কীভাবে তুমি টাকা রোজগার করে এনে দাও আমাকে। এন্তার টাকা জমিয়ে যাও–যে-কোনও পন্থায় প্রচুর টাকা রোজগার করে এনে দাও আমাকে। সে টাকা কীভাবে আসছে, তা নিয়ে আমার মাথা ঘামানোর দরকার নেই। যে চালে আমরা চলতে চাই, সে চালে চলার মতো যথেষ্ট অর্থ পেলেই আমার হল।
লন্ডনে পোডারজে এসে পৌঁছেলে স্বমূর্তি ধারণ করলো মার্গারিট। অ্যাগনেসের জড়োয়া গয়নাগুলো নতুন ডিজাইনে বানিয়ে নেওয়া হল। পোশাকগুলোও নতুন করে কেটে সেলাই করা হল মার্গারেটের গায়ের মাপে। নিপাত্তা মহিলার ২৫০০০ ডলারেরও আর কোনও সন্ধান পাওয়া গেল না।
অ্যাগনেসের আত্মীয়স্বজনরা জানত স্বামীর সঙ্গেই ২০ ডিসেম্বর হামবুর্গ রওনা হয়েছে অ্যাগনেস। কয়েক হপ্তা পরে লন্ডন থেকে মনট্রিয়লে স্যালি টাফভারসনের কাছে একটা টেলিগ্রাম এসে পৌঁছোল?
এখানকার আবহাওয়া ভালো লাগছে না। ভারতবর্ষের দিকে চলেছি। পরে চিঠি লিখব। অ্যাগনেস।
তিন মাস পরে ১৯৩৪ সালের এপ্রিলের শেষাশেষি ভারতবর্ষ বা পৃথিবীর কোনও দেশ থেকে কোনও খবর এসে পৌঁছোল না পরিবারবর্গের কাছে। মহা চিন্তায় পড়লেন স্যালি টাফভারসন। না ভেবেচিন্তে তো কোনও কাজ করার অভ্যেস নেই অ্যাগনেসের। বুদ্ধি বিবেচনাও ওর প্রচুর। বোনেদের মধ্যে বয়েসে সবচেয়ে বড় বলে স্যালির সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতাটা একটু বেশি। আর তাই এরকম চুপচাপ থাকাটা তো অ্যাগনেসের পক্ষে শোভা পায় না।
নিউইয়র্কে এসে পৌঁছোলেন স্যালি টাফভারসন। দেখা করলেন নিরুদ্দেশ ব্যক্তিদের পুলিশ ব্যুরোর প্রধান ক্যাপ্টেন জন জে আয়ারস-এর সঙ্গে।
নেহাতই ছেলেমানুষি বলে মনে হয় তাই নয়? দেহ-মনে পরিপূর্ণতা লাভ করেছে যে মেয়েটি, আইনবি হিসেবেও সুনাম কিনেছে যে, সে কিনা হঠ করে বিয়ে করে বসল একজন বিদেশিকে এবং তার পরেই পা বাড়াল দেশের বাইরে। সে যাই হোক, কিন্তু এই চুপচাপ থাকাটাই যে বেজায় ভাবিয়ে তুলেছে আমায়। তিন মাস একটা খবর নেই, অদ্ভুত নয় কি? ওদেরকে খুঁজে বার করার কোনও উপায় কি নেই? ক্যাপ্টেন আয়ারকে শুধিয়েছিলেন স্যালি।
এই সাক্ষাৎকারের ফলেই বেলগ্রেডে একটা টেলিগ্রাম এসে পৌঁছোল আমাদের দপ্তরে। আইডান পোরজের কুলজি জানাতে হবে। টেলিগ্রাম পেয়েই পোডারজের ক্রিমিন্যাল রেকর্ডের খুঁটিনাটি পাঠিয়ে দিলাম আমরা। সেই সঙ্গে প্রস্তাব করলাম তদন্তে সাহায্য করার জন্যে এখান থেকে কাউকে পাঠালে ভালো হয় না কি? দীর্ঘদিন ধরে যার সন্ধানে আমরা ঘুরছি, তাকে তো আমাদেরও গ্রেপ্তার করা চাই।
