অ্যাগনেস নিউইয়র্কে ফিরে এল বন্ধুবান্ধব আর ব্যবসায়ী মহলের পরিচিত সবাই লক্ষ্য করলে। সুখ আর আনন্দ যেন উপছে তার মনের দুকূল ছাপিয়ে, ঝরে পড়ছে তার চোখে, মুখে, হাসিতে। শুধু তাই নয়। তার বয়সও যেন কমে এসেছে অনেকটা। পোরজের প্রতীক্ষায় ছিল অ্যাগনেস। কয়েকদিনের মধ্যেই রওনা হল সে। ১৯৩৩ সালের নভেম্বর মাসে যুগোশ্লাভের পুলিশ যখন তাকে তন্নতন্ন করে খুঁজছে, ঠিক তখনই জাহাজে চেপে পাড়ি দিলে সে আমেরিকার দিকে। নিউইয়র্কে পৌঁছে আস্তানা নিলে গ্ৰেমার্সি পার্কের একটা ছোট্ট হোটেলে।
পুনর্মিলনের কিছুদিন পরেই অসুস্থ হয়ে পড়ে অ্যাগনেস। সুযোগটাকে পুরোমাত্রায় কাজে লাগালে পোরজে। অ্যাগনসের প্রতি তার অনুরাগ যে কতখানি গভীর তা এই সুযোগে অন্তরস্পর্শী অভিনয়ের মধ্যে দিয়ে বুঝিয়ে দিলে ও। কথাবার্তা আদবকায়দায় তো তার জুড়ি মেলা ভার। তার ওপর মনটাও যে কতখানি নরম–তা প্রমাণিত হল তখনই। সুস্থ হয়ে উঠলে ডিনার, কনসার্ট আর ব্রডওয়ে শো নিয়ে কদিন খুব ফুর্তি করল দুজনে।
ওদের প্রাকৃবিবাহ প্রেমপর্বের শেষ পর্যায়টা কিন্তু খুবই সংক্ষিপ্ত। ওই বছরের ডিসেম্বরের চার তারিখে বিয়ে হয়ে গেল ওদের। যে ফ্ল্যাটে দীর্ঘদিন একাকী নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করেছে অ্যাগনেস, বিয়ের পর পর সেই ফ্ল্যাটেই উঠে এল পোডারজে। সবকিছুই ঘটে গেল খুবই তাড়াতাড়ি। অ্যাগনেসের ফ্যামিলির সঙ্গে পোরজের কোনওদিনই দেখাসাক্ষাৎ হয়নি। বিয়ের রাতে অ্যাগনেস ডেট্রয়েটে তার বাড়িতে আর মট্রিয়ালে তার বোনকে টেলিফোন করে জানালে বিবাহসংবাদ।
কাকপক্ষীকে না জানিয়ে বিয়ে শেষ করার কারণ বোঝাতে গিয়ে অ্যাগনেস বলেছিল–ব্যাপারটা এত তাড়াতাড়ি ঘটে গেল যে তোমাদের কাউকেই আমন্ত্রণ জানাতে পারলাম না। ছঘণ্টা আগেও আমি জানতাম না যে বিয়ে করতে চলেছি আমি। কিন্তু বিশ্বাস করো মানুষটিকে দারুণ ভালোবাসি আমি। সারা দুনিয়ার এমন চমৎকার মানুষ আর দুটি নেই।
অ্যাগনেসের আত্মীয়স্বজনেরা পরে আমাকে বলেছিল পোরজেও নাকি টেলিফোনে কথা বলেছিল তাদের সঙ্গে। বলেছিল–মধুচন্দ্র যাপন করতে আমরা ইংল্যান্ড রওনা হচ্ছি। সেখান থেকে জার্মানিতে আমার এস্টেটে কয়েকটা দিন থাকব। সত্যি কথা বলতে কি মাস ছয়েকের আগে অ্যাগনেসের সঙ্গে আপনাদের আর দেখাই হবে না। জার্মানি থেকে আমরা যাব যুগোশ্লাভিয়ায়। যে দেশে আমার জন্ম, অ্যাগনেসকে আমি নিয়ে যেতে চাই সে দেশের মাটিতে।
