দিন কয়েক পরেই ফিরে এলাম পোডারজের আস্তানায়। নিউইয়র্কের পুলিশ আর মিনিস্টারের পাঠানো টেলিগ্রামগুলো আমার হাতেই ছিল। ক্যাপ্টেন আর তার বউকে দলিলগুলো দেখালাম।
ফ্যাকাশে হয়ে গেল মার্গারিট। মিসেসের মুখ দেখে অনুনয়ের সুরে গোরজে বলে উঠল–এতে কি আসে যায়, মার্গারিট? তুমি তো সবই জানো। আমেরিকায় মেয়েগুলো এমনই নির্লজ্জ বেহায়া যে ওকে বিয়ে না করে পারিনি আমি। সাময়িক শান্তিলাভের জন্যেই বিয়েটা হয়েছিল। আমি যে বিবাহিত, সে তা জানত। কাজেই আমার আর কোনও উপায় ছিল না। ডার্লিং তুমি বিশ্বাস করো–
কিন্তু কেউই বিশ্বাস করতে পারল না ওকে। মার্গারিট তো নয়ই আমিও না।
এরপর কিন্তু আমাদের কাছে সে সবকিছুই অস্বীকার করে বসল এমন কি বিয়েটাও।
২০শে ডিসেম্বর জাহাজে ওঠার জন্যে আমরা প্রস্তুত। এমন সময়ে জেটির ওপরেই ঝগড়া হয়ে গেল ওর সঙ্গে। রক্ষিতা স্ত্রী হিসেবে আমার সঙ্গে সাগর পাড়ি দিতে চাইল না অ্যাগনেস। চাপ দিতে লাগল আনুষ্ঠানিক বিয়ের জন্যে। কিন্তু আমার পক্ষে তা সম্ভব ছিল না। কাজেই আমার সঙ্গ ত্যাগ করে চলে গেল ও। প্রথমে বলেছিল, সেই রাতেই একলা সাগর পাড়ি দেবে সে। কিন্তু ফ্ল্যাটে ফিরে আসার পরেই মনট্রিয়াল অভিমুখে রওনা হয়ে যায় সে। কথা দিয়ে গেছিল ফোন করবে। কিন্তু তা করেনি। কথা দিয়ে গেছিল লন্ডনে আমার সঙ্গে তার দেখা হবে। কিন্তু এ প্রতিশ্রুতিও সে রাখেনি। জেটির ওপর সেই ঝগড়াঝাটির পর থেকে আজ পর্যন্ত তার ছায়াটুকুও দেখিনি আমি।
জোর গলায় পোডারজে বলতে লাগল, তার এই বিয়ের ব্যাপারটা নাকি ডাহা মিথ্যে আর সাজানো ব্যাপার। ধাক্কা দিয়ে তাকে যুগোশ্লাভিয়ার মাটিতে টেনে নিয়ে যাওয়ার জঘন্য চক্রান্ত। আরও বললে–অস্ট্রিয়ায় আমি রাজনৈতিক আশ্রয়ের সুযোগ সুবিধে পাচ্ছি। বেলগ্রেডের উদ্বাস্তু আমি। কাজেই স্বদেশের মাটিতে আইনের মারপ্যাঁচ দেখিয়ে আমাকে টেনে নিয়ে যাওয়া চলবে না।
খানাতল্লাসি হল ওর বাড়িতে। কিন্তু কোনওরকম টেনেটুনে দোষারোপ করার মতো আবছা কোনও প্রমাণের চিহ্নও পেলাম না সেখানে। নিউইয়র্কেও ঘটল সেই কাণ্ড। অ্যাগনেস-নিধন (যদিও তা নিছক সন্দেহ) আর তদন্তের শুরু–এই দুইয়ের মাঝে রয়েছে বিপুল সময়ের ব্যবধান। অলিম্পিকের কেবিনটাও পরীক্ষা করা হল। কিন্তু ফলাফল হল সেই একই। পোডারজে সেখানে কয়েক রাত থাকার পর অসংখ্যবার ধোয়া মোছা হয়ে গেছে সে কেবিন। কাজেই সূত্র-টুর আর কোনও বালাই ছিল না সেখানে।
