একটু পরেই দরজায় টোকা শোনা যায়। টোকা দিচ্ছিলেন ওষুধের দোকানের মালিক ফেইনগোল্ট। পোডারজের কাছ থেকে বিশ ডলারের বিল নিয়ে বাকি ডলার ফেরত দেওয়ার সময়ে তিনি দুটো ডলার বেশি দিয়ে ফেলেছেন। দরজাটা সামান্য ফাঁক করে ফেইনগোল্ডের কথা শুনেছিল পোডারজে। তারপর ফাঁক দিয়ে বাড়তি ডলার ঠেলে দিয়ে রেগেমেগে দড়াম করে বন্ধ করে দিয়েছিল দরজার পাল্লা।
পরের দিন অ্যাগনেসকে দেখা গেল না। সন্ধের আগে পর্যন্ত তার স্বামীরও পাত্তা পাওয়া গেল না। সন্ধের সময়ে বাড়ি ফিরে একতলা থেকে ট্রাঙ্কটা নিজে ঘরে নিয়ে যাওয়ার জন্যে লিফ্ট-এ তুলে দিলে সে। পরের দিন সকলে উঈসবাজার ট্রান্সপোর্ট কোম্পানিকে খবর দিলে ট্রাঙ্কটা নিয়ে যাওয়ার জন্যে। হোয়াইট স্টারের জাহাজ অলিম্পিকে ট্রাঙ্কটা তুলে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল পোডারজে। পোডারজের পরিকল্পনামতো বন্দোবস্তের কিছু কিছু একজন কেরানি জানত। ও তাকে বুঝিয়েছিল–আমার স্ত্রী আগেই রওনা হয়ে গেছে। ইংল্যান্ডেই তার সঙ্গে দেখা হবে আমার। ২২ ডিসেম্বর ফ্ল্যাটে ফিরে এসেছিল পরিচারিকা ফ্লোরা মিলার। তার জন্যেও একটা গল্প বানিয়ে রেখেছিল ক্যাপ্টেন। বলছিল–কয়েক দিনের জন্যে ফিলাডেলফিয়া গেছেন মাদাম।
রওনা না হওয়া পর্যন্ত ক্যাপ্টেনের টুকিটাকি কাজ করে দিলে ফ্লোরা। অলিম্পিকে নিয়ে যাওয়ার জন্যে ঊঈসবার্জার কোম্পানি তার চারটে ট্রাঙ্ক আর অন্যান্য মালপত্র বুঝে নিতে এলে, পোডারজে কিন্তু তার ক্যাপ্টেন-সুলভ পদমর্যাদা আর সম্ভ্রান্ত ঘরের অভিজাত পুরুষের চালচলনটা পুরোপুরি বজায় রাখতে পারলে না। মালপত্র বওয়ার কাজে একরকম জোর করেই নিজেও হাত লাগালে। শুধু তাই নয়। ট্রাক ড্রাইভারের সঙ্গে জেটি পর্যন্ত গেল এক গাড়িতে মালপত্রের সঙ্গে, সেখানে ঠায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মালপত্র ঠিকমতো নামানো হচ্ছে কিনা, তার তদারকি করলে। এমনকী, যেভাবে তার হুকুম-মাফিক মাল নামানো উচিত, তা ঠিকমতো তামিল না হওয়ায় দু-চারবার তো অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজও করতে ছাড়লে ।
অর্ধেক মালপত্র নিয়ে যাওয়ার হল ডেকের নীচে। বাকি মাল, তার মধ্যে বিশাল ট্রাঙ্কটাও ছিল, রাখা হল পোডারজের কেবিনে। ওর সৌভাগ্যক্রমে কি দুর্ভাগ্যক্রমে তা জানি না, পোরজের বরাতে যে কেবিনটি জুটেছিল সেটি একদম নীচের ডেকের–জলরেখার ঠিক ওপরেই। ছোট্ট কিন্তু বেজায় আরামপ্রদ কেবিনটা। পোর্ট হোলের ভেতর দিয়ে কোনও কিছু সাগরের জলে ফেলে দেওয়াটাও মোটেই কঠিন কাজ নয়।
যাত্রা শুরু হওয়ার সময় ঘনিয়ে এলে নিজের কেবিনে সেঁধিয়ে পড়ল পোডারজে। সদ্যবিবাহিত হলেও তখন সে বধূহীন। অ্যাগনেসকে কেউই দেখেনি। সে কোথায় অথবা কি অবস্থায় আছে–তা কেউ জানত না। কিন্তু পোরজের দিব্বি হাসিখুশি মেজাজে এতটুকু বৈলক্ষণ্য দেখা গেল না। বেয়ারা ধরনের কোনও প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হল না তাকে।
