নাগরাজন–কিন্তু মার্সডেন বা মিসেস সরকার মূর্তির কাছে গেলেন কেন?
মনীশ–মার্সডেন চিঠির তাড়াটা খুঁজতে মূর্তিটার কাছে গিয়েছিল। মুকুটের পেছনে ফঁকটা তো লক্ষ করেছেন? অনায়াসেই লুকিয়ে রাখা যায় সেখানে। মার্সডেন সিংহাসনের ওপর উঠে হাত বাড়াল মুকুটের ওপর। রশ্মি বাধা পেতেই ফলাটা বেরিয়ে এসেই আবার ঢুকে গেল। মার্সডেনের মৃতদেহ পড়ল লুটিয়ে সবার অগোচরে। তার মুখে যে বিস্ময়ের চিহ্ন দেখেছেন–তার কারণ এখন নিশ্চয় বুঝছেন। আপনিও তো কম অবাক হননি ব্যাপারটা দেখে। অথচ যুবরাজ তখন ফরেস্টে শিকার করছেন। নিখুঁত alibi, কী বলেন?
নাগরাজন–কিন্তু অন্য নির্দোষ লোকেরও তো প্রাণ যেতে পারে এভাবে?
মনীশ–সেখানেই যুবরাজের বাহাদুরি। ইলেকট্রিক সেল সবসময় চালু থাকত না। কোনও নির্দোষ লোকের যাতে ক্ষতি না হয় সেজন্যেই যুবরাজ মূর্তির গায়ে গুপ্ত সুইচ লাগিয়ে রেখেছিলেন। মার্সডেনের মৃত্যুর সময় তিনি মার্সডেনের কাছে কয়েক মিনিট সময় নিয়েছিলেন মনে আছে?
নাগরাজন–হ্যাঁ। সেই সময়েই বোধহয় তিনি সুইচ অন্ করে দিয়েছিলেন?
মনীশ–হ্যাঁ। কিন্তু crime never pays। তাই ছন্দার বেলায় সুইচ অন্ করতে গিয়ে তার পোশাকে ব্রোঞ্জ পাউডার লেগে গেল। আর তাতেই ধর্মের কল বাতাসে নড়ে উঠল। নিজের alibi establish করতে যদি না তিনি আপনার অফিসে এসে বসে থাকতেন, তাহলে আমার সঙ্গে ওঁর দেখা হত না–তিনি ধরাও পড়তেন না। এমনকি যদি না আমি সেদিন ওঁকে খোলাখুলি চ্যালেঞ্জ করতাম তা হলেও হয়তো এ রহস্যের যবনিকা কোনওদিন উঠত না। সবই বিধাতার খেলা Inspector, দেখুন না রহস্যের সমাধান হল, অপরাধী নিজের হাতেই শাস্তি গ্রহণ করল। কিন্তু বড় বেশি মূল্য দিতে হল আমাকে। এত আমি চাইনি। এ মূল্য দিয়ে গোয়েন্দাগিরি করতে আমি চাইনি।
(সহানুভূতিপূর্ণ কাঁধ চাপড়ায় নাগরাজন। মনীশ একটু সামলে ওঠে।)
নাগরাজন–কিন্তু একটা কথা আমি কিছুতেই বুঝতে পারছি না, মিঃ সরকার–ছন্দা দেবী কেন ওখানে গেলেন আপনাকে না জানিয়ে? কেনই-বা আপনার ডাকে সাড়া না দিয়ে উঠতে গেলেন সিংহাসনের ওপরে?
