সুযোগটা তোমাকে দেওয়া হচ্ছে শুধু ওই কারণেই। এই ফাইলটা নিয়ে যাও। খুব মন দিয়ে কাগজগুলো পড়ে ফ্যালো। বছরের পর বছর অপরাধীদের যত রেকর্ড আমরা সংগ্রহ করেছি, তার মধ্যে সবচেয়ে সম্পূর্ণ রেকর্ড হচ্ছে এটি। লোকটাকে আমি অন্য দেশের শাসনের আওতা থেকে টেনে এদেশের শাসনব্যবস্থার এখতিয়ারে ফেলতে চাই। কী করে তুমি তা করবে তা আমি জানতে চাই না। আমি শুধু চাই, বিচারের জন্যে তাকে তুমি যুগোশ্লাভিয়ার মাটিতে নিয়ে এসো। বহুদিন ধরে অনেক নারীকে শিকার বানিয়েছে সে। তার অগুন্তি (হলেও হতে পারে) বউয়ের অন্তত একজনকে যে সে খুন করেছে, সে বিষয়েও আমাদের মনে আর কোনও দ্বিধা বা সন্দেহ নেই। তার একমাত্র উপযুক্ত স্থান হচ্ছে যুগোশ্লাভ কারাগার।
আইভান পোডারজে-র অস্তিত্ব সম্বন্ধে প্রথম খবর এইভাবেই কানে পৌঁছোল আমার। জন্ম তার যুগোশ্লাভিয়ায়। পেশায় সে পয়লা নম্বরের ভণ্ড। বহু নারীকে নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছে সে এবং ধনবতী মহিলাদের সংখ্যাই তাদের মধ্যে বেশি। তার পিছু নিয়ে ইউরোপ থেকে যেতে হয়েছে আমেরিকায়, আবার ফিরে আসতে হয়েছে ব্রিটেন, ফ্রান্সে, জার্মানিতে আর অস্ট্রিয়ায়। শেষকালে ওয়ল্টা আর প্রেটার ভায়োলেটের শহর ভিয়েনায় মুখোমুখি হয়েছিলাম তার।
কেটা হাতে নেওয়ার পরেই নিউইয়র্কে হাজির হলাম আমি। কেন্সটা সম্বন্ধে তখন কত আশা, কত স্বপ্নই না ছিল আমার মনে। ভাবতাম যে লোকটাকে গ্রেপ্তার করে আদালতে হাজির করার গুরুদায়িত্ব দেওয়া হয়েছে আমার কাঁধে, তাকে হাতের মুঠোয় আনার তদন্ত-পর্বের এই বুঝি প্রথম পর্যায়। ভাবতাম, এ তদন্তের অন্তে সাফল্য থাকবেই এবং ধুরন্ধর বদমাশটাকে আমি গ্রেপ্তার করবই। কেসটা প্রাথমিক কাজ দেখেই আমার হুঁশিয়ার হওয়া উচিত ছিল। পোডারজের ধড়িবাজি আর পিছলে বেরিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা এত বেশি যে, বঁড়শিতে গাঁথা হতভাগিনীদের অর্থে সে শুধু বিলাসবহুল জীবনই যাপন করেনি, তার প্রাপ্য শাস্তিকে এক ধাপ টপকে যাওয়ার মতো বুদ্ধিমত্তা যে তার মগজে আছে, তার আমার বোঝা উচিত ছিল।
লোকটার গতিবিধি সম্বন্ধে খুবই আবছা খবর রাখত আমেরিকার ইমিগ্রেশন ডিপার্টমেন্ট। গত বছরের আগে যুগোশ্লাভ কটিনজেন্টের কেউই নাকি তাকে দেখেনি। কিন্তু নিউইয়র্কের পুলিশবাহিনীর কাছ থেকে সব সময়ে সব রকম সাহায্য আমি পেয়েছিলাম। তারাই আমাকে জানালেন, কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিপথ থেকে বেমালুম উধাও হয়ে যাওয়ার কিছু আগেই পোরজে নাকি আবার বিয়ে করেছিল। মেয়েটির নাম অ্যাগনেস টাফভারসন। শহরের নামকরা কর্পোরেশন আইনবিদ সে। বয়স প্রায় তেতাল্লিশ। দারুণ ধূর্ত। বিয়ের আগে পর্যন্ত একটু নিরিবিলি নিঃসঙ্গ জীবন যাপনে অভ্যস্ত ছিল সে।
মানহাট্টানে লিটল চার্চ অ্যারাউন্ড দ্য কর্নার-এর মিনিস্টারের কাছ থেকে কয়েকটি তথ্য সংগ্রহ করলাম আমি।
ভদ্রলোক বললেন–কিছুদিন আগেই এক যুগোশ্লাভদ্রলোকের বিয়ের খুঁটিনাটি তদারক করতে হয়েছে আমাকে। বিয়ের সাক্ষীরা আসলে তাকে চিনতই না। এই গ্রামেরই বাসিন্দা তারা। খুব শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয় বিয়ের অনুষ্ঠান। তার পরেই গাড়ি হাঁকিয়ে চলে যান বর-বউ। আর তাঁদের দেখা যায়নি।