যতদূর জানা গেল, অ্যাগনেস টাফভারসনের অন্তর্ধান রহস্যের তিমিরে আলোকপাত করার মতো একটি সূত্রেরও আর অস্তিত্ব ছিল না এই দীর্ঘ কটি মাস পরে। এ রহস্যের উত্তর যে পোডারজে জানে, সে বিষয়েও আমাদের মনে তিলমাত্র সন্দেহ ছিল না। কিন্তু সে-যে তাকে খুন করেছে, তা প্রমাণ করা কোনওমতেই সম্ভব ছিল না আমাদের পক্ষে। আদালতে এ কেস উঠলেই সাক্ষ্য প্রমাণাদির দরকার হবে–নিছক অনুমান নিয়ে তো কাউকে ফাঁসিকাঠে লটকানো যায় না। সন্দেহের বশে কাউকে খুনি সাব্যস্ত করা যায় না–সে সন্দেহ যতই জোরালো আর ভয়ঙ্কর হোক না কেন। কাজেই পোরজের গায়ে আঁচড় কাটার ক্ষমতাও আমাদের রইল না।
ভিয়েনাতেও পোডারজেকে গ্রেপ্তার করা গেল না। তার কারণ, যতদূর জানা গেছিল, অস্ট্রিয়ায় কোনও বেআইনি কাজ ও করেনি। বিদেশ থেকে স্বদেশের মাটিতে তাকে আনার আয়োজন করা মানেই একটা বিলক্ষণ সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। আর সে সময়ে ও রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করলেই তো আমরা নিরুপায়।
ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে ভিয়েনায় বসে আলোচনা চলল আমাদের মধ্যে। আলোচনার বিষয় একমেবাদ্বিতীয় এবং তা হল, লাশটাকে ও সরিয়েছে কি উপায়ে। থিওরির অভাব ছিল না। কিন্তু আইনের ঠেকা দিয়ে কোনওটিকেই খাড়া করা যাচ্ছিল না।
সম্ভবত নিউইয়র্কের ফ্ল্যাটে–অ্যাগনেসের লাশ টুকরো টুকরো করে কাটার পর বাড়ির চুল্লিতে ফেলে তা ছাই করে ফেলা হয়েছে। লাশ উধাও করার এইটাই কিন্তু সবচেয়ে সহজ উপায়। আর সম্ভাব্য থিওরি হল। পোড়ারজে হয়তো মারাত্মক ডোজের ঘুমের বড়ি খাইয়ে দিয়েছিল অ্যাগনেসকে। তারপর ওর আস্ত দেহটাকে অথবা টুকরো টুকরো দেহটাকে ট্রাঙ্কের মধ্যে ঠেসে নিয়ে গেছিল অলিম্পিকের কেবিনে। সাধারণত ফার্স্ট ক্লাসেই সাগর পাড়ি দিত ক্যাপ্টেন কিন্তু অলিম্পিকে সি ডেকের কেবিন নিতে গেল কেন সে? দশ ডলার দামের দাড়ি কামানোর ব্লেড, ঘুমের বড়ি আর মুখে মাখার ক্রিমই বা কিনল কেন?
আমার মতে লাশটাকে পাচার করার সবচেয়ে ভালো পন্থা যা তা হল এই : টুকরো টুকরো করে লাশটাকে ও কেটেছিল। তারপর আটলান্টিক মহাসাগর পেরনোর সময়ে এক একটা টুকরো ও ছুঁড়ে দিয়েছে জলের মধ্যে। অর্থাৎ সারা জনপথটায় সমানে ভোজ দিয়েছে মাংসভুক মাছেদের। ভিয়েনায় পোরজে কতখানি নিরাপদে রয়েছে তা ওর অজানা নয়। অস্ট্রিয়ার কর্তৃপক্ষকে ও জানাল, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ওকে যুগোশ্লাভিয়ায় নিয়ে যাওয়ার জন্যেই সাজানো হয়েছে টাফভারসন কেসটা এবং সমস্ত ব্যাপারটা একটা বিরাট ষড়যন্ত্র ছাড়া আর কিছুই নয়। আরও একটু জুড়ে দিলে সেই সঙ্গে–সে নাকি রাজতন্ত্রের শাসন-বিরোধী। কিন্তু ইটালি আর জার্মানির ডিকটেটরশিপ শাসনব্যবস্থায় তার পূর্ণ সমর্থন আছে। আর তাই…।