(ফের মঞ্চ অন্ধকার হয়ে গেল। শুধু স্পটলাইটের ফোকাস রইল মনীশের মুখের ওপর। সে বলছে…)
মনীশ–কী জবাব দেব? কী জবাব দেব এ প্রশ্নের? জানি এই রহস্যের সমাধান হয়তো কেউ খুঁজে পাবে না। এই প্রহেলিকার উত্তর আমাকে সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হবে। কেন গেল সে ওখানে? কেমন করে গেল? কী করে ঢুকল লাইব্রেরি রুমে? কেন সাড়া দিল না আমার নিষেধে? কেন এগিয়ে গেল সে কালান্তক গণেশ মূর্তির সামনে? অপহরণ? সম্মোহন? নাকি কোনও ওষুধের প্রভাব? জানি–জানি আমি জানি এর উত্তর।
আর ভাবতে পারি না…একই বিষয়ে চিন্তা করে করে আমার স্নায়ুমণ্ডলীও হয়ে পড়েছে বিপর্যস্ত। আবোল-তাবোল অসংলগ্ন চিন্তা যেন মাথার ভেতর কুরে কুরে খায় আজকাল। জানি মরণের ওপারে গিয়ে যতদিন না তার সাক্ষাৎ পাচ্ছি ততদিন আমার এ যন্ত্রণার শেষ নেই। কিন্তু কবে আসবে সে পরম লগ্ন? কবে আমি আবার তার দেখা পাব? কবে? কবে? কবে? কবে সে নিজের মুখে আমাকে বলবে অভিমানে ঠোঁট ফুলিয়ে–
(মঞ্চ একদম অন্ধকার। স্পটলাইট নিভে গেল। নেপথ্যে ছন্দার কান্নাজড়ানো প্রতিধ্বনিময় স্বর শোনা যাচ্ছে…ওগো, কেন তুমি আমার কথা শুনলে না..কেন তুমি যুবরাজের হুশিয়ারি শুনলে না…তাই সে আমাকে ধরে নিয়ে গিয়ে গণেশ মূর্তির সামনেই আমাকে….তারপর, গণেশ মূর্তি দেখিয়ে বলেছিল–এ মুখ আর স্বামীকে দেখিও না…ওই সিংহাসনের ওপর গিয়ে দাঁড়াও…আত্মহত্যা করো…আমি তাই করেছি…নোংরা শরীরটা নিয়ে তোমার কাছে যেতে চাইনি..তুমি তা জানতে…তাই আমার পোস্টমর্টেম করতে দাওনি..)
ব্লেড, ক্রিম আর ঘুমের বড়ি
কর্মজীবনের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ কেসটিকে কোনও তরুণ গোয়েন্দাই ভুলতে পারে না। তার কারণ সে সময়ে সে স্বপ্ন দেখে বুঝি বা এর সফল পরিসমাপ্তির ওপরেই নির্ভর করছে তার সারা ভবিষ্যৎ। যদিও এমনতর ধারণায় সত্যের ছিটেফোঁটাও নেই। পরে অবশ্য পরিণত বুদ্ধি দিয়ে, আরও পরিষ্কারভাবে বিচারবিবেচনা করার শক্তিলাভের পর সে উপলব্ধি করতে পারে কতখানি আজগুবি আর অলীক ব্যাপারের ওপর তার সম্ভবপর সাফল্য আর ব্যর্থতা নির্ভর করেছে। এই জাতীয় অকুতোভয় স্পার্টান দর্শনবাদ সম্বন্ধে সম্যক জ্ঞানলাভের পরেই সে গোয়েন্দাগিরিতে আরও পারদর্শী হয়ে উঠতে থাকে। এ জ্ঞানলাভের পথটি কিন্তু কুসুমাস্তীর্ণ নয়। আমার বেদনাময় অভিজ্ঞতা থেকেই আমি তা জেনেছি।
আজ আমি বেলগ্রেডের পুলিশ চিফ। কিন্তু এত বছর পরেও সেদিন ব্যর্থতার কামড় আমার তরুণ মনকে স্বভাবে দংশেছিল এবং যে নিদারুণ নিরাশা আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল–আজও অ ঠিক তেমনিভাবে উপলব্ধি করতে পারি। সে সময়ে বেলগ্রেডের হেড কোয়ার্টারে ছিলাম অতি কম মাইনের গোয়েন্দা হিসেবে। যুগোশ্লাভিয়ায় তখন রাজতন্ত্র-শাসন কায়েমি রয়েছে। সালটা ১৯৩৪। গ্রীষ্মকাল। আমার ঠিক ওপরকার চিফ তার ছোট্ট অফিসঘরে আমাকে ডেকে পাঠিয়ে বললেন– জোসেফ, তুমি আমেরিকায় যেতে চাও?
সেদিনকার আতীব্র উত্তেজনা আজও আমি মনে করতে পারি। প্রস্তাবটা শুনেই চট করে শুধিয়েছিলাম–আপনি কি সত্যি সত্যিই যেতে বলছেন আমাকে? আমার কপাল ভালো, কিছু কিছু ইংরেজি আমি বলতে পারি।