|||||||||| অন্যান্য সূত্র থেকে অ্যাগনেস টাফভারসনের কুক্ষণে-শুরু রোমান্সের কাহিনিও শুনতে পেলাম। বিয়ের কয়েকমাস আগে সে ইউরোপে গিয়েছিল ছুটি উপভোগ করতে। তখনই ফ্রেঞ্চ রিভিয়েরাতে তার সঙ্গে আলাপ হয় পোডারজে-র। মেয়েদের চিরকালই চুম্বকের মতো কাছে টেনে আনতে পারে পোডারজে। অ্যাগনেসের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ঘটল না। পোডারজেকে ভীষণ ভালো লেগে গেল তার। অ্যাগনেসকে পোডারজে বুঝিয়ে দিলে সে যুগোশ্লাভিয়ার অবসরপ্রাপ্ত আর্মি অফিসার। নিজের সম্পত্তিও আছে যথেষ্ট। নিজস্ব কতকগুলো পেটেন্ট কৌশল প্রয়োগ করাই পছন্দ করত পোডারজে। ব্যবসা সম্পকির্ত নানাবিধ ঝুঁকি নেওয়ার সময়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক স্থাপন করতে পারলে বিস্তর আমোদ পেত। হাবভাব রীতিমতো মার্জিত আর শিক্ষিত ছিল সে। আন্তর্জাতিক আইনকানুনও কিছু কিছু জানত। যখনই দেখা হত দুজনের, খট করে গোড়ালি ঠুকে সম্ভ্রমভাবে অ্যাগনেসের হাতে চুম্বন এঁকে দিত পোডারজে। আর তাইতেই গলে গেল অ্যাগনেসের মন! অ্যাগনেস নিজেও কিন্তু বিলক্ষণ ধূর্ত ছিল। ধীশক্তিও ছিল যথেষ্ট। কিন্তু মেয়েদের প্রতি কোনও পুরুষ যে এতখানি আদবকায়দা আর শিষ্টাচার দেখাতে পারে, তা তার আগে জানা ছিল না। অন্তত তার বরাতে এমনটি এর আগে আর জোটেনি। বিশেষ করে ওই রকম বিপজ্জনক বয়েসে, যে বয়েসে প্রেমমাত্রই একদম অন্ধ, সে বয়েসে চিত্তজয়ের এই অভিনব পন্থাটির অবশ্যম্ভাবী পরিণাম যা হবার, তা হল।
মায়াবী জাদুকরের মতোই অ্যাগনেসকে মোহমুগ্ধ করে ফেললে পোডারজে। কিন্তু প্রথম থেকেই হুঁশিয়ার হয়ে প্রেমাস্পদ সম্বন্ধে যদি একটু খোঁজ-খবর করতে। অ্যাগনেস, তাহলেই অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্যই জানতে পারত সে। চওড়া-কঁধ কেঁকড়া চুল পোডারজেকে দেখে কিন্তু তার সত্যিকারের বয়েসের চাইতে অনেক কমবয়েসি বলেই মনে হত। এই কান্তিমান প্রিয়ংবদ মানুষটি যে আসলে একটা পাকা ঠগ–তা জানতে তার বেশি সময় লাগত না। তার সন্ধানে শুধু যে তার স্বদেশের পুলিশই ঘুরছে তা নয়–বহু জায়গায় পুলিশবাহিনী বিভিন্ন ধরনের বিস্তর আইনবিগর্হিত কার্যকলাপের জন্যে তাকে খুঁজছিল। এসব অপরাধের মধ্যে গভর্নমেন্ট এবং আর্মি অফিসারের ছদ্মবেশ ধারণও আছে। কিন্তু বুদ্ধিমতী হওয়া সত্ত্বেও এই ঝামেলাটুকুর মধ্যে আর যেতে চায়নি অ্যাগনেস। তার কারণও ছিল। প্রথমত সে নারী তার ওপর প্রেমে অন্ধ। দ্বিতীয়ত মনচোর প্রিয়জনের সঙ্গে ইউরোপের বড় বড় শহরগুলো দেখতে পাওয়ার সুখ স্বপ্নেও সে তখন মশগুল। পোডারজেও হচ্ছে। সেই ধরনের লোক, যে জাতিগত সঙ্কীর্ণতার ঊর্ধ্বে সব দেশকেই যে স্বদেশ মনে করে এবং এদিক দিয়ে তার অভিজ্ঞতাও বড় কম নেই। কাজে কাজেই দেশবিদেশের হরেকরকম গল্প শুনিয়ে অ্যাগনেসের মনের আকাশে রাশি রাশি রঙের স্বপ্ন ছড়িয়ে দিতে বিন্দুমাত্র কসুর করলে না সে। ভিয়েনায় একত্সঙ্গে নাচলে ওরা দুজনে। নিউইয়র্কের রক্ষণশীল কোনও মহিলার কাছে এ অভিজ্ঞতা তো নিদারুণ রোমান্টিক মর্মস্পর্শী এবং কোনওদিনই ভুলতে পারা যায় না।
