই ফোটেনি আমার চোখে-মুখে। যে-কোনও খুনির পক্ষে ওই শাস্তি সত্যিই লঘু–অত্যন্ত লঘু। আমি ভিয়েনা ছেড়ে চলে আসার সময়ে তখনও ও ওখানকার কারাগারেই ছিল। বেশ একটু মুষড়ে গিয়ে রওনা হলাম বেলগ্রেডের দিকে। যে দায়িত্ব আমাকে দেওয়া হয়েছিল–যতদূর সম্ভব আমি তা পালন করেছি। আর কিছুই করণীয় ছিল না আমার।
নিউইয়র্কে নিয়ে যাওয়া হল পোডারজেকে। পরে শুনেছিলাম, এই ধরনের সামান্য অভিযোগের সম্মুখীন হয়ে বিন্দুমাত্র বিচলিত হয়নি ও। ঠোঁটের কোণে চিরকেলে মিষ্টি হাসিটি ঝুলিয়ে দিব্বি হাসিখুশি মেজাজ নিয়ে নিউইয়র্কে পৌঁছোয় ও। তার পরেই একটা টেলিগ্রাম পাঠায় মার্গারিটকে–এবার একটা অলৌকিক কাণ্ড ঘটবে।
১৯৩৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে দুই বিবাহের অভিযোগ আনা হল তার বিরুদ্ধে। অভিযোগ স্বীকার করে নিলে সে। তবে নিজের অপরাধ লঘু করার প্রচেষ্টায় শুধু এইটুকুই সে বলছিল–অ্যাগনেস টাফভারসনই নাকি বিয়ের জন্যে পীড়াপীড়ি করেছিল তাকে। এ জাতীয় অপরাধে সবচেয়ে গুরুদণ্ড যা, অর্থাৎ আড়াই থেকে পাঁচ বছর শ্রীঘর বাস, পোরজের ক্ষেত্রে তারই বিধান দেওয়া হল। অবার্ন কারাগারে শুরু হল তার শাস্তির মেয়াদ। অন্যান্য কয়েদিদের সঙ্গে মোটামুটি মানিয়ে নিয়েছিল ও। তবে একজন ওকে দু-চক্ষে দেখতে পারত না। একদিন দারুণ মারপিট হয়ে গেল দুজনের মধ্যে। ওয়ার্ডাররা এসে পৌঁছোনোর আগেই একটা চোখ আর আটটা দাঁত হারাল পোডারজে।
উনিশ মাস কারাগার বাসের পর একটা লম্বা চিঠি লিখল ও ক্যাপ্টেন স্টাইনকে। ক্যাপ্টেন স্টাইন সে সময়ে নিরুদ্দেশ ব্যক্তিদের ব্যুরোতে ছিলেন। পোডারজে লিখল, খালাস পাওয়ার পর কর্তৃপক্ষ যদি তাকে ইউরোপে ফিরিয়ে না দেয়, তাহলে অ্যাগনেস টাফভারসনকে জীবন্ত ফিরিয়ে এনে দেবে সে। এ প্রস্তাবের কোনও উত্তর তার কাছে পাঠানো হয়নি। কারণটা খুবই সোজা। বহুদিন আগেই যে পরলোকের পথে যাত্রা করেছে অ্যাগনেস, এ বিষয়ে দৃঢ়বিশ্বাস জন্মে গেছিল কর্তৃপক্ষর। অ্যাগনেসের পরিবারবর্গের মনেও তার মৃত্যু সম্বন্ধে আর কোনও সন্দেহ ছিল না। আটলান্টিকের জলেই স্থান পেয়েছে হতভাগিনীর দেহ।
১৯৪০ সালের পয়সা ফেব্রুয়ারি জেলের বাইরে এসে দাঁড়াল পোডারজে। এতদিন পাথর ভেঙেও কিন্তু এতটুকু চিড় ধরেনি ওর গ্র্যানাইট কঠিন আত্মবিশ্বাসে। নষ্ট চোখের জায়গায় একটা কৃত্রিম চোখ বসিয়ে নিয়েছিল। মনোক্স দিয়ে সযত্নে নকল চোখটা ঢেকে রাখত। পরে ওকে যুগোশ্লাভিয়ায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। নাৎসিরা যুগোশ্লাভিয়া আক্রমণ করলে যুদ্ধের বন্যায় সে-ও গা ভাসিয়ে দেয়। তারপর অনেক বছর অতীত হয়েছে। আর তার কোনও খবর পাওয়া যায়নি। যদি সে মারাই গিয়ে থাকে তাহলে অ্যাগনেস টাফভারসনের শেষ কয়েক ঘণ্টার রহস্যের মৃত্যু ঘটেছে সেইসঙ্গে…। * জোসেফ জাগেব্রোভি (যুগোশ্লাভিয়া)–রচিত কাহিনি অবলম্বনে।