আর, এইভাবেই শুরু হল একটি মানুষের পেছনে দীর্ঘদিন ধরে যাওয়ার পালা। গেলাম নিউইয়র্কে। গেলাম পৃথিবীর আরও অনেক দেশে। দেশে দেশে ঘুরেছি একটি মাত্র লক্ষ্যকে সামনে রেখে, যেভাবেই হোক জালে ফেলতে হবে পোডারজেকে। কিন্তু খুবই অল্প সংখ্যায় আসতে লাগল সূত্রগুলো। তারপর নিউইয়র্ক ত্যাগ করার সময় ঘনিয়ে এল রওনা হলাম ফ্রান্স অভিমুখে। প্যারীতে পৌঁছে গেলাম ইন্টারপোল-এর (ইন্টারন্যাশনাল পুলিশ অরগ্যানাইজেশন) অফিসে। সঙ্গে সঙ্গে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বেরিয়ে গেল ছদ্ম ক্যাপ্টেনের নামে।
কিন্তু অত্যন্ত তুখোর আর সাপের মতোই পিচ্ছিল সে। শেষকালে একটা খবর পেলাম। ভিয়েনায় মিস্টার এবং মিসেস পোডারজে নামে এক দম্পতিকে দেখা গেছে। প্রেমবুভুক্ষু হতভাগিনী মরণ-ফঁদে পা দিয়েছিল এই ভিয়েনা শহরেই। আর জানা গেল, ক্যাপ্টেন আর তার স্ত্রী নাকি বেজায় ফুর্তিতে আছে। শহরের প্রান্তে বহাল তবিয়তেই দিন কাটছে দুজনের। হামেশাই দেখা যাচ্ছে দুটিকে।
ভিয়েনা শহরটা বরাবরই ভালো লাগে আমার। তাই এ শহরে যাওয়ার সুযোগ পেয়ে খুশিই হলাম। শহরে পৌঁছোনোর পর দেখলাম মিসেস পোডারজে মেয়েটি অ্যাগনেস নয়, মার্গারিট–ধুরন্ধর শিরোমণির আসল বউ। এ তথ্য আবিষ্কার করার পর কিন্তু মোটেই অবাক হইনি আমি।
দুপাশে দুজন অস্ট্রিয়ান গোয়েন্দাকে নিয়ে দেখা করলাম পোডারজের সঙ্গে। ভয় পাওয়া তো দূরের কথা, ঘাবড়ে গিয়ে আমতা আমতা করার কোনও লক্ষণই দেখলাম না তার কথাবার্তায়।
মোলায়েম স্বরে আমার প্রশ্নের উত্তরে ও বললে–অ্যাগনেস টাফভারসানকে চিনি বইকি। ভারি চমৎকার মহিলা। তাঁর কিছু উপকার করতে পেরে আমি নিজেও আনন্দ পেয়েছিলাম। লন্ডনে থাকার সময়ে তাঁর জন্যে কিছু টাকাও খরচ করেছিলাম।
বিয়ে করেননি অ্যাগনেসকে? প্রশ্নটা করলাম ফরাসি ভাষায় যাতে মার্গারেটের বুঝতে অসুবিধা না হয়।
মার্গারিটের মুখচ্ছবি দেখে স্পষ্ট বুঝলাম বিয়ে সম্পর্কে বিন্দুবিসর্গ খবর রাখে না সে। ভাবলাম দেখা যাক নিজের পাতা ফাঁদ থেকে কী করে এবার বেরোয় বাছাধন।
মিস টাফভারসনকে বিয়ে? হাসালেন যা হোক। তাঁকে যে ভালো করে চিনিই না আমি। নিউইয়র্কে বিয়ে করেছিলাম? না, না, যত সব গাঁজাখুরি গল্প শুরু করেছেন দেখছি। গ্রীষ্মের অবকাশে প্যারী গিয়ে তাঁর সঙ্গে কয়েকটা দিন বেশ আনন্দেই কেটেছিল। এখন তিনি ভারতবর্ষে রয়েছেন। এছাড়া তাঁর সম্বন্ধে আর কোনও খবরই রাখি না আমি। তাঁর সঙ্গে কেউ আছে কি, তিনি একাই দেশভ্রমণ করছেন–অত খবর আমি রাখি না।
খুব ভদ্রভাবে পোডারজেকে ধন্যবাদ জানালাম এতগুলো খবরাখবর সরবরাহ করার জন্যে। তারপর বিদায় নিলাম–এবং তাও একটা বিশেষ কারণেই। আমাদের মতলব ছিল যথেষ্ট দড়ি ছেড়ে ওকে খেলানো, তারপর এক মোক্ষম প্যাঁচে ফাঁসানো। এ ছাড়াও ওদের বিয়ের সার্টিফিকেটের একটা কপি অথবা অন্য কোনও দলিল হাতে আনতে চেয়েছিলাম আমি। এ দলিল আনতে হবে নিউইয়র্কের মিনিস্টারের কাছ থেকে এবং একটি জিনিস দিয়েই তর্কাতীতভাবে প্রমাণ করে দেওয়া যাবে যে নিউইয়র্কের লিটুল চার্চ অ্যারাউন্ড দ্য কর্নার-এ বিয়ে হয়েছিল তাদের।