ছমাসব্যাপী মধুচন্দ্রের প্রস্তুতি নিয়ে কিছুদিন ব্যস্ত রইল অ্যাগনেস। কেনাকাটা করা, প্যাক করা ছাড়াও টাকাকড়িরও একটা পাকাঁপোক্ত ব্যবস্থা করতে হল ওকে। ব্যাঙ্ক থেকে ২৫০০০ ডলার তুলল ও। ৫০০০ ডলার বাদে পুরো অর্থটাই তুলে দিলে তার প্রিয় ক্যাপ্টেনের হাতে। স্বামীকে সে ক্যাপ্টেন বলেই জানত। টাকা রাখা হল একটা জয়েন্ট অ্যাকাউন্টে। বাকি টাকাটা পাঠিয়ে দেওয়া হল লন্ডনে। ডিসেম্বর মাসের কুড়ি তারিখে ওদের ইংল্যান্ড রওনা হওয়ার দিন ধার্য হয়েছিল। ওদের মধ্যে, ক্যাপ্টেন আর মিসেস পোডারজের। জাহাজটার নাম হামবুর্গ। সে সময়ে নাৎসিদের পতাকা উড়ত হামবুর্গের ওপর।
যাত্রার দিনটি এগিয়ে আসতে থাকে। অ্যাগনেস একদিন জাহাজে গিয়ে কিছু মালপত্র রেখে এল তার কেবিনে। কেবিনটা শুধু তার একার জন্যেই বুক করা হয়েছিল। যাত্রীদের তালিকায় তার স্বামীর নাম ছিল না। নামটি যে কেন বাদ গেল এবং এই বাদ দেওয়ার পেছনে কোনও কুমতলব আছে কিনা–এ ধরনের কোনও সন্দেহ অ্যাগনেসের প্রণয়-নিবিড় মগজে স্থান পায়নি। স্বামীর ওপর তার অগাধ বিশ্বাস। পোডারজে বউকে কী বুঝিয়েছিল, তা কোনওদিনই জানা যায়নি। তবে অ্যাগনেসের পরিচারিকা ফ্লোরা মিলারের কাছে জানা গেছিল মিসেস পোডারজে নাকি তাকে বলেছিলেন যে ব্যবসা-সম্পর্কিত কিছু কাজকর্মের জন্যে কিছুদিন পরে রওনা হবেন তার স্বামী।
কয়েকজন সাক্ষী বললে, পোডারজে নাকি তাদের কাছে এমন একটা দোকানের ঠিকানা চেয়েছিল যেখানে দেশভ্রমণে উপযুক্ত একটা পেল্লায় ট্রাঙ্ক কিনতে পাওয়া যায়। সমস্ত জামাকাপড় সে একটা ট্রাঙ্কে রাখাই পছন্দ করে–বিশেষ করে সাগরপাড়ি দেওয়ার সময়ে। থার্ড অ্যাভিন্যুতে এমনি একটা দোকান পেয়েছিল সে। মস্ত বড় একটা পুরোনো ট্রাঙ্কও কিনেছিল। ডেলিভারি দেওয়ার পর তারই নির্দেশমতো ট্রাঙ্কটা রাখা হল বাড়ির নীচের তলায়। সেই রাতেই সেকেন্ড অ্যাভিন্যুতে সাইমন ফেইনগোল্ডের ওষুধের দোকানে গেছিল পোডারজে। ইউরোপের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা চলে দুজনের মধ্যে। ফেইনগোল্ড একবার বলেছিলেন, এ অবস্থায় পোডারজের আত্মীয়স্বজনের জীবনের আশঙ্কা পদে পদে। শুনে হেসে উঠেছিল পোডারজে। তার বিশ্বাস জার্মানির হর্তাকর্তা হিসেবে আর বেশিদিন টিকে থাকতে হবে না হিটলারকে। দশ ডলার দামের দাড়ি কামানোর ব্লেড, মুখে মাখার ক্রিম, আর ঘুমের বড়ি কিনে ছিল ও। সমুদ্রযাত্রার জন্য নাকি এগুলো তার দরকার। নিউইয়র্ক স্টেট ল-র বিধান অনুসারে ঘুমের বড়ির ক্রেতা হিসেবে রেজিস্টারে সই দিয়ে গেছিল পোরজে।
দোকান থেকে সিধে ফ্ল্যাটে বউয়ের কাছে ফিরে আসে ও। এসে দেখে অ্যাগনেসকে জিনিসপত্র গুছোতে সাহায্য করছে পরিচারিকা ফ্লোরা মিলার। অনেক রাত হয়ে গেছিল। সারাদিন বড় খাটুনি গেছিল ফ্লোরার। তাই পোরজে ওকে তখনকার মতো ছুটি দেয় এবং বলে পরের দিনও তার ছুটি রইল আজকের অতিরিক্ত খাটুনির দরুন।