ছদিনের যাত্রায় কিছু চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটল না। কেবিন ছেড়ে একেবারেই বাইরে বেরোয়নি পোডারজে। তাতে অবশ্য আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। বহু প্যাসেঞ্জারই তার মতো কেবিন ছেড়ে বাইরে আসা পছন্দ করেনি সমুদ্র-পীড়ার ভয়ে।
অলিম্পিকের স্টুয়ার্ডের সঙ্গে অনেক কথা হল আমার। আমার আগেই অবশ্য নিউইয়র্ক পুলিশও তাকে কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করে গেছিল।
আমার প্রশ্নের উত্তরে সে বললে–ক্যাপ্টেন পোডারজে মানুষটি ভারি চমৎকার। অল্প কথা বলার স্বভাব তাঁর একেবারেই নেই। সারবিয়ান চাষা আর তাদের খাসা খানা সম্বন্ধে কথা বলতে দারুণ ভালোবাসতেন তিনি। আমার মনে হয় ইউরোপের জন্যে তার প্রাণ কেঁদেছিল বলেই ফিরে চলেছিলেন উনি। একবার কথায় কথায় আমাকে বলেছিলেন–আমেরিকা আমার জন্যে নয়। বেজায় বড় এই দেশটা। আর, এখানকার প্রতিটি লোক দিনরাত হন্যে হয়ে ছুটছে টাকার পেছনে। যে দেশে জীবনে এত সংঘাতময়, সে দেশের তোয়াক্কা করি না আমি।
স্টুয়ার্ডের কাছে পোরজে গল্প করেছিল সে নাকি একটা নতুন ধরনের সিন্দুক বিক্রি করতে এসেছিল আমেরিকায়। কিন্তু ব্যর্থ হয়েছে তার প্রচেষ্টা।
জিগ্যেস করেছিলাম–ট্রাঙ্কটা তাঁকে কি কোনওদিন খুলতে দেখেছেন?
ইয়েস, স্যার, হামেশাই দেখেছি। একবার ভেতর থেকে একটা নেকটাই বার করে আবার ভেতরে রেখে দিয়েছিলেন উনি।
কেবিনের মধ্যে কোনও বিটকেল গন্ধ পেয়েছিলেন কি?
না স্যার, ও ধরনের কোনও গন্ধ তো ছিল না!
পরে আমি জেনেছিলাম ক্যাপ্টেনের জন্যে আরও একজন অপেক্ষা করেছিল ইংল্যান্ডে। নাম তার মার্গারিট সুজান বাট্রান্ড পোডারজে–তার আইন-সম্মত বউ। মার্গারিটের সঙ্গে বিয়ে হয় ১৯৩৩ সালের মার্চ মাসে। শুধু তিনজন নারীকেই সারা জীবনে বিয়ে করেছিল পোডারজে–অ্যাগনেস ছিল এই তিনজনেরই একজন। এ ছাড়াও তার হবু-পত্নীর সংখ্যা বড় কম ছিল না।
যুগোশ্লাভের রেকর্ড ঘেঁটে আমি জেনেছিলাম, বেলগ্রেডের একটি মহিলাকেও বিয়ে করেছিল পোরজে। প্রচুর অর্থ পকেটস্থ করে রাতারাতি মেয়েটাকে পথে বসিয়ে যায় সে।
পোডারজের সঙ্গে বিচ্ছেদজনিত বিরহবেদনা এতটুকু স্পর্শ করেনি মার্গারিটকে। অন্তত বাইরে থেকে দেখে তো তাই মনে হয়েছিল। দুজনের স্বচ্ছলভাবে চলে যাওয়ার উপযুক্ত টাকা না আনা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বিন্দুমাত্র আপত্তি ছিল না তার। কাড়ি কাড়ি টাকা দরকার তার এবং তা যেনতেন-প্রকারেণ পেলেই হল। স্বামীকে লেখা তার একটা চিঠি পরে পেয়েছিলাম। নিউইয়র্কে ক্যাপ্টেনকে লেখা এই চিঠিটায় সে লিখেছিল ।
